মাকাসিদুশ শরীয়াহ (ইসলামী শরীয়তের উদ্দেশ্য): পরিচয়, প্রকার ও গুরুত্ব
ইসলামী শরীয়ত কোনো বিচ্ছিন্ন বিধি-বিধানের সমষ্টি নয়; বরং এটি মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। শরীয়তের প্রতিটি আদেশ, নিষেধ, বিধান ও নির্দেশনার পেছনে রয়েছে গভীর হিকমত, কল্যাণ ও উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যগুলোকে বলা হয় মাকাসিদুশ শরীয়াহ (مقاصد الشريعة)।
মাকাসিদুশ শরীয়াহর পরিচয়-
মাকাসিদ শব্দের অর্থ হলো উদ্দেশ্য, লক্ষ্য বা চূড়ান্ত গন্তব্য। আর শরীয়তের পরিভাষায় মাকাসিদুশ শরীয়াহ বলতে বোঝায় সেই মহান উদ্দেশ্যসমূহ, যেগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম তার বিধানসমূহ নির্ধারণ করেছে।
অর্থাৎ ইসলামী শরীয়তের উদ্দেশ্য হলো মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করা, দুনিয়ার জীবনকে সুশৃঙ্খল করা এবং আখিরাতের সফলতার পথ সুগম করা।
শরীয়তের সাধারণ ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো-
মানুষের উপকার সাধন করা, কল্যাণ নিয়ে আসা এবং অকল্যাণ, ক্ষতি ও ফাসাদ দূর করা।
আরবী ভাষায় এটিকে বলা হয়
جلب المصالح ودفع المفاسد
অর্থাৎ কল্যাণ অর্জন এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ।
মাকাসিদুশ শরীয়াহর প্রধান বিভাগ-
ইসলামী আলেমগণ মানুষের প্রয়োজন ও কল্যাণের স্তর অনুযায়ী শরীয়তের উদ্দেশ্যকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন-
প্রথমত, জরুরি উদ্দেশ্য বা আয-যরূরিয়্যাত (الضروريات)
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্য বা আল-হাজিয়্যাত (الحاجيات)
তৃতীয়ত, সৌন্দর্যবর্ধক উদ্দেশ্য বা আত-তাহসীনিয়্যাত (التحسينيات)
এক. জরুরি উদ্দেশ্য: আয-যরূরিয়্যাত-
আয-যরূরিয়্যাত হলো এমন মৌলিক স্বার্থ ও কল্যাণ, যার ওপর মানুষের জীবন, সমাজ ও সভ্যতা নির্ভরশীল। এগুলো নষ্ট হলে মানুষের জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতের বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
এই জরুরি উদ্দেশ্য পাঁচটি। এগুলোকে বলা হয়-
الضروريات الخمس
অর্থাৎ পাঁচটি অপরিহার্য বিষয়।
১. দ্বীন সংরক্ষণ — حفظ الدين
ইসলামী শরীয়তের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো দ্বীন সংরক্ষণ করা। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তাই শরীয়ত ঈমান, তাওহীদ, সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ ও অন্যান্য ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছে।
একই সঙ্গে শরীয়ত শিরক, কুফর, বিদআত, ধর্মত্যাগ ও দ্বীনবিরোধী কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেছে। কারণ দ্বীন নষ্ট হলে মানুষের আখিরাত নষ্ট হয় এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।
২. জীবন সংরক্ষণ — حفظ النفس
মানবজীবন আল্লাহর দেওয়া একটি মহান আমানত। তাই ইসলাম মানুষের জীবন রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এ জন্য শরীয়ত খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবনযাপনের অনুমতি দিয়েছে।
একই সঙ্গে অন্যায়ভাবে হত্যা, আত্মহত্যা, নির্যাতন, জুলুম ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করেছে। হত্যার বিরুদ্ধে কিসাসের বিধানও জীবন রক্ষার জন্যই প্রণীত হয়েছে; যাতে সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষ অন্যের জীবন নষ্ট করার আগে ভয় পায়।
৩. বুদ্ধি সংরক্ষণ — حفظ العقل
মানুষের অন্যতম বড় মর্যাদা হলো তার বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি। এই বুদ্ধির মাধ্যমেই মানুষ সত্য-মিথ্যা চিনে, ভালো-মন্দ বোঝে এবং আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করে।
তাই ইসলাম জ্ঞানার্জন, চিন্তা, গবেষণা ও বিবেক ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছে। একই সঙ্গে মদ, নেশা ও এমন সব বস্তু নিষিদ্ধ করেছে, যা মানুষের বুদ্ধি নষ্ট করে। কারণ বুদ্ধি নষ্ট হলে মানুষ নিজের, পরিবারের ও সমাজের ক্ষতি করে।
৪. বংশ ও পরিবার সংরক্ষণ — حفظ النسل
ইসলাম পরিবারব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সুস্থ পরিবার থেকেই সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে। এ জন্য শরীয়ত বিবাহকে বৈধ করেছে, দাম্পত্য অধিকার নির্ধারণ করেছে এবং সন্তান লালন-পালনের বিধান দিয়েছে।
