হে প্রিয় মুসলিম ভাই, সফলতার পথ একটাই। তা হলো- সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর আনুগত্য।
হে প্রিয় মুসলিম ভাই, মনে রাখবেন মহান আল্লাহর রহমত কেবল আশা-আকাঙ্ক্ষা, বংশমর্যাদা, পদ-পদবি কিংবা ধন-সম্পদের মাধ্যমে অর্জিত হয় না। আল্লাহর রহমত লাভের প্রকৃত উপায় হলো তাঁর আনুগত্য করা, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ করা এবং তাঁর শরীয়তের বিধান মেনে জীবন পরিচালনা করা। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৎকাজের আদেশ (الأمر بالمعروف) এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ (النهي عن المنكر)।
তাই আসুন, আমরা সবাই এমন সব কাজ থেকে সতর্ক থাকি যা মহান আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে। আন্তরিক তাওবা (التوبة) করে কোনো দ্বিধা ছাড়াই আল্লাহর দিকে ফিরে যাই, সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই। কারণ আল্লাহ তা‘আলা সতর্ক করে বলেছেন,
﴿فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ﴾
যারা তাঁর আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন সতর্ক থাকে, কোনো ফিতনা তাদেরকে গ্রাস না করে অথবা কোনো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদের ওপর আপতিত না হয়। সূরা আন-নূর: ৬৩।
মনে রাখবেন, মহান আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক শ্বাস এবং সীমিত সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলে হৃদস্পন্দন থেমে যাবে, আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যাবে এবং এই পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। এরপর মানুষের গন্তব্য হবে হয় চিরস্থায়ী শান্তি ও আনন্দের জান্নাত, অথবা দুঃখ, অনুতাপ ও শাস্তির আবাস জাহান্নাম।
যে ব্যক্তি উত্তম কথা বলে, নেক আমল করে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জীবন কাটায়, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং চিরস্থায়ী নিয়ামত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি গুনাহ, কু-কথা ও অন্যায়ে জীবন অতিবাহিত করবে, সে কঠিন পরিণতির সম্মুখীন হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا﴾
তারা যদি পানির জন্য আর্তনাদ করে, তবে তাদের এমন পানি দেওয়া হবে, যা গলিত ধাতুর মতো; তা তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে। কত নিকৃষ্ট সেই পানীয় এবং কতই না মন্দ সেই আবাস! সূরা কাহফ: ২৯।
আর সর্বদা স্মরণ রাখুন আল্লাহর এই মহান ঘোষণা,
﴿فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ﴾
যে অণুপরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে অণুপরিমাণ অসৎকাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে। সূরা যিলযাল: ৭–৮।
এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আপনি যা-ই করবেন, তার প্রতিদান অবশ্যই পাবেন। তাই যা ক্ষণস্থায়ী, তার চেয়ে যা চিরস্থায়ী তাকে অগ্রাধিকার দিন। কারণ জীবন একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না; তখন অনুশোচনা কোনো উপকারে আসে না।
হে প্রিয় ভাই, এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ, সবচেয়ে গভীর প্রশান্তি এবং সবচেয়ে নির্মল আনন্দ হলো মহান আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর ভালোবাসা, তাঁর নৈকট্য এবং তাঁর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। অসংখ্য তাওবাকারী স্বীকার করেছেন, জীবনের প্রকৃত স্বাদ তারা পেয়েছেন আল্লাহর দিকে ফিরে এসে, তাঁর ওপর উত্তম ধারণা (حسن الظن بالله) রেখে এবং সর্বদা তাঁর তত্ত্বাবধান অনুভব করে।
তাই বেশি বেশি দো‘আ করুন, যিকির (الذكر) করুন এবং ইস্তিগফার (الاستغفار) করুন। প্রতিটি তাসবীহ আপনার জন্য নেকির ভাণ্ডার। সময়কে অর্থহীন কাজে নষ্ট করবেন না। কুরআন তিলাওয়াত করুন; কারণ প্রতিটি অক্ষরের জন্য রয়েছে দশটি নেকি। উপকারী ইলম অর্জন করুন, হাদীস অধ্যয়ন করুন এবং নিজের দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানার্জনে সচেষ্ট হোন। নফল সালাত বৃদ্ধি করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন،
إنك لن تسجد لله سجدة إلا رفعك بها درجة وحط عنك بها خطيئة
তুমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিজদাও করবে না, আল্লাহ তার মাধ্যমে তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং একটি গুনাহ মাফ করে দেবেন।
আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী (الداعية إلى الله) হোন। মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অসৎকাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করুন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾
তার কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। সূরা ফুসসিলাত: ৩৩।
মানুষের সম্মান (العِرض) রক্ষা করুন। কারও গীবত করবেন না, কাউকে অপবাদ দেবেন না, কাউকে কষ্ট দেবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। তিনি আরও বলেছেন,
كل المسلم على المسلم حرام دمه وعرضه وماله
একজন মুসলিমের রক্ত, সম্মান ও সম্পদ অন্য মুসলিমের জন্য হারাম। এছাড়াও তিনি সতর্ক করে বলেছেন,
بحسب امرئ من الشر أن يحقر أخاه المسلم
কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে।
অতএব, নিজের জিহ্বা, দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি এবং সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হিফাযত করুন। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُولًا﴾
নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং হৃদয় এসবের প্রত্যেকটির ব্যাপারেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সূরা ইসরা: ৩৬।
কোনো গুনাহকে ছোট মনে করবেন না। গুনাহ কত ছোট তা নয়; বরং আপনি কার অবাধ্য হচ্ছেন সেটিই বড় বিষয়। সবসময় এই দো‘আটি করুন,
اللهم أحسن عاقبتنا في الأمور كلها، وأجرنا من خزي الدنيا وعذاب الآخرة
হে আল্লাহ! আমাদের সকল কাজের পরিণতি উত্তম করে দিন এবং আমাদেরকে দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখিরাতের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে আন্তরিক তাওবা, বিশুদ্ধ ঈমান, নেক আমল এবং উত্তম পরিণতি (حسن الخاتمة) দান করুন। আমীন!