মৃত্যু মানুষের জীবনের এমন এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা, যার সামনে পৃথিবীর কোনো শক্তি, সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা প্রযুক্তি মানুষকে স্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)। মৃত্যু কখন, কোথায় এবং কীভাবে আসবে তা কেউ জানে না। তাই একজন মুমিনের জন্য মৃত্যুর চিন্তা হতাশার কারণ নয়; বরং এটি জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার অর্থ দুনিয়া ছেড়ে দেওয়া কিংবা দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, দুনিয়ায় অবস্থান করেও আখিরাতকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে মনে রাখা। মানুষ সাধারণত ভবিষ্যতের পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে, বাড়ি, গাড়ি ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ পরিকল্পনা করে; অথচ যে সফরটি নিশ্চিত এবং যার সময় সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, সেই সফরের প্রস্তুতিই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়।
মৃত্যুর প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হলো সঠিক ঈমান ও তাওহীদ। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা হিসেবে জীবনযাপন করা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ অনুযায়ী চলার চেষ্টা করা একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে তার সম্পদ, পদবি কিংবা সামাজিক পরিচয় যাবে না; তার সঙ্গে যাবে তার ঈমান ও আমল।
এরপর আসে ফরজ ইবাদতের প্রতি যত্নশীল হওয়া। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমজানের সিয়াম, যাকাত ও অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করা এবং হারাম থেকে নিজেকে বাঁচানো মৃত্যুর প্রস্তুতির মৌলিক অংশ। শুধু বেশি নফল আমল করাই যথেষ্ট নয়; বরং ফরজকে অবহেলা করে নফল আমলে ব্যস্ত হওয়া একজন বিচক্ষণ মুমিনের পদ্ধতি হতে পারে না।
মৃত্যুর প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাওবা। মানুষ ভুল করবে, এটাই মানবিক বাস্তবতা। কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। গুনাহকে ছোট মনে না করে দ্রুত তাওবা করা, অন্যায় ছেড়ে দেওয়া এবং পুনরায় সে পথে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করা জরুরি। কারণ কেউ জানে না, কোন গুনাহের পর তার জীবনের শেষ মুহূর্ত এসে যাবে।
একইভাবে মানুষের হক বা অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, ঋণ রেখে যাওয়া, কারও প্রতি জুলুম করা, গীবত ও অপবাদ দেওয়া কিংবা কারও মনে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া, এসব বিষয় মৃত্যুর পরও মানুষের জন্য দায় হয়ে থাকতে পারে। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি মানে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং মানুষের সঙ্গে সম্পর্কও সংশোধন করা। কারও কাছে ঋণ থাকলে তা পরিশোধের চেষ্টা করা, আমানত ফিরিয়ে দেওয়া এবং কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে যথাসম্ভব তা সংশোধন করা প্রয়োজন।
মৃত্যুর প্রস্তুতির একটি বড় দিক হলো দুনিয়ার মোহকে নিয়ন্ত্রণ করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমরা অধিক পরিমাণে মৃত্যুকে স্মরণ করো, যা সমস্ত আনন্দ স্বাদ বিনষ্টকারী।” মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে দায়িত্বশীল করে, অহংকার কমায়, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আখিরাতের জন্য আমল করতে উৎসাহিত করে। তবে মৃত্যুর স্মরণ এমন হওয়া উচিত নয় যে মানুষ হতাশ হয়ে দুনিয়ার বৈধ দায়িত্ব পরিত্যাগ করবে; বরং এটি হওয়া উচিত আত্মশুদ্ধি ও সৎকর্মের প্রেরণা।
মৃত্যুর প্রস্তুতির মধ্যে উইল ও আর্থিক দায়িত্বের বিষয়টিও রয়েছে। বিশেষ করে কারও ঋণ, আমানত, পাওনা দেনা কিংবা শরিয়তসম্মত ওসিয়ত থাকলে তা স্পষ্টভাবে লিখে রাখা বিচক্ষণতার পরিচয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে মৃত্যুর পর পরিবারের মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা কমে এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষিত থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি কোনো নির্দিষ্ট বয়সের বিষয় নয়। তরুণ, বৃদ্ধ, সুস্থ কিংবা অসুস্থ, কারও জন্যই মৃত্যুর নিশ্চয়তার সঙ্গে বয়সের কোনো চুক্তি নেই। কত মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি, কত মানুষ সুস্থ অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে আর জাগেনি, এসব বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যু বার্ধক্যের জন্য অপেক্ষা করে না।
তাই বুদ্ধিমান মানুষ সেই ব্যক্তি নয়, যে শুধু দীর্ঘ জীবন পাওয়ার পরিকল্পনা করে; বরং বুদ্ধিমান সে, যে দীর্ঘ জীবন পেলে তা নেক আমলে ব্যয় করে এবং কখনো যদি মৃত্যু এসে যায়, তখনও যেন আল্লাহর সামনে যাওয়ার মতো কিছু প্রস্তুত থাকে। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, “আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হয়, আমি কি আমার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত?”
মৃত্যু শেষ নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে এটি দুনিয়ার জীবন থেকে আখিরাতের জীবনে প্রবেশের দ্বার। তাই মৃত্যুকে ভয় করার চেয়ে মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়াই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এমনভাবে জীবনযাপন করা উচিত, যেন মৃত্যু আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও আমরা তার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত না থাকি।
আজকের দিনটিই আমাদের হাতে। আগামীকাল আমাদের হাতে নাও থাকতে পারে। তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি আগামীকাল থেকে নয়, আজ থেকেই।