আমাদের সন্তান ও দ্বীনি জ্ঞান: আমরা কী দিচ্ছি তাদের?
একজন অভিভাবক একদিন আক্ষেপ করে বলছিলেন, সন্তানদের সঙ্গে বসে অযূ, সালাত ও পবিত্রতা সম্পর্কে কিছু সাধারণ আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বিস্মিত হয়ে দেখলেন যে, তারা দ্বীনের এমন অনেক মৌলিক বিষয়ই জানে না, যা প্রতিটি মুসলিমের জানা অপরিহার্য। অথচ এগুলো তারা বিদ্যালয়ে পড়েছে। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, আমাদের সন্তানরা পড়াশোনা করছে, কিন্তু দ্বীনের জ্ঞান থেকে এত দূরে চলে গেল কীভাবে?
আসলে এটি একটি পরিবারের নয়; আমাদের সময়ের একটি বড় বাস্তবতা।
আজকের শিশু-কিশোররা অসংখ্য তথ্যের ভিড়ে বড় হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদন, খেলাধুলা, তারকাদের জীবন, নতুন নতুন প্রযুক্তি এসবের প্রতি তাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান, কুরআন, হাদীস ও ইসলামী আদব-আখলাকের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর দায় শুধু সন্তানদের নয়; অভিভাবক হিসেবেও আমাদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে।
সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। তার অন্তরে মহান আল্লাহকে জানার আগ্রহ, দ্বীন শেখার ভালোবাসা এবং জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণাও সৃষ্টি করতে হবে। কারণ যে হৃদয়ে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়, সে হৃদয় সহজে পথ হারায় না।
সাহাবায়ে কিরামের জীবনের দিকে তাকালে আমরা জ্ঞানের প্রতি এক অনন্য ভালোবাসা দেখতে পাই। তারা শুধু শুনেই ক্ষান্ত হতেন না; একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতেন, বারবার স্মরণ করতেন, যাতে তা অন্তরে গেঁথে যায়। আবার একটি হাদীস শোনার জন্য কেউ কেউ দিনের পর দিন, এমনকি মাসব্যাপী সফর করতেও দ্বিধা করতেন না। তাদের কাছে জ্ঞান ছিল পৃথিবীর যেকোনো সম্পদের চেয়েও মূল্যবান।
আজ আমাদের সন্তানদেরও এই চেতনা শেখাতে হবে, জ্ঞান কেবল পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যম নয়; বরং আল্লাহকে চেনার, নিজের জীবনকে সুন্দর করার এবং আখিরাতের সফলতা অর্জনের পথ।
আল্লাহ তাআলা প্রথমে মানুষকে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন, তারপর তাঁর একত্বের সাক্ষ্য দিতে বলেছেন। এর মধ্যেই বোঝা যায়, সঠিক জ্ঞানই মানুষকে সঠিক ঈমানের দিকে নিয়ে যায়। তাই দ্বীনি জ্ঞান অর্জন কেবল একটি অতিরিক্ত কাজ নয়; বরং একজন মুসলিমের জীবনের অপরিহার্য অংশ।
রাসূল ﷺ সুসংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আবার যে মানুষ এমন জ্ঞান রেখে যায়, যা অন্যরা তার মৃত্যুর পরও অনুসরণ করে, সেই জ্ঞানের সওয়াব মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় প্রবাহিত হতে থাকে। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে?
আল্লাহ তাআলা আরও ঘোষণা করেছেন, তিনি ঈমানদারদের এবং জ্ঞানপ্রাপ্তদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করেন। অন্যদিকে রাসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন। অর্থাৎ দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ নিজেই একটি বড় নেয়ামত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহের নিদর্শন।
তাই আমাদের উচিত সন্তানদের বোঝানো যে, দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। সালাত, পবিত্রতা, সিয়াম, যাকাত, হজ, হালাল-হারাম এসব সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সমাজের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, অর্থনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য উপকারী জ্ঞান অর্জনও মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জ্ঞান অর্জনের শুরু হওয়া উচিত কুরআনুল কারীম দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে আকীদা, হাদীস, তাফসীর, সীরাত, ফিকহ এবং ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিষয় শেখানো প্রয়োজন। তবে শুধু বই পড়ালেই হবে না; এর সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে আলেমদের চরিত্র ইখলাস, বিনয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ধৈর্য, শিক্ষকের প্রতি সম্মান, প্রশ্ন করার আদব এবং বইয়ের প্রতি ভালোবাসা।
এ যুগে প্রযুক্তি যেমন বিভ্রান্তির মাধ্যম হতে পারে, তেমনি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে তা জ্ঞান অর্জনের অসাধারণ একটি উপায়ও হতে পারে। তাই সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেয়ে তাদের শেখাতে হবে কীভাবে প্রযুক্তিকে কুরআন, হাদীস, ইসলামী পাঠ, উপকারী বক্তৃতা এবং নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জনের জন্য ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি ক্ষতিকর চিন্তা, বিভ্রান্তিকর মতবাদ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের উৎসগুলো সম্পর্কে সতর্ক করাও জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানরা আমাদের কথার চেয়ে আমাদের কাজ থেকেই বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে। আমরা যদি নিজেরা বই না পড়ি, দ্বীনি আলোচনা না করি, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখি, তাহলে সন্তানদের কাছ থেকে তা আশা করাও কঠিন। তারা আমাদের দেখেই শিখবে জ্ঞানকে কতটা মূল্য দিতে হয়।
তাই আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ নয়; বরং আল্লাহকে চেনে, রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসে, দ্বীনকে বুঝে এবং জ্ঞানকে ইবাদত মনে করে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। তাদের মসজিদের কুরআন শিক্ষার আসরে, দ্বীনি পাঠচক্রে এবং উপকারী জ্ঞানচর্চার পরিবেশে যুক্ত করি। কারণ একটি সৎ পরিবেশ অনেক সময় একটি সন্তানের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
যে পরিবারে জ্ঞানের আলো জ্বলে, সে পরিবারে ঈমান শক্তিশালী হয়। আর যে সন্তান ছোটবেলা থেকেই আল্লাহকে জানার শিক্ষা পায়, তার জন্য দুনিয়ার অন্ধকার পথও আলোকিত হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন!
-আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।