হিজরি সনের সূচনা: হিজরত কেন ইসলামী বর্ষপঞ্জির ভিত্তি হলো
ইসলামী ইতিহাসে হিজরি সনের প্রবর্তন শুধু একটি তারিখ নির্ধারণের ঘটনা নয়; বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, পরিচয়, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কোন ঘটনাকে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা ধরা হবে এবং কোন মাস দিয়ে বছর শুরু হবে এ দুটি বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম গভীর চিন্তা, পরামর্শ ও ঐতিহাসিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন।
ইমাম বুখারী (রহ.) এ বিষয়ে তাঁর গ্রন্থে একটি অধ্যায় স্থাপন করেছেন। পরবর্তীতে হাফিজ ইবনু হাজার আল-আসকালানি (রহ.) ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সাহাবায়ে কেরাম হিজরতকে ইসলামী ইতিহাসের সূচনা হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে কুরআনের একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ﴾
অর্থাৎ, যে মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে…সূরা আত-তাওবা: ১০৮
এখানে “প্রথম দিন” বলতে সমস্ত দিনের প্রথম দিন বোঝানো হয়নি। বরং এর অর্থ এমন এক নতুন সময়ের সূচনা, যেদিন থেকে ইসলাম মক্কার নির্যাতন, দুর্বলতা ও অবরুদ্ধ অবস্থা অতিক্রম করে মদিনায় নিরাপত্তা, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার পথে প্রবেশ করেছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরতের পর নিরাপদ পরিবেশে প্রকাশ্যে আল্লাহর ইবাদত করতে পেরেছিলেন, মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেছিলেন এবং একটি সুসংগঠিত মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
এ কারণেই হিজরত ছিল শুধু স্থান পরিবর্তন নয়; এটি ছিল ইসলামী ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা। মক্কায় মুসলমানরা ছিলেন নির্যাতিত ও দুর্বল, আর মদিনায় এসে তারা গড়ে তুলেছিলেন ঈমান, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও শরিয়তের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সমাজ। তাই হিজরতকে ইতিহাসের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
হাফিজ ইবনু হাজার (রহ.) উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের অন্তত চারটি মহান ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামী বর্ষপঞ্জি শুরু করার কথা ভাবা যেত। সেগুলো হলো তাঁর জন্ম, নবুওয়াত প্রাপ্তি, হিজরত এবং ইন্তেকাল।
কিন্তু জন্ম ও নবুওয়তের সুনির্দিষ্ট বছর নির্ধারণে ঐতিহাসিক মতভেদ ছিল। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তিকাল ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোক ও বেদনার ঘটনা। তাই সেটিকে বর্ষপঞ্জির সূচনা হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন মনে করা হয়নি। অবশেষে এমন একটি ঘটনাকে বেছে নেওয়া হলো, যা একই সঙ্গে স্পষ্ট, স্মরণীয় ও বিজয়ের সূচক, আর তা হলো হিজরত।
হিজরতের তাৎপর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায় যখন দেখা যায়, এটি ইসলামের ইতিহাসে দুর্বলতা ও প্রতিষ্ঠার মধ্যকার সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা। হিজরতের আগে মুসলমানরা ছিলেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নির্যাতিত একটি সম্প্রদায়; আর হিজরতের পর তারা একটি স্বতন্ত্র উম্মাহ, সামাজিক শক্তি এবং ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে বিভিন্ন সরকারি চিঠিপত্র, প্রশাসনিক নথি ও লেনদেনে তারিখ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামকে একত্র করে পরামর্শ করেন ইসলামী বর্ষপঞ্জি কোন ঘটনা থেকে শুরু হবে এবং বছরের প্রথম মাস কোনটি হবে।
হিজরতকে সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করার পর প্রশ্ন উঠল বছর শুরু হবে কোন মাস থেকে? কেউ রজব মাসের কথা বললেন, কেউ রমজানের প্রস্তাব দিলেন। তখন উসমান ইবনু আফফান (রা.) মুহাররম মাস থেকে বছর শুরু করার মত দেন। তিনি যুক্তি দেন যে, মুহাররম একটি সম্মানিত মাস, এটি আরবদের প্রচলিত বছরের প্রথম মাস এবং মানুষ হজ সম্পন্ন করে এ সময় নতুনভাবে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করে।
আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো যে, আকাবার বায়আত, হিজরতের সংকল্প ও প্রস্তুতি হজ-পরবর্তী সময়েই সুস্পষ্ট রূপ লাভ করেছিল। ফলে মুহাররমকে বছরের প্রথম মাস নির্ধারণ করা হিজরতের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
অবশেষে সাহাবায়ে কেরাম হিজরতকে বর্ষ গণনার ভিত্তি এবং মুহাররমকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, এ সিদ্ধান্ত হিজরি ১৭ সালে গৃহীত হয়; কিছু বর্ণনায় ১৬ হিজরির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে ইসলামী বর্ষপঞ্জিতে দুটি মহান তাৎপর্য একত্রিত হয়েছে। একদিকে হিজরতকে সূচনা ধরা হয়েছে, কারণ এটি ইসলাম ও মুসলমানদের দুর্বলতা থেকে শক্তি, ভয় থেকে নিরাপত্তা এবং বিচ্ছিন্নতা থেকে প্রতিষ্ঠার পথে নিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে মুহাররমকে প্রথম মাস করা হয়েছে, কারণ এটি সম্মানিত মাস, আরবি বর্ষের সূচনা এবং হজ-পরবর্তী নতুন অধ্যায়ের প্রতীক।
হিজরি সন তাই নিছক তারিখ গণনার পদ্ধতি নয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ঈমানের জন্য ত্যাগ, আল্লাহর পথে হিজরত, সত্যের ওপর অবিচলতা এবং কষ্টের পর প্রতিষ্ঠা ইসলামী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি নতুন হিজরি বছর মুসলমানদের সামনে এই প্রশ্ন তুলে ধরে আমরা কি কেবল বছর পরিবর্তন করছি, নাকি নিজেদের জীবনকেও মহান আল্লাহর আনুগত্যের দিকে নতুনভাবে পরিচালিত করছি?
হিজরতের মূল শিক্ষা হলো মানুষ যখন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় বস্তু ত্যাগ করে, তখন আল্লাহ তার জন্য নতুন দরজা খুলে দেন। মক্কা ত্যাগ ছিল বাহ্যিকভাবে বিচ্ছেদ ও কষ্টের ঘটনা, কিন্তু তারই ফলস্বরূপ মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।
সুতরাং হিজরি বর্ষপঞ্জি আমাদের শুধু অতীতের একটি ঘটনা মনে করিয়ে দেয় না; বরং এটি ত্যাগ, নবজাগরণ, আত্মসংশোধন ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার এক চিরন্তন আহ্বান।
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।