কুরআন শিক্ষার হালাকায় শিশুদের সংশোধন: শাসন নয়, গঠনই মূল উদ্দেশ্য-
-আব্দুল হাকীম মাদানী
[বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে হিফয মাদ্রাসা ও কুরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাপদ্ধতি, পরিবেশ ও তারবিয়াতি মান একরকম নয়। তাই কোনো শিশুকে ভর্তি করার আগে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, নিয়মনীতি ও পরিবেশ যাচাই করা জরুরি। শিশুর হিফযের পাশাপাশি তার মানসিক, নৈতিক ও ব্যক্তিত্ব গঠনের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কুরআন শিক্ষা যেন ভালোবাসা, আদব, মমতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিচালিত হয় এটাই মূল লক্ষ্য।]
.
বিবেকবান মানুষের কাছে এ কথা অজানা নয় যে, শিশু স্বভাবতই ভুল-ত্রুটি ও অপূর্ণতার সম্ভাবনাময়। সে যেখানেই থাকুক; ঘরে, মাদ্রাসায়, স্কুলে, মসজিদে কিংবা কুরআন শিক্ষার হালাকায়- তার কাছ থেকে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এর কারণ হলো, তার বোধ, বিবেচনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও উপলব্ধির ক্ষমতা এখনো পূর্ণতা লাভ করেনি। তাই শিশুর ভুলকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভুলের মতো করে বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
এই বাস্তবতা কুরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। দারুল কুরআন বা হিফযখানা শুধু পাঠদানের জায়গা নয়; এটি শিশুর চরিত্র, মনন, শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক বিকাশের ক্ষেত্রও। তাই এসব প্রতিষ্ঠান কেবল ভালো পাঠ্যক্রম, সুন্দর তিলাওয়াত বা শক্তিশালী মুখস্থ করানোর পদ্ধতির মাধ্যমে সফল হয় না; বরং এর পাশাপাশি প্রয়োজন গভীর তারবিয়াতি দক্ষতা। উস্তাযকে জানতে হয়, কীভাবে শিশুর সঙ্গে কথা বলতে হয়, কীভাবে তাকে বুঝাতে হয়, কীভাবে তার ভুল সংশোধন করতে হয় এবং কীভাবে তাকে ভালোবাসা, সম্মান ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হয়।
শিশুকে সংশোধন করা (تقويم) তারবিয়াতের একটি অংশ। তবে এর উদ্দেশ্য কখনোই শিশুকে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা বা মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া নয়। বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর নিষ্পাপ মনকে সংশোধন করা, তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা এবং ধীরে ধীরে তাকে উত্তম চরিত্র ও শৃঙ্খলার দিকে পরিচালিত করা। যে সংশোধন ন্যায়ভিত্তিক হয়, অপমান ও আঘাত থেকে মুক্ত থাকে, সেটিই শিশুর জীবনে বেশি উপকারী হয় এবং তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী থাকে।
তবে শাস্তি বা কঠোর ব্যবস্থার আগে কিছু বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত করা জরুরি। যেমন-
প্রথমত: শিশুর সামনে নিয়মগুলো পরিষ্কার থাকতে হবে। কোন কাজ করা যাবে, কোন কাজ করা যাবে না, হালাকার আদব কী, সময়মতো আসার গুরুত্ব কী, পড়া না শেখার পরিণতি কী এসব আগে থেকেই সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। কারণ নিয়ম না জানিয়ে শাস্তি দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়। যখন নিয়ম স্পষ্ট থাকে, তখন তা ভঙ্গ করলে শিশুকে কোমলভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।
দ্বিতীয়ত: শিশুকে শুধু ভুল ধরিয়ে দিলেই হবে না; বরং তাকে বেশি বেশি উৎসাহ ও প্রশংসা করতে হবে। ভালোভাবে পড়লে, সময়মতো এলে, আদব রক্ষা করলে, সহপাঠীদের সাহায্য করলে উস্তাযকে কথা ও কাজে তার প্রশংসা করতে হবে। শিশুর মন প্রশংসা দ্বারা দ্রুত প্রভাবিত হয়। সে যখন বুঝতে পারে উস্তায তার ভালো দিকগুলো দেখছেন, তখন সে নিজের আচরণ আরও সুন্দর করতে আগ্রহী হয়।
তৃতীয়ত: ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও সাময়িক দুর্বলতার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। কোনো শিশু যদি বারবার জেনেশুনে অবহেলা করে, তা এক বিষয়; আর কোনো শিশু যদি অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা, মানসিক চাপ, দুর্বল স্মরণশক্তি বা সাময়িক অক্ষমতার কারণে পিছিয়ে পড়ে, তা আরেক বিষয়। দুটিকে একভাবে বিচার করলে অবিচার হয়। একজন বিচক্ষণ উস্তায শিশুর অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেন।
