হাদীস কীভাবে পড়ব: নববী বাণী বোঝার একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি
– সংকলনে: আব্দুল হাকীম মাদানী
কুরআনের পর ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও হাদীস। কুরআন আমাদের সামনে দ্বীনের মূলনীতি উপস্থাপন করে, আর নবী ﷺ তাঁর কথা, কাজ, অনুমোদন ও জীবনাচরণের মাধ্যমে সেই মূলনীতিগুলোর ব্যাখ্যা ও বাস্তব রূপ দেখিয়েছেন। তাই হাদীস পড়া মানে শুধু কিছু আরবী বাক্য, অনুবাদ কিংবা সুন্দর উপদেশ পড়া নয়; বরং নবী ﷺ-এর নির্দেশনা বুঝে নিজের বিশ্বাস, ইবাদত, চরিত্র ও জীবনকে সংশোধন করার চেষ্টা করা।
কিন্তু হাদীস পড়ার ক্ষেত্রেও একটি সঠিক পদ্ধতি প্রয়োজন। কারণ একটি হাদীসের অনুবাদ পড়েই তার পূর্ণ উদ্দেশ্য বোঝা সব সময় সম্ভব নয়। হাদীসটি সহীহ কি না, কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, এর ভাষা সাধারণ না বিশেষ, অন্য হাদীস ও কুরআনের আয়াতের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী এসব বিষয় বিবেচনা না করলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে।
প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, হাদীস কী? হাদীস বলতে সাধারণভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথা, কাজ, নীরব অনুমোদন এবং তাঁর দৈহিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বর্ণনাকে বোঝানো হয়। হাদীসের দুটি প্রধান অংশ রয়েছে। একটি হলো সনদ বা ইসনাদ (السند أو الإسناد), অর্থাৎ যেসব বর্ণনাকারীর মাধ্যমে হাদীসটি আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তাঁদের ধারাবাহিক পরিচয়। অন্যটি হলো মাতন (المتن), অর্থাৎ হাদীসের মূল বক্তব্য বা বর্ণিত ঘটনা।
মুহাদ্দিসগণ (المحدّثون) শুধু হাদীসের ভাষা দেখেই তা গ্রহণ করেননি; বরং প্রত্যেক বর্ণনাকারীর সততা, স্মরণশক্তি, পরস্পরের সাক্ষাৎ, বর্ণনার ধারাবাহিকতা এবং হাদীসের ভেতরে কোনো সূক্ষ্ম ত্রুটি আছে কি না এসব কঠোরভাবে যাচাই করেছেন। সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সনদের ধারাবাহিকতা, বর্ণনাকারীদের ন্যায়পরায়ণতা ও নির্ভুলতা এবং শুযূয (الشذوذ) ও গোপন ত্রুটি বা ইল্লত (العلة) থেকে মুক্ত থাকা বিবেচিত হয়।
সুতরাং হাদীস পড়ার প্রথম শিক্ষা হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে প্রচারিত প্রতিটি কথাই হাদীস নয়, আর প্রতিটি বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতাও একই স্তরের নয়।
হাদীস অধ্যয়নের শুরু হওয়া উচিত বিশুদ্ধ নিয়ত দিয়ে। নিয়ত (النية) হওয়া উচিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, সত্য জানা, নবী ﷺ-এর অনুসরণ এবং নিজের আমল সংশোধন করা। শুধু বিতর্কে জয়ী হওয়া, অন্যকে ভুল প্রমাণ করা, চমকপ্রদ বক্তব্য প্রচার করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হওয়ার জন্য হাদীস পড়লে জ্ঞানের বরকত নষ্ট হতে পারে।
হাদীস পড়ার আগে অন্তরে প্রশ্ন করা উচিত আমি এ হাদীস থেকে কী শিখতে চাই? এটি আমার ঈমান ও চরিত্রে কী পরিবর্তন আনবে? আমি কি সত্য জানার জন্য পড়ছি, নাকি নিজের পূর্বধারণার সমর্থন খুঁজছি? হাদীসকে নিজের মতের পক্ষে দলীল বানানোর পরিবর্তে নিজের চিন্তা ও জীবনকে হাদীসের আলোকে সংশোধন করতে হবে।
বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, পোস্টার কিংবা বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে অসংখ্য কথা প্রচারিত হয়। কোনো বক্তব্য আবেগপূর্ণ বা নৈতিকভাবে সুন্দর হলেই সেটিকে হাদীস বলা যায় না। হাদীস গ্রহণ বা প্রচারের আগে অন্তত জানতে হবে হাদীসটি কোন গ্রন্থে আছে, এর অধ্যায় বা নম্বর কী, মুহাদ্দিসগণ একে সহীহ, হাসান, দুর্বল না জাল বলেছেন এবং অনুবাদটি মূল আরবীর যথার্থ অর্থ প্রকাশ করছে কি না।
হাদীসের গ্রহণযোগ্যতার স্তর বুঝতেও কিছু মৌলিক পরিভাষা জানা দরকার। সহীহ (الصحيح) ও হাসান (الحسن) হাদীস সাধারণভাবে দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। দুর্বল বা যঈফ হাদীস (الحديث الضعيف) ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও শর্ত রয়েছে। আর জাল বা মওযূ হাদীস (الحديث الموضوع) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে প্রচার করা সম্পূর্ণ অনুচিত। বিশেষত দুর্বল হাদীসকে নিশ্চিতভাবে ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন’ বলে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। দুর্বল বর্ণনার ক্ষেত্রে এর দুর্বলতা উল্লেখ করা নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পদ্ধতি।
হাদীস পড়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বর্ণনা পড়া অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় একটি দীর্ঘ হাদীস থেকে একটি বাক্য আলাদা করে প্রচার করা হয়। এতে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে হাদীসের আগের ও পরের অংশসহ সম্পূর্ণ বর্ণনা পড়তে হবে। দেখতে হবে, প্রশ্নটি কে করেছিলেন, নবী ﷺ কাকে উত্তর দিয়েছিলেন, কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটেছিল কি না, বক্তব্যটি সাধারণ নির্দেশনা না নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সমাধান এবং হাদীসের শেষে কোনো ব্যতিক্রম বা শর্ত আছে কি না।
একটি বাক্যকে তার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করলে অনেক সময় কঠোর বক্তব্য কোমল অর্থে কিংবা বিশেষ বিধান সাধারণ বিধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এ কারণে সিয়াক ও সাবাক (السياق والسباق), অর্থাৎ বক্তব্যের পূর্বাপর প্রেক্ষাপট বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাদীস বুঝতে হলে কুরআনের আলোও সামনে রাখতে হবে। সহীহ হাদীস কখনো কুরআনের প্রকৃত শিক্ষার বিরোধী হয় না। কারণ কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ উভয়ই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত হিদায়াতের অংশ। তাই একটি হাদীস পড়লে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কুরআন কী বলেছে। যেমন দয়া, ন্যায়বিচার, ক্ষমা, পরিবার, যুদ্ধ, শাস্তি কিংবা সামাজিক সম্পর্কের কোনো হাদীস বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট কুরআনিক নীতিগুলোও সামনে রাখতে হবে।
তবে ‘আমার বোঝা অনুযায়ী এটি কুরআনের বিরোধী’ এমন ধারণার ভিত্তিতে সহীহ হাদীস প্রত্যাখ্যান করা ঠিক নয়। বরং নিজের বোঝার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে।