অন্যদিকে ব্যভিচার, অশ্লীলতা, অপবাদ ও বংশপরিচয় নষ্টকারী সব পথ নিষিদ্ধ করেছে। যিনা ও অপবাদের শাস্তির বিধানও পরিবার ও বংশ রক্ষার জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
৫. সম্পদ সংরক্ষণ — حفظ المال
মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য সম্পদ প্রয়োজন। ইসলাম সম্পদ উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয়, দান-সদকা ও উত্তরাধিকারের বিধান দিয়েছে।
একই সঙ্গে চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছে। চুরির শাস্তির বিধানও সম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রণীত।
দুই. প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্য: আল-হাজিয়্যাত-
আল-হাজিয়্যাত হলো এমন স্বার্থ ও সুবিধা, যা মানুষের জীবন থেকে কষ্ট, সংকীর্ণতা ও অতিরিক্ত চাপ দূর করে। এগুলো না থাকলে জীবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না, কিন্তু মানুষ কঠিন কষ্ট ও অসুবিধার মধ্যে পড়ে।
ইসলামী শরীয়ত মানুষের ওপর অযথা কষ্ট চাপায় না; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সহজতা দেয়।
যেমন: মুসাফিরের জন্য সালাত কসর করা, দুই সালাত একত্রে আদায় করা, অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তায়াম্মুম করা, রমযানে অসুস্থ বা সফররত ব্যক্তির জন্য রোজা ভঙ্গের অনুমতি, আর্থিক লেনদেনে ঋণ, ভাড়া, অংশীদারিত্ব ইত্যাদির বৈধতা এসবই হাজিয়্যাতের অন্তর্ভুক্ত।
এগুলো শরীয়তের দয়া, সহজতা ও বাস্তবমুখী চরিত্রের প্রমাণ।
তিন. সৌন্দর্যবর্ধক উদ্দেশ্য: আত-তাহসীনিয়্যাত-
আত-তাহসীনিয়্যাত হলো এমন বিষয়, যা মানুষের জীবনকে সুন্দর, পরিপূর্ণ, শোভন ও মর্যাদাপূর্ণ করে। এগুলো না থাকলে জীবন ধ্বংস হয় না এবং বড় কষ্টও সৃষ্টি হয় না, কিন্তু মানুষের চরিত্র, সভ্যতা ও সামাজিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যেমন: খাওয়া-দাওয়ার আদব, পবিত্রতা, পর্দা, সততা, বিনয়, লজ্জাশীলতা, ধৈর্য, দয়া, আমানতদারি, উত্তম পোশাক, দান, হেবা, ওয়াকফ, সুন্দর আচরণ এবং সব ধরনের নৈতিক গুণাবলি।
এসব বিষয় মানুষের জীবনকে উন্নত করে, সমাজে সৌন্দর্য আনে এবং মুসলিম চরিত্রকে পরিপূর্ণ করে।
মাকাসিদুশ শরীয়াহর স্তরবিন্যাসের গুরুত্ব-
শরীয়তের উদ্দেশ্যগুলো একই স্তরের নয়। কোনোটি অত্যন্ত জরুরি, কোনোটি প্রয়োজনীয়, আবার কোনোটি সৌন্দর্যবর্ধক। এই স্তরবিন্যাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কখনো কখনো দুটি স্বার্থ বা উদ্দেশ্যের মধ্যে সংঘাত দেখা দিতে পারে। তখন কোনটি আগে গ্রহণ করতে হবে এবং কোনটি পরে রাখা হবে, তা নির্ধারণের জন্য এই শ্রেণিবিন্যাস দরকার হয়।
সাধারণ নিয়ম হলো-
প্রথমে যরূরিয়্যাত বা জরুরি উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তারপর হাজিয়্যাত বা প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্যকে।
তারপর তাহসীনিয়্যাত বা সৌন্দর্যবর্ধক উদ্দেশ্যকে।
আবার পাঁচটি জরুরি উদ্দেশ্যের মধ্যেও অগ্রাধিকারের ক্রম আছে। সাধারণভাবে আলেমগণ বলেছেন-
প্রথমে দ্বীন, তারপর জীবন, তারপর বুদ্ধি, তারপর বংশ, তারপর সম্পদ।
অর্থাৎ কোনো অবস্থায় যদি স্বার্থের সংঘাত দেখা দেয়, তাহলে অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
মাকাসিদুশ শরীয়াহ বোঝা ইসলামী শরীয়তের গভীরতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা, নৈতিকতা, পরিবার, সমাজ ও আখিরাতের সফলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শরীয়ত মানুষের ওপর বোঝা চাপানোর জন্য আসেনি; বরং মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে এসেছে। এটি দ্বীন রক্ষা করে, জীবন রক্ষা করে, বুদ্ধি রক্ষা করে, পরিবার রক্ষা করে এবং সম্পদ রক্ষা করে।
অতএব, ইসলামী শরীয়ত হলো দয়া, হিকমত, ন্যায়, সহজতা ও কল্যাণের শরীয়ত। যে ব্যক্তি মাকাসিদুশ শরীয়াহ বুঝতে পারে, সে শরীয়তের বিধানকে শুধু বাহ্যিক নিয়ম হিসেবে দেখে না; বরং এর পেছনের মহান উদ্দেশ্য ও আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা উপলব্ধি করতে শেখে।
-২৪ জুন, বুধবার
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী