আবু হুরায়রা (রা.)-এর মায়ের প্রতি সদাচরণ ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা-
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর মায়ের প্রতি যে উত্তম আচরণ ও কল্যাণকামিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হলো, তিনি তাঁর মায়ের ইসলাম গ্রহণের জন্য কতটা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁর হিদায়াতের জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে দোয়া চেয়েছিলেন।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর মায়ের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তাঁর মা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি বারবার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাতেন। কিন্তু তাঁর মা যখনই তিনি তাঁকে ইসলামের দিকে ডাকতেন, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলতেন, যা আবু হুরায়রা (রা.)-কে কষ্ট দিত।
একদিন মায়ের এই অবস্থায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে ঘর থেকে বের হয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে গেলেন। তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দান করেন।”
তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ দোয়া করলেন:
اللَّهُمَّ اهْدِ أُمَّ أَبِي هُرَيْرَةَ
“হে আল্লাহ! আবু হুরায়রার মাকে হিদায়াত দান করুন।”
আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দোয়া নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত মনে বাড়িতে ফিরে এলেন। দরজার কাছে পৌঁছে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে তাঁর মা বললেন, “একটু অপেক্ষা করো।” তিনি গোসল করলেন, পোশাক পরলেন, তারপর বাইরে এসে বললেন:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসুল।”
নিজের মায়ের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ শুনে আবু হুরায়রা (রা.) আনন্দে আত্মহারা হয়ে দ্রুত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে ফিরে গেলেন এবং তাঁকে এই সুসংবাদ জানালেন।
এরপর তিনি আরেকটি দোয়ার আবেদন করলেন। বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি আবু হুরায়রা ও তাঁর মাকে মুমিনদের কাছে প্রিয় করে দেন এবং মুমিনদেরও তাঁদের কাছে প্রিয় করে দেন।”
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদের জন্য দোয়া করলেন।
আবু হুরায়রা (রা.) নিজেও দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي هُرَيْرَةَ وَلِأُمِّهِ وَلِمَنْ دَعَا لَهُمَا
“হে আল্লাহ! আবু হুরায়রা, তাঁর মা এবং তাঁদের দুজনের জন্য যারা দোয়া করেন, তাঁদের সবাইকে ক্ষমা করুন।”
সালাফদের কেউ কেউ এই দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশায় বলতেন, “হে আল্লাহ! আবু হুরায়রা ও তাঁর মাকে ক্ষমা করুন।”
আল্লাহ আবু হুরায়রা (রা.), তাঁর মা এবং সকল মুসলিম নর-নারীকে ক্ষমা করুন। আমিন।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়-
১. মা-বাবার হিদায়াতের জন্য চেষ্টা করা সদাচরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আবু হুরায়রা (রা.) তাঁর মায়ের ইসলাম গ্রহণের জন্য বারবার চেষ্টা করেছেন এবং তাঁর হিদায়াতের জন্য দোয়া করেছেন।
২. দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্য জরুরি। একবার আহ্বান জানিয়ে ফল না পেলেও হতাশ হওয়া উচিত নয়। সুন্দর আচরণ, আন্তরিকতা ও দোয়ার মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
৩. হিদায়াত আল্লাহর হাতে। মানুষ উপদেশ দিতে পারে, সত্যের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু অন্তরকে হিদায়াত দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। তাই দাওয়াতের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা জরুরি।
৪. নেককার মানুষের দোয়ার মূল্য অনেক। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দোয়ার পর আবু হুরায়রা (রা.)-এর মা ইসলাম গ্রহণ করেন। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দোয়ার গুরুত্বের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
৫. নিজের জন্য যেমন দোয়া করবেন, অন্যের জন্যও করবেন। আবু হুরায়রা (রা.) শুধু নিজের ও মায়ের ক্ষমার জন্য দোয়া করেননি, বরং তাঁদের জন্য যারা দোয়া করবেন, তাঁদেরও নিজের দোয়ায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এটি মুসলিমদের প্রতি তাঁর উদারতা ও কল্যাণকামিতার পরিচয়।
সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৪৯১। হাদীস নম্বর সংস্করণভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।