একই বিষয়ের সব হাদীস একসঙ্গে পড়াও জরুরি। একটি বিষয়ে শুধু একটি হাদীস পড়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অনেক সময় ভুল হতে পারে। কারণ কোনো হাদীসে মূলনীতি বলা হয়েছে, অন্য হাদীসে তার শর্ত, ব্যতিক্রম বা প্রয়োগের সীমা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একটি হাদীসে কোনো কাজের উৎসাহ থাকতে পারে, অন্য হাদীসে অতিরঞ্জন বা সীমালঙ্ঘনের নিষেধ থাকতে পারে। একটি হাদীসে সাধারণ নির্দেশ আসতে পারে, আর অন্যটিতে বিশেষ পরিস্থিতির বিধান থাকতে পারে।
এই কারণে মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ (الفقهاء) একই বিষয়ে বর্ণিত সব দলীল সংগ্রহ করে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করেন। এটিকে বলা হয় জাম‘ ও তাওফীক (الجمع والتوفيق), অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন মনে হওয়া দলীলগুলোর মধ্যে সঠিক সামঞ্জস্য স্থাপন করা। সুতরাং হাদীস পড়ার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতির বদলে বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়ন বেশি উপকারী।
নবী ﷺ-এর ভাষার ধরন বোঝাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরবী ভাষা গভীর, অলংকারসমৃদ্ধ ও প্রসঙ্গনির্ভর। নবী ﷺ কখনো সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন, কখনো উপমা ব্যবহার করেছেন, কখনো সতর্ক করার জন্য কঠোর ভাষা বলেছেন, আবার কখনো কোনো কাজের গুরুত্ব বোঝাতে শক্তিশালী বাগরীতি ব্যবহার করেছেন।
তাই হাদীসের প্রতিটি শব্দ সব সময় আক্ষরিক অর্থে নেওয়া যায় না। দেখতে হবে, এটি আক্ষরিক বক্তব্য, না রূপক বা উপমা। এটি আদেশ, উৎসাহ, সতর্কতা না অনুমতি। আদেশটি ফরয বোঝায়, না মুস্তাহাব। নিষেধটি হারাম বোঝায়, না মাকরূহ। এসব নির্ধারণ করা উসূলুল ফিকহ (أصول الفقه) ও আরবী ভাষাবিজ্ঞানের বিষয়। সাধারণ পাঠকের উচিত একক অনুবাদের ওপর ভিত্তি করে নিজে নিজে চূড়ান্ত বিধান ঘোষণা না করা।
হাদীসের ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট জানাও জরুরি। কিছু হাদীস নির্দিষ্ট যুদ্ধ, চুক্তি, গোত্র, ব্যক্তি, রোগ, ভ্রমণ কিংবা সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই প্রেক্ষাপট না জানলে হাদীসের উদ্দেশ্য ভুলভাবে বোঝা হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো নির্দেশ যদি যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা, বিচারিক ক্ষমতা বা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, সেটিকে ব্যক্তিগত জীবনে স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। আবার বিশেষ কোনো ব্যক্তির অবস্থার ভিত্তিতে দেওয়া পরামর্শ সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। প্রেক্ষাপট জানা মানে হাদীসের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া নয়; বরং নবী ﷺ-এর উদ্দেশ্য আরও যথাযথভাবে বোঝা।
হাদীস বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরামের উপলব্ধি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাহাবীগণ (الصحابة) নবী ﷺ-এর ভাষা, পরিবেশ, ঘটনা ও উদ্দেশ্য সরাসরি দেখেছেন। তাই তাঁরা কোনো হাদীস কীভাবে বুঝেছেন এবং বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করেছেন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো হাদীসের এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা সাহাবীদের পরিচিত বোঝাপড়া ও আমলের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁদের পর তাবেয়ীগণ (التابعون), তাবে-তাবেয়ীগণ (أتباع التابعين) এবং স্বীকৃত ইমামদের ব্যাখ্যাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবে ‘সালাফ বুঝেছেন’ বলে কোনো যাচাইহীন বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। তাঁদের নামে উদ্ধৃতি দিলেও উৎস পরীক্ষা করতে হবে।
শুধু হাদীসের অনুবাদ পড়া প্রাথমিক স্তরের জন্য উপকারী; কিন্তু গভীর বোঝাপড়ার জন্য স্বীকৃত শরহ (الشرح), অর্থাৎ ব্যাখ্যাগ্রন্থ পড়া জরুরি। প্রসিদ্ধ শরহগুলোর মধ্যে রয়েছে সহীহ বুখারীর জন্য ইবনু হাজার আল-আসকালানীর ফাতহুল বারী (فتح الباري), সহীহ মুসলিমের জন্য ইমাম নববীর শরহ সহীহ মুসলিম (شرح صحيح مسلم), বুলূগুল মারামের জন্য সুবুলুস সালাম (سبل السلام) এবং মিশকাতুল মাসাবীহের জন্য মিরকাতুল মাফাতীহ (مرقاة المفاتيح)।
ব্যাখ্যাগ্রন্থে সাধারণত শব্দার্থ, সনদের আলোচনা, প্রেক্ষাপট, ফিকহী শিক্ষা, আলেমদের মতভেদ এবং অন্যান্য হাদীসের সঙ্গে সমন্বয় পাওয়া যায়। তাই কোনো হাদীসের গভীর অর্থ বুঝতে হলে শুধু অনুবাদ নয়, শরহও পড়তে হবে।
হাদীস পড়ে ব্যক্তিগত উপদেশ গ্রহণ করা এবং শরীয়তের চূড়ান্ত বিধান নির্ধারণ করা এক বিষয় নয়। নামায, তালাক, উত্তরাধিকার, ব্যবসা, শাস্তি, আকীদা কিংবা হালাল-হারামের জটিল বিষয়ে একটি অনুবাদ পড়েই ফতোয়া দেওয়া বিপজ্জনক।
কারণ ফিকহী সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট সব আয়াত ও হাদীস, সহীহতা ও দালালাত, সাধারণ ও বিশেষ বক্তব্যের পার্থক্য, রহিত ও রহিতকারী বিধান, ইজমা, সাহাবীদের আমল, ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঠিক বিবরণ জানা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে নাসিখ ও মানসুখ (الناسخ والمنسوخ), আম ও খাস (العام والخاص), মুতলাক ও মুকাইয়্যাদ (المطلق والمقيد), ইজমা (الإجماع) এবং দালালাত (الدلالة)-এর মতো বিষয়ও বিবেচনায় আসে। তাই জটিল মাসআলায় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতীর কাছে ফিরে যেতে হবে।
হাদীস পড়ার সময় অনুবাদের সীমাবদ্ধতাও উপলব্ধি করতে হবে। অনুবাদ মূল বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা মাত্র। একই আরবী শব্দ প্রসঙ্গভেদে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। যেমন ঈমান (الإيمان), কুফর (الكفر), ফিতনা (الفتنة), জিহাদ (الجهاد), উম্মাহ (الأمة), সুন্নাহ (السنة), বিদআত (البدعة), তাকওয়া (التقوى) ও নিফাক (النفاق) এসব শব্দকে শুধু একটি বাংলা বা ইংরেজি শব্দ দিয়ে সম্পূর্ণ প্রকাশ করা কঠিন।
তাই সম্ভব হলে আরবী মূল পাঠ দেখা, গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ জানা, একাধিক নির্ভরযোগ্য অনুবাদ তুলনা করা এবং ব্যাখ্যাগ্রন্থে শব্দটির ব্যবহার দেখা উচিত। আরবী না জানলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বিশ্বস্ত অনুবাদ ও শরহের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গভীরতা অর্জন করা যায়।
হাদীসকে বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। হাদীস চিরন্তন হিদায়াত প্রদান করে; কিন্তু প্রতিটি হাদীসের বাস্তব প্রয়োগে ব্যক্তি, সময়, স্থান, সামর্থ্য ও পরিণতি বিবেচনা করতে হয়।
