ইতিহাসের দ্বন্দ্বে আকিদা, চিন্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থের ভূমিকা-
ইসলামের ইতিহাসে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কিছু ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একদল মানুষ যেমন ভুল করেছেন, তেমনি ভুল করেন তাঁরাও, যাঁরা এসব দ্বন্দ্বের আকিদাগত দিককে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সেগুলোর কারণ হিসেবে কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়কে সামনে আনেন।
একইভাবে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত দ্বন্দ্বের ঘটনাগুলোকে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও একটি ভুল পদ্ধতি। নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেরণা মানুষের পারস্পরিক সংঘাতকে প্রভাবিত করে। তবে আকিদা, চিন্তাধারা ও আদর্শিক বিশ্বাসও এসব দ্বন্দ্বের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, অনেক ক্ষেত্রে যা মানুষের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
অতীতে বিষয়টি উপলব্ধি করা কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার প্রকাশ্য ধর্মীয় স্লোগান ও সুস্পষ্ট বক্তব্যের কারণে বিষয়টি অনেকের কাছে সহজবোধ্য হয়েছে। এসব বক্তব্যের মধ্যে কখনো প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক আকিদাগত সংঘাত এবং দীর্ঘদিনের সভ্যতাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মুসলিম পরিচয়ধারীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। গভীর আকিদাগত বিশ্বাস ও আদর্শিক অবস্থান মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করতে থাকে। মানুষ বৃহত্তর কোনো ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মের অন্তর্ভুক্ত হলেও তার পূর্ববর্তী বিশ্বাস ও আদর্শের প্রভাব অনেক সময় রয়ে যায়। তবে এর মাত্রা ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
আদর্শিক প্রেরণার বিষয়টি কেবল ধর্ম, মাজহাব কিংবা বৃহৎ রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ঈমান ও মুনাফিকি, সত্যবাদিতা ও মিথ্যাচার, বিনয় ও অহংকার, ন্যায়বিচার ও জুলুমের মতো নৈতিক বিষয়গুলোও ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও জাতির কর্মকাণ্ডকে সরাসরি প্রভাবিত করে। সত্যকে অপছন্দ করা, আল্লাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অনীহা প্রকাশ করা কিংবা সৎ ও পবিত্র জীবনযাপনকারীদের বিরোধিতা করার মতো প্রবণতাও মানুষের আচরণ ও সামাজিক দ্বন্দ্বে ভূমিকা রাখতে পারে।
যে ব্যক্তি মানবসমাজের দ্বন্দ্ব ও ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এসব বিশ্বাস, মানসিকতা ও নৈতিক প্রেরণাকে একেবারেই উপেক্ষা করেন, তিনি ইতিহাসের বাস্তবতাকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন। একই সঙ্গে, মানুষের আচরণ ও জাতিগুলোর উত্থান-পতনের পেছনে যেসব প্রেরণার কথা আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে তুলে ধরেছেন, সেগুলো উপলব্ধি করতেও তাঁর সীমাবদ্ধতা থেকে যেতে পারে।
অতএব মানবসমাজের দ্বন্দ্বকে বুঝতে হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি আকিদা, আদর্শ, নৈতিকতা এবং মানুষের অন্তর্গত প্রবণতাগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে কোনো নির্দিষ্ট সংঘাতের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রমাণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও যাচাই করা জরুরি।