তাফসীরের পরিচয়, প্রকারভেদ-
তাফসীর (التفسير) ইসলামী জ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। আরবি “তাফসীর” শব্দের অর্থ হলো ব্যাখ্যা করা, স্পষ্ট করা বা কোনো বিষয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য উন্মোচন করা। পরিভাষায়, কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহের অর্থ, মর্ম, উদ্দেশ্য, বিধান, অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং ভাষাগত দিক ব্যাখ্যা করার শাস্ত্রকে তাফসীর বলা হয়।
তাফসীরের প্রকারভেদ নিয়ে আলেমগণ বিভিন্নভাবে আলোচনা করেছেন। তবে সাধারণভাবে তাফসীরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমটি হলো তাফসীর বিল-মা’ছূর (التفسير بالمأثور) বা বর্ণনাভিত্তিক তাফসীর, আর দ্বিতীয়টি হলো তাফসীর বির-রা’য়ি (التفسير بالرأي) বা মতামতভিত্তিক তাফসীর।
তাফসীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো তাফসীর বিল-মা’ছূর (التفسير بالمأثور)। এটিকে তাফসীর বির-রিওয়ায়াহ (التفسير بالرواية), তাফসীর বিল-মানকূল (التفسير بالمنقول), তাফসীর বিল-আছার (التفسير بالأثر) নামেও ডাকা হয়। এসব নামের অর্থ কাছাকাছি। “মা’ছূর” (المأثور) অর্থ হলো পূর্বসূরীদের থেকে বর্ণিত বিষয়; “রিওয়ায়াহ” (الرواية) অর্থ বর্ণনা; “মানকূল” (المنقول) অর্থ স্থানান্তরিত বা বর্ণিত; আর “আছার” (الأثر) অর্থ সাহাবা, তাবিঈ ও পূর্বসূরীদের থেকে পাওয়া বর্ণনা।
তাফসীর বিল-মা’ছূরের প্রথম উৎস হলো কুরআন দ্বারা কুরআনের ব্যাখ্যা। দ্বিতীয় উৎস হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ (السنة)। তৃতীয় উৎস হলো সাহাবায়ে কেরামের (الصحابة) তাফসীর। চতুর্থ উৎস হিসেবে অনেক আলেম তাবিঈদের (التابعون) তাফসীর গ্রহণ করেছেন, বিশেষত যাঁরা সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা শিখেছেন।
এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেক সময় তাফসীর বিস-সানাদ (التفسير بالسند) বা সনদসহ তাফসীর কথাটি বলা হয়। এটি তাফসীরের স্বতন্ত্র কোনো আলাদা প্রকার নয়; বরং বর্ণনা উপস্থাপনের একটি পদ্ধতি। সনদ (السند) অর্থ হলো বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক সূত্র। কোনো তাফসীর গ্রন্থে যখন কোনো আয়াতের ব্যাখ্যার সঙ্গে বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিক নাম উল্লেখ করা হয়, তখন তাকে সনদসহ বর্ণনা বলা হয়।
যেমন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু জারীর আত-তাবারী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ জামিউল বায়ান আন তা’বীলি আয়িল কুরআন (جامع البيان عن تأويل آي القرآن) গ্রন্থে বহু বর্ণনা সনদসহ উল্লেখ করেছেন। তাই তাঁর গ্রন্থ তাফসীর বিল-মা’ছূরের একটি মহান উদাহরণ এবং একই সঙ্গে সনদভিত্তিক উপস্থাপনারও গুরুত্বপূর্ণ নমুনা।
তাফসীর বিল-মা’ছূরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি সবচেয়ে নিরাপদ, প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। কারণ এতে কুরআনের ব্যাখ্যা কুরআন, সহীহ সুন্নাহ (السنة الصحيحة) এবং সালাফে সালেহীনের (السلف الصالح) বুঝের আলোকে করা হয়। তবে এ পদ্ধতিতে বর্ণনার বিশুদ্ধতা যাচাই করা জরুরি। কারণ সব বর্ণনা সহীহ (صحيح) নয়; কিছু দুর্বল (ضعيف), মুনকার (منكر) বা ইসরাঈলী বর্ণনা (الإسرائيليات) তাফসীরগ্রন্থে পাওয়া যায়।
এই ধারার বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থের মধ্যে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু জারীর আত-তাবারী (রহ.)-এর জামিউল বায়ান (جامع البيان), ইমাম ইবনু কাছীর (রহ.)-এর তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (تفسير القرآن العظيم), ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.)-এর আদ-দুররুল মানছূর (الدر المنثور), এবং ইমাম হুসাইন ইবনু মাসঊদ আল-বাগাভী (রহ.)-এর মা’আলিমুত তানযীল (معالم التنزيل) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সারকথা হলো, তাফসীর বিল-মা’ছূর (التفسير بالمأثور), তাফসীর বির-রিওয়ায়াহ (التفسير بالرواية), তাফসীর বিল-মানকূল (التفسير بالمنقول) এবং তাফসীর বিল-আছার (التفسير بالأثر) মূলত একই ধারার ভিন্ন ভিন্ন নাম। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো কুরআনের ব্যাখ্যাকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা, সহীহ দলিল এবং সালাফের বুঝের উপর প্রতিষ্ঠিত করা। আর তাফসীর বিস-সানাদ (التفسير بالسند) বলতে বোঝায় সেই তাফসীর পদ্ধতি যেখানে বর্ণনাগুলো সনদসহ উল্লেখ করা হয়।