একটি হাদীসে কোনো নৈতিক আদর্শ থাকলে তা সরাসরি গ্রহণ করা যায়। কিন্তু চিকিৎসা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ, বিচার কিংবা সামাজিক ব্যবস্থার জটিল বিষয়ে প্রয়োগের জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞানও প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসাবিষয়ক কোনো হাদীস পড়ে আধুনিক চিকিৎসা সম্পূর্ণ বর্জন করা, কিংবা বিচারসংক্রান্ত হাদীস পড়ে ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি কার্যকর করা হাদীস বোঝার সঠিক পদ্ধতি নয়। হাদীস আমাদের নীতি দেয়; সেই নীতির সঠিক প্রয়োগের জন্য জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বৈধ কর্তৃত্ব দরকার।
হাদীস পড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি প্রথমে নিজের জন্য পড়া। আমরা অনেক সময় এমনভাবে হাদীস পড়ি যেন প্রতিটি সতর্কবাণী অন্য মানুষের জন্য। অহংকারের হাদীস পড়ে অহংকারী বন্ধুকে মনে করি, গীবতের হাদীস পড়ে আত্মীয়কে মনে করি, মুনাফিকের আলামত পড়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মনে করি।
কিন্তু হাদীসের প্রথম শ্রোতা হওয়া উচিত নিজেই। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে এ হাদীসের কোন শিক্ষা আমার মধ্যে অনুপস্থিত? আমার কোন অভ্যাস সংশোধন করা দরকার? আমি কি শুধু জ্ঞান সংগ্রহ করছি, না আমলও করছি? আমার আচরণে নববী আদর্শ কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে? যে হাদীস আমাদের অন্যের বিচারক বানায় কিন্তু নিজের সংশোধন ঘটায় না, সেই পাঠ এখনো হৃদয়ে পৌঁছায়নি।
হাদীসের ব্যাখ্যা ও ফিকহী প্রয়োগে মতভেদ থাকতে পারে। একই সহীহ হাদীসের ব্যাখ্যা বা প্রয়োগে স্বীকৃত আলেমদের মধ্যে মতভেদ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ তাঁরা ভাষা, অন্য দলীল, প্রেক্ষাপট কিংবা উসূলের ভিত্তিতে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন।
প্রত্যেক মতভেদ মানেই কেউ হাদীস অস্বীকার করছেন এমন নয়। তাই মতভেদের ক্ষেত্রে বিরোধী মতকে বিকৃত করা, আলেমদের অসম্মান করা, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা কিংবা নিজের পছন্দকে একমাত্র ইসলাম বলে উপস্থাপন করা উচিত নয়। শক্তিশালী দলীল ও স্বীকৃত গবেষণার ভিত্তিতে মত গ্রহণ করতে হবে। হাদীসের জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করবে; উদ্ধত ও ঝগড়াটে নয়।
হাদীস মুখস্থ করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। কিন্তু শুধু শব্দ মুখস্থ করাই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। একটি ছোট হাদীস বুঝে জীবনে বাস্তবায়ন করা কখনো অনেক হাদীস মুখস্থ করে অবহেলা করার চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
প্রতিটি হাদীস পড়ে চারটি বিষয় মনে রাখা যেতে পারে। প্রথমত, হাদীসটির মূল বক্তব্য কী। দ্বিতীয়ত, এটি আল্লাহ, আখিরাত বা ঈমান সম্পর্কে কী শিক্ষা দেয়। তৃতীয়ত, এটি কোন গুণ অর্জন বা কোন দোষ পরিত্যাগ করতে বলে। চতুর্থত, আজ থেকেই এর আলোকে নিজের জীবনে কী পরিবর্তন আনা যায়। এভাবে হাদীস কেবল বইয়ের পাতায় থাকবে না; জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।
