নিজের পথ চিনে নিন
একসময় আরব ও মুসলিম বিশ্ব যেন চিন্তা ও জীবনদর্শনের ক্ষেত্রে দুই ভিন্ন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ল।
একদল অতীতের সমগ্র জীবনব্যবস্থাকেই অস্বীকার করে বসল। তাদের কাছে অতীত মানেই পশ্চাৎপদতা, পুরোনোত্ব ও এমন এক অধ্যায়, যার সঙ্গে বর্তমানের আর কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে তারা নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, চিন্তা ও জীবনবোধ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক পথের সন্ধান করতে লাগল।
অন্যদল অতীতকে এতটা অস্বীকার করতে পারল না। তারা অনুভব করল, শেকড়কে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে কোনো জাতি নিজের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে না। তাই তারা চাইল, অতীতের জীবনকে নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতে; পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন এক জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
কিন্তু এখানেই দেখা দিল এক গভীর বৈপরীত্য।
যে নতুন ভিত্তির ওপর তারা নিজেদের অতীতকে পুনর্গঠন করতে চাইল, একটু গভীরে গিয়ে দেখা গেল, সেই ভিত্তির বড় একটি অংশই আসলে তাদের নিজেদের জীবনদর্শন থেকে উৎসারিত নয়। বরং তা গড়ে উঠেছে সেই জীবনব্যবস্থার প্রভাব ও ছাঁচে, যা একসময় ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিল।
অর্থাৎ তারা অতীতকে ফিরিয়ে আনতে চাইল, কিন্তু অতীতকে দেখার চোখটিই হয়ে গেল অন্যের দেওয়া; নিজেদের জীবনকে পুনর্গঠন করতে চাইল, অথচ পুনর্গঠনের মানদণ্ডও গ্রহণ করল অন্যের কাছ থেকে।
এখানেই আত্মপরিচয়ের সংকটের সূচনা।
কোনো জাতির পুনর্জাগরণ কেবল পুরোনো ভবনের ওপর নতুন রং লাগানোর নাম নয়। আবার নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধ আবেগও পুনর্জাগরণের পথ নয়। প্রকৃত সংস্কার হলো নিজের শেকড়কে চিনে নেওয়া, নিজের মূল্যবোধের ভিত্তি বুঝে নেওয়া এবং সেই ভিত্তির ওপর সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নির্মাণ গড়ে তোলা।
অন্যের কাছ থেকে শেখা অপরাধ নয়। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও সভ্যতার নানা উপকারী দিক গ্রহণ করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। কিন্তু গ্রহণ করার আগে একটি জাতির নিজের কাছে প্রশ্ন থাকা প্রয়োজন: আমি কী গ্রহণ করছি, কেন গ্রহণ করছি এবং তা আমার নিজস্ব মূল্যবোধ ও পরিচয়ের সঙ্গে কোথায় গিয়ে মিলছে?
কারণ অনুকরণ আর গ্রহণ এক জিনিস নয়। অনুকরণে মানুষ নিজের বিচারবোধকে অন্যের হাতে তুলে দেয়; আর সচেতন গ্রহণে সে নিজের মূল্যবোধের আলোয় অন্যের অভিজ্ঞতাকে যাচাই করে।
তাই নিজের পথ চিনে নিন।
আপনি কোথা থেকে এসেছেন, আপনার চিন্তার ভিত্তি কোথায়, আপনার সমাজের মৌলিক মূল্যবোধ কী, কোন ঐতিহ্য আপনাকে নির্মাণ করেছে এবং ভবিষ্যতে আপনি কোন পরিচয় নিয়ে এগিয়ে যেতে চান, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিন।
শেকড় ভুলে আধুনিক হওয়া যায়, কিন্তু নিজের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে উন্নত হওয়া যায় না। আবার অতীতের মধ্যে বন্দী থেকেও কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না।
প্রয়োজন এমন এক পুনর্জাগরণের, যেখানে ঐতিহ্য হবে শেকড়, জ্ঞান হবে আলো, বিবেক হবে যাচাইয়ের মানদণ্ড এবং ভবিষ্যৎ হবে নির্মাণের ক্ষেত্র।
নিজের পথ চিনে নেওয়া মানে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং পৃথিবীর দিকে তাকিয়েও নিজের চোখে দেখা, অন্যের কাছ থেকে শিখেও নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করা এবং পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের মৌলিক পরিচয়কে হারিয়ে না ফেলা।
কারণ যে জাতি নিজের পথ নিজে নির্ধারণ করতে শেখে না, একসময় তার পথ অন্যরাই নির্ধারণ করে দেয়।