সূরা আল-বুরূজের নিম্নোক্ত আয়াতে মুমিনদের নির্যাতন, তাওবার আহ্বান এবং আল্লাহর অসীম রহমত
মহান আল্লাহ সূরা আল-বুরূজে বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ فَتَنُوا الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ الْحَرِيقِ﴾
নিশ্চয়ই যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের নির্যাতন করেছে, তারপরও তাওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি এবং রয়েছে দহনকারী আগুনের শাস্তি। (সূরা আল-বুরূজ: ১০)।
প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম মুহাম্মাদ আত-তাহির ইবনু আশূর (رحمه الله) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর-এ এই আয়াতের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেন, এই আয়াতে “যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের নির্যাতন করেছে” এর দ্বারা মূলত মক্কার মুশরিকদের বোঝানো হয়েছে; বিশেষ করে তারা, যারা ইসলামের প্রথম যুগে দুর্বল মুসলিমদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল। এখানে আসহাবে উখদূদ উদ্দেশ্য নয়। কারণ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,
﴿ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا﴾
তারপরও তারা তাওবা করেনি।
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নির্যাতনকারীদের জন্য তাওবার দরজা তখনও খোলা ছিল। অর্থাৎ তারা যদি তাদের জুলুম থেকে ফিরে এসে ঈমান গ্রহণ করত, তবে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতেন।
এটি মহান আল্লাহর রহমতের এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের প্রতিও তিনি তাওবার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইবনু আশূর (رحمه الله) মক্কার সেই নির্যাতনকারীদের নামও উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে ছিল আবূ জাহল, উমাইয়া ইবনু খালাফ, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া, ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা, আসওয়াদ ইবনু আবদ ইয়াগূস এবং আরও কয়েকজন কুরাইশ নেতা। এরা ইসলামের সূচনালগ্নে দুর্বল মুসলিমদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল।
অন্যদিকে যেসব সাহাবী এই নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদের মধ্যেও ছিলেন ইসলামের উজ্জ্বল নক্ষত্রগণ। যেমন বিলাল ইবনু রাবাহ (رضي الله عنه), আবূ ফুকাইহা, খাব্বাব ইবনুল আরাত, আম্মার ইবনু ইয়াসির, তাঁর পিতা ইয়াসির এবং আরও অনেকে।
শুধু পুরুষরাই নন, মুসলিম নারীরাও একইভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ইবনু আশূর (رحمه الله) বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন বিলালের মা হামামা, যিন্নীরা, উম্মু উনাইস, নাহদিয়্যা ও তাঁর কন্যা, লুবায়না এবং সর্বপ্রথম শহীদ নারী সুমাইয়্যা (رضي الله عنها)-এর নাম।
এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষণীয়। আল্লাহ শুধু “মুমিনদের” বলেননি; বরং আলাদা করে “মুমিন নারী”-দেরও উল্লেখ করেছেন।
ইবনু আশূর (رحمه الله) বলেন, এর মধ্যে দুটি বড় হিকমত রয়েছে।
প্রথমত, যেন কেউ মনে না করে যে, ঈমানের মর্যাদা, ত্যাগ ও ধৈর্যের সম্মান কেবল পুরুষদের জন্য। বরং নারী-পুরুষ উভয়েই আল্লাহর নিকট সমানভাবে সম্মানিত।
দ্বিতীয়ত, এতে নির্যাতনকারীদের অপরাধ আরও ভয়াবহ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ তারা এমন নারীদের ওপরও অত্যাচার করেছে, যাদের প্রতি সাধারণ মানবিকতাও কোমল আচরণের দাবি করে।
এরপর আল্লাহ বলেন,
﴿ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا﴾
তারপরও তারা তাওবা করেনি।
ইবনু আশূর (رحمه الله) বলেন, এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মহান আল্লাহ সরাসরি শাস্তির কথা বলেননি; বরং প্রথমে তাওবার সুযোগের কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ যত বড় অপরাধই হোক না কেন, বান্দা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে তাঁর রহমতের দরজা বন্ধ হয় না।
মহান আল্লাহর এই আহ্বানের মধ্যেই দাওয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষকে শুধু শাস্তির ভয় দেখানো নয়; বরং তার সামনে তাওবা ও প্রত্যাবর্তনের দরজাও খুলে দেওয়া উচিত।
ইবনু আশূর (رحمه الله) “ফিতনা” শব্দেরও ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, এখানে ফিতনা বলতে শুধু পরীক্ষাকে বোঝানো হয়নি; বরং এমন নির্যাতন, চাপ ও কষ্টকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে একজন মানুষকে তার ঈমান থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাই কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ﴾
ফিতনা (দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্যাতন) হত্যার চেয়েও ভয়াবহ। অর্থাৎ মানুষের শরীরকে হত্যা করা এক বিষয়; কিন্তু তার ঈমান ধ্বংস করার চেষ্টা আরও বড় অপরাধ।
আল্লাহ এরপর বলেন,
﴿فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ الْحَرِيقِ﴾
তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি এবং রয়েছে দহনকারী আগুনের শাস্তি।
ইবনু আশূর (رحمه الله) বলেন, এখানে একই বিষয়কে দুইভাবে উল্লেখ করার মধ্যে বিশেষ অলঙ্কার ও গভীরতা রয়েছে। এর মাধ্যমে শাস্তির ভয়াবহতা আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “আযাবুল হারীক” দ্বারা হয়তো জাহান্নামের ভয়ংকর দহনকে বোঝানো হয়েছে, অথবা কিয়ামতের পূর্বে কবরের শাস্তিকেও বোঝানো হতে পারে। যদিও এ দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি সম্ভাব্য অর্থ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে নয়।
এই আয়াত আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যেমন-
প্রথমত, আল্লাহর পথে অবিচল থাকা সহজ নয়। সত্যের পথে চলতে গিয়ে যুগে যুগে ঈমানদারদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের কষ্ট কখনো ভুলে যান না। দুনিয়ায় জালিম শক্তিশালী মনে হলেও, আখিরাতে তার জন্য রয়েছে কঠিন জবাবদিহি।
তৃতীয়ত, ইসলামে তাওবার দরজা অত্যন্ত বিস্তৃত। এমনকি যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাদের ওপর জুলুম করেছে, তার জন্যও তাওবার সুযোগ রয়েছে, যদি সে আন্তরিকভাবে ফিরে আসে।
চতুর্থত, ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের ঈমান, ত্যাগ ও মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। তাই কুরআনে মুমিন নারীদের আলাদা করে উল্লেখ করে তাদের সম্মান ও ধৈর্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সর্বোপরি এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জুলুম কখনো স্থায়ী নয়, কিন্তু আল্লাহর বিচার চিরন্তন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে ধৈর্য ধারণ করে, তার কষ্ট কখনো বৃথা যায় না; কারণ মহান আল্লাহ সব দেখেন, সব জানেন এবং যথাসময়ে ন্যায়বিচার করেন।