একজন সাধারণ পাঠক প্রতিদিন একটি হাদীস নিয়ে একটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। প্রথমে আরবী মূলসহ বা বিশ্বস্ত অনুবাদে হাদীসটি পড়বেন। এরপর গ্রন্থ, অধ্যায় ও হাদীস নম্বর লিখে রাখবেন। তারপর হাদীসটি সহীহ, হাসান না দুর্বল, নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের মূল্যায়ন দেখবেন। এরপর এর পূর্বাপর প্রেক্ষাপট জানবেন, একটি স্বীকৃত শরহ থেকে ব্যাখ্যা পড়বেন, একই বিষয়ে অন্য আয়াত ও হাদীস কী বলছে তা দেখবেন এবং শেষে হাদীস থেকে কয়েকটি শিক্ষা লিখে নিজের জন্য একটি আমল নির্ধারণ করবেন।
নতুন পাঠকের জন্য বিষয়ভিত্তিক ও ব্যাখ্যাসহ হাদীসগ্রন্থ বেশি উপযোগী। যেমন ইমাম নববীর চল্লিশ হাদীস বা আল-আরবাঈন আন-নববিয়্যাহ (الأربعون النووية), রিয়াদুস সালিহীন (رياض الصالحين), আল-আদাবুল মুফরাদ (الأدب المفرد), শামায়িলে তিরমিযী (الشمائل المحمدية), এবং শিক্ষকের সহায়তায় বুলূগুল মারাম (بلوغ المرام) পড়া যেতে পারে।
একেবারে শুরুতেই সহীহ বুখারী বা সহীহ মুসলিম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একা পড়তে গেলে অনেক পাঠক অধ্যায়বিন্যাস, পুনরাবৃত্তি, ফিকহী ইঙ্গিত ও সনদগত বিষয় বুঝতে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাই শিক্ষক, পাঠচক্র কিংবা নির্ভরযোগ্য শরহের সহায়তায় পড়া উত্তম।
হাদীস পড়ার সময় কিছু প্রচলিত ভুল বিশেষভাবে এড়ানো জরুরি। উৎস ছাড়া হাদীস শেয়ার করা, দুর্বল বা জাল বর্ণনাকে সহীহ বলা, একটি বাক্য কেটে প্রচার করা, অনুবাদকে আরবী মূলের সমান মনে করা, একটি হাদীস দিয়ে সব দলীল বাতিল করা, প্রেক্ষাপট ছাড়া কঠোর সিদ্ধান্ত দেওয়া, ব্যক্তিগত মতকে নবী ﷺ-এর উদ্দেশ্য বলে উপস্থাপন করা, আলেমদের ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে নিজে নিজে ফতোয়া দেওয়া এবং শুধু আবেগ গ্রহণ করে আমল না করা এসবই হাদীস অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বড় ভুল।
হাদীসকে মানুষ আক্রমণের অস্ত্র বানানোও সঠিক নয়। হাদীস এসেছে হৃদয় সংশোধন করতে, সম্পর্ক নষ্ট করতে নয়; ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে, অহংকার বাড়াতে নয়; মানুষকে হিদায়াতের পথে আনতে, অপমান করতে নয়।
হাদীস পড়া একটি ইবাদত, একটি আমানত এবং নবী ﷺ-এর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য পথ। কিন্তু এই পথের সৌন্দর্য তখনই প্রকাশিত হয়, যখন আমরা হাদীসকে শুধু উদ্ধৃতি হিসেবে নয়, হিদায়াত হিসেবে গ্রহণ করি।
সঠিকভাবে হাদীস পড়ার অর্থ হলো প্রথমে এর বিশুদ্ধতা যাচাই করা, তারপর ভাষা ও প্রেক্ষাপট বোঝা, কুরআন ও অন্যান্য হাদীসের সঙ্গে সমন্বয় করা, সাহাবী ও স্বীকৃত আলেমদের ব্যাখ্যা জানা এবং শেষে নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করা।
হাদীসের প্রতি ভালোবাসা শুধু বেশি বেশি হাদীস শেয়ার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত ভালোবাসা হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাণীকে সততার সঙ্গে জানা, ভুলভাবে তাঁর নামে কিছু না বলা, তাঁর নির্দেশনার সামনে নিজের অহংকার নত করা এবং তাঁর চরিত্রকে নিজের জীবনের আদর্শ বানানো।
আমরা যেন হাদীসকে শুধু মুখ- জিহ্বা দিয়ে না পড়ি; জ্ঞান দিয়ে বুঝি, হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করি এবং জীবন দিয়ে তার সাক্ষ্য দিই। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হাদীসের ছাত্র হওয়ার তৌফীক্ব দান করুন। আমীন!
২৭ শে জুলাই, ২০২৬
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।