কুরআনের হালাকায় শিশুদের সংশোধনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি [এক নং উপায়] হলো উস্তায ও ছাত্রের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা। শিশু যখন শিক্ষককে ভয় নয়, বরং ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও নিরাপত্তার সঙ্গে দেখে, তখন সে উস্তাযের কথায় বেশি প্রভাবিত হয়। সম্পর্ক যত দৃঢ় হয়, ছাত্র তত বেশি শিক্ষকের সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায় এবং তাঁর বিরোধিতা থেকে দূরে থাকে। তাই একজন উস্তায শুধু পড়া নেওয়ার মানুষ নন; তিনি শিশুর হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারকারী একজন মুরব্বি।
আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হলো [দুই নং উপায়] পয়েন্ট ও পুরস্কারের ব্যবস্থা। যেমন, মাসের শুরুতে বা কোনো নির্দিষ্ট কোর্সের শুরুতে প্রত্যেক ছাত্রকে নির্দিষ্ট সংখ্যক পয়েন্ট দেওয়া হলো। এরপর দেরি করে আসা, পড়া না শেখা, হালাকায় বিশৃঙ্খলা করা বা অন্যকে বিরক্ত করার কারণে তার পয়েন্ট থেকে কিছু কমানো হলো। মাস বা কোর্স শেষে যাদের পয়েন্ট বেশি থাকবে, তাদের সম্মাননা, পুরস্কার বা বিশেষ প্রশংসা করা হবে। এতে ছাত্ররা পুরো সময়জুড়ে নিজেদের পয়েন্ট ধরে রাখতে সচেষ্ট হয় এবং হালাকার নিয়ম মানতে আগ্রহী হয়।
তৃতীয় পদ্ধতি হলো [তিন নং উপায়] কিছু সুবিধা থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত করা। যদি হালাকায় কোনো প্রতিযোগিতা, শিক্ষামূলক খেলা, বিশেষ কার্যক্রম বেছে নেওয়ার সুযোগ বা পুরস্কার জেতার ব্যবস্থা থাকে, তবে ভুল করলে শিশুকে সাময়িকভাবে সেই সুবিধা থেকে বিরত রাখা যেতে পারে। তবে এখানে দুটি বিষয় জরুরি—এই বঞ্চনা যেন সাময়িক হয় এবং ভুলের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ছোট ভুলের জন্য বড় শাস্তি দিলে শিশুর মনে অন্যায়বোধ জন্ম নিতে পারে।
চতুর্থ পদ্ধতি হলো [চার নং উপায়] একান্তে কোমল ভর্ৎসনা বা নরমভাবে বুঝানো। এটি অনেক সময় অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়। হালাকা শেষে দুই-তিন মিনিট আলাদা করে উস্তায ছাত্রকে বলতে পারেন, তুমি তো আমার কাছে ভালো ছাত্রদের একজন। আজ তোমার আচরণ এমন হলো কেন? আজ পড়া মুখস্থ করোনি কেন? এই ধরনের কথা শিশুকে অপমান করে না; বরং তাকে ভাবতে শেখায়। অনেক সমস্যা তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন শিশু অনুভব করে তাকে সম্মান করা হচ্ছে, তার কথা শোনা হচ্ছে এবং উস্তায তাকে মূল্য দিচ্ছেন।
পঞ্চম পদ্ধতি হলো [পাঁচ নং উপায়] শিশুকে দায়িত্ব দেওয়া। অনেক সময় যে শিশু বেশি নড়াচড়া করে, দুষ্টুমি করে বা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, তার আসলে শাস্তির চেয়ে দায়িত্বের প্রয়োজন বেশি। তাকে কোনো ভূমিকা দেওয়া যেতে পারে। যেমন, সে মুসহাফ বিতরণ ও সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করবে, অথবা উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি নথিভুক্ত করতে সাহায্য করবে। শিশুরা যখন নিজেদের প্রতি আস্থা অনুভব করে এবং বুঝতে পারে যে শিক্ষক তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তখন তাদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, কুরআন শিক্ষার হালাকায় সংশোধনের উদ্দেশ্য শিশুকে ভেঙে দেওয়া নয়; বরং তার ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা। তাকে ভয়, অপমান বা আঘাতের মাধ্যমে নয়; বরং ভালোবাসা, ন্যায়, শৃঙ্খলা, উৎসাহ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে উচ্চতর চরিত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া। একজন সফল কুরআন শিক্ষক সেই ব্যক্তি, যিনি শিশুর ভুল দেখেন, কিন্তু শিশুকে ঘৃণা করেন না; শৃঙ্খলা শেখান, কিন্তু তার মর্যাদা নষ্ট করেন না; সংশোধন করেন, কিন্তু তার হৃদয় ভেঙে দেন না।
কারণ কুরআন শিক্ষা শুধু মুখস্থের বিষয় নয়; এটি হৃদয়, চরিত্র ও জীবনের শিক্ষা। তাই কুরআনের হালাকায় শিশুকে গড়ে তোলার পথ হতে হবে সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে ন্যায়পূর্ণ এবং সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন! বারাকাল্লাহু ফিকুম।






