রাসূলুল্লাহ ﷺ দাফনের পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন, سلوا له التثبيت، فإنه الآن يُسأل -তোমরা তার জন্য দৃঢ়তা (সাবিত থাকা) কামনা করো, কারণ এখন তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, দাফনের পর মৃত ব্যক্তি দোয়ার সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী। তাই যখন আমরা জানাজায় অংশ নিই, তখন আমরা তার জন্য দোয়া করি, তাকে ডাকি না; আমরা তার জন্য সুপারিশ করি, তার মাধ্যমে সুপারিশ চাই না। সুতরাং দাফনের পর তার জন্য দোয়া করা আরও বেশি প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত।
কিন্তু বিদআত ও শিরকের লোকেরা আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। তারা মৃতের জন্য দোয়া করার পরিবর্তে মৃতকেই ডাকা শুরু করেছে; তার জন্য সুপারিশ করার পরিবর্তে তার মাধ্যমে সুপারিশ চাওয়া শুরু করেছে। অথচ কবর জিয়ারতের যে উদ্দেশ্য রাসূল ﷺ নির্ধারণ করেছিলেন, তা হলো মৃতের উপকার করা, জিয়ারতকারীর উপকার করা এবং আখিরাত স্মরণ করা। কিন্তু তারা সেই জিয়ারতকে পরিবর্তন করে ফেলেছে মৃতের কাছে চাওয়া, তাকে দিয়ে আল্লাহর কাছে কসম করা, এবং সেই স্থানকে বিশেষভাবে দোয়ার জন্য নির্ধারণ করার মাধ্যমে; যেখানে তাদের অন্তর উপস্থিতি ও বিনয় মসজিদ বা শেষ রাতের সময়ের চেয়েও বেশি হয়ে থাকে!
এটা কখনোই সম্ভব নয় যে মৃতদের ডাকা, তাদের মাধ্যমে দোয়া করা বা তাদের কাছে দোয়া করা এসব কিছু শরীয়তসম্মত ও সৎকর্ম হবে, অথচ রাসূল ﷺ-এর স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ তিন প্রজন্ম (সাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন) তা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবে; আর পরে আসা লোকেরা, যারা বলে কিন্তু আমল করে না, এবং যা করতে বলা হয়নি তা করে; তারাই এ আমল করবে!
রাসূল ﷺ তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে কবরবাসীদের ব্যাপারে এই সুন্নাহর উপরই ছিলেন। তাঁর খলিফাগণ, সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের অনুসারীরাও একই পথে চলেছেন। পৃথিবীতে কি কেউ এমন একটি সহীহ, হাসান, দুর্বল বা এমনকি বিচ্ছিন্ন বর্ণনাও দেখাতে পারবে, যেখানে প্রমাণ পাওয়া যায় যে তারা কোনো প্রয়োজন হলে কবরের কাছে গিয়ে দোয়া করতেন, কবর স্পর্শ করতেন, সেখানে সালাত পড়তেন, কবরবাসীর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কিছু চাইতেন, অথবা সরাসরি তাদের কাছেই প্রয়োজন পূরণের আবেদন করতেন?
তারা একটি মাত্র প্রমাণও দেখাতে পারবে না। বরং পরবর্তী যুগের লোকদের কাছ থেকে এ ধরনের অনেক কিছু পাওয়া যায়। সময় যত গড়িয়েছে, এসব কাজ ততই বেড়েছে। এমনকি এ বিষয়ে বহু বইও লেখা হয়েছে, যেখানে রাসূল ﷺ, তাঁর খলিফাগণ বা সাহাবাদের পক্ষ থেকে একটি শব্দও নেই!
যদি কবরের কাছে দোয়া করা, সেখানে সালাত পড়া বা বরকত নেওয়া এসব কোনো ফযীলত, সুন্নাহ বা জায়েয কাজ হতো, তাহলে মুহাজির ও আনসার সাহাবাগণ অবশ্যই তা প্রতিষ্ঠা করতেন এবং পরবর্তীদের জন্য তা রেখে যেতেন। কিন্তু তারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং দ্বীন সম্পর্কে পরবর্তীদের তুলনায় অনেক বেশি জ্ঞানী ছিলেন।
তাবেঈনরাও একই পথ অনুসরণ করেছেন। তাদের যুগে বিভিন্ন শহরে সাহাবাদের অনেক কবর ছিল, অথচ তাদের মধ্যে কেউ কোনো সাহাবীর কবরের কাছে গিয়ে সাহায্য চায়নি, তাকে ডাকেনি, তার মাধ্যমে দোয়া করেনি, সেখানে দোয়া করেনি, তার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করেনি বা সাহায্য কামনা করেনি।
এ ধরনের বিষয় মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এগুলো অবশ্যই প্রচারিত ও সংরক্ষিত হতো বরং এর চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে।
তাই বিষয়টি দুই অবস্থার একটিই হতে পারে; হয় কবরের কাছে দোয়া করা অন্য জায়গার চেয়ে উত্তম, অথবা তা নয়।
যদি উত্তম হতো, তাহলে কীভাবে সাহাবা ও তাবেঈনরা তা জানতেন না? তাহলে কি এমন হবে যে শ্রেষ্ঠ তিন যুগ এ মহান ফযীলত থেকে অজ্ঞ থাকবে, আর পরবর্তী লোকেরা তা জানবে? এটা যুক্তি ও শরীয়ত উভয় দিক থেকেই অসম্ভব।
আর এটাও সম্ভব নয় যে তারা তা জানতেন কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তা পরিত্যাগ করেছেন, কারণ তারা প্রতিটি কল্যাণের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন, বিশেষ করে দোয়ার ক্ষেত্রে। একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ সামান্য সম্ভাবনাও ছাড়ে না, যদিও তাতে কিছু অপছন্দনীয় বিষয় থাকে। তাহলে তারা কবরের কাছে দোয়ার ফযীলত জানার পরও কেন তা ত্যাগ করবেন?
অতএব স্পষ্ট হলো কবরের কাছে দোয়া করার কোনো বিশেষ ফযীলত নেই; এটি শরীয়তসম্মত নয়, বরং এটি এমন একটি মাধ্যম যা মানুষকে বড় ধরনের বিপদের দিকে নিয়ে যায়। এ ধরনের কাজ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কখনো শরীয়ত হিসেবে নির্ধারণ করেননি। বরং কবরকে বিশেষভাবে দোয়ার স্থান বানানো, এটি এমন এক ইবাদত উদ্ভাবন করা, যার কোনো ভিত্তি নেই।
সাহাবাগণ এর চেয়েও ছোট বিষয়কে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। যে ব্যক্তি রাসূল ﷺ-এর দাওয়াত এবং আজকের যুগের শিরক ও বিদআতের চর্চা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, সে স্পষ্ট বুঝতে পারবে সালাফদের পথ এবং পরবর্তীদের পথের মাঝে দূরত্ব পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি। তারা এক পথে, আর সালাফরা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে ছিলেন।
-তথ্যসূত্র: ইমাম ইবনুল কইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)রচিত ইগাছাতুল লাহফান।
ভাষান্তরে: আব্দুল হাকীম মাদানী।






![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/নবী-ﷺ-এমন-এক-সময়ের-কথা-উল্লেখ-করেছেন-350x250.jpg)






