সৎকাজে অগ্রসর হওয়া: সময় ফুরানোর আগেই-
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন সে চাইলেও আর কিছু করতে পারে না। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই নবী ﷺ আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন সৎকাজে দ্রুত অগ্রসর হতে। কারণ সামনে এমন কিছু অবস্থা আসতে পারে, যা মানুষের শক্তি, ইচ্ছা ও সামর্থ্য কেড়ে নেয়। কখনো দারিদ্র্য মানুষকে ভুলিয়ে দেয়, কখনো সম্পদ তাকে সীমালঙ্ঘনে নিয়ে যায়; কখনো রোগ তাকে অক্ষম করে, কখনো বার্ধক্য তাকে দুর্বল করে ফেলে। আর হঠাৎ মৃত্যু এসে সবকিছুর ইতি টেনে দেয়। এর বাইরে রয়েছে দাজ্জালের ফিতনা এবং কিয়ামতের ভয়াবহতা, যা আরও কঠিন ও তিক্ত।
এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন সময়কে মূল্য দেয়, অবকাশের মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগায় এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আগে নিজেকে প্রস্তুত করে। কারণ প্রত্যেক মানুষই তার রবের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, এবং একসময় অবশ্যই তাঁর সামনে উপস্থিত হবে।
এক রাতে নবী ﷺ ঘুম থেকে আতঙ্কিত হয়ে জেগে উঠলেন এবং বললেন আজ কী বিপুল ভাণ্ডার নাযিল হয়েছে, আর কী ভয়ংকর ফিতনা অবতীর্ণ হয়েছে! তিনি তাঁর স্ত্রীদের জাগিয়ে দিতে বললেন, যেন তারা সালাত আদায় করে। তিনি সতর্ক করলেন দুনিয়ায় যারা বিলাসিতায় আবৃত, তারা আখিরাতে উলঙ্গ হয়ে যেতে পারে।
এই হাদীস আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয় যে, ইবাদত মানুষকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে। যে ব্যক্তি আমলে দুর্বল, সে দ্রুত ফিতনায় আক্রান্ত হয়। আর যে আমলে শক্তিশালী, তারও আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়; বরং তাকে আরও বেশি আমলের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এই নির্দেশনা সকলের জন্য, যে চেষ্টা করছে এবং যে পিছিয়ে আছে উভয়ের জন্য।
ফরয ইবাদতে অগ্রসর হওয়া: সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে ফরয ইবাদতগুলোকে। যেমন-
সালাত: এটি ঈমানের মূল স্তম্ভ। যারা সালাতে গাফেল, তাদের জন্য কঠিন শাস্তির সতর্কবার্তা এসেছে। আবার জাহান্নামের অধিবাসীদের মুখেই শোনা যাবে তারা নামাজ পড়ত না।
যাকাত: দান তখনই সবচেয়ে মূল্যবান, যখন মানুষ সুস্থ থাকে, সম্পদের প্রতি ভালোবাসা থাকে, এবং দারিদ্র্যের ভয়ও থাকে। মৃত্যুর মুহূর্তে দান করার কোনো মূল্য থাকে না, কারণ তখন সম্পদ আর নিজের হাতে থাকে না।
সিয়াম (রোজা): রামাযানের একটি দিন ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে, তার ক্ষতিপূরণ পুরো জীবনেও পূরণ করা সম্ভব নয়, এমন কঠোর সতর্কতা এসেছে।
হজ্জ: যে হজ্জ করার ইচ্ছা রাখে, তার উচিত দেরি না করা। কারণ অসুস্থতা, বাহনের অভাব বা অন্য কোনো প্রয়োজন হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াতে পারে।
সৎকাজের বিস্তৃত ধারণা-
সৎকাজ কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তৃত। যদি কেউ অন্যায় করে থাকে, তবে তার উচিত দ্রুত তা থেকে ফিরে আসা এবং সংশোধন করা। যদি কারো কাছে সম্পদ থাকে, তবে তা আল্লাহর পথে ব্যয় করা। যদি কেউ পরিবারের দায়িত্বে থাকে, তবে সুন্দরভাবে তাদের লালন-পালন করা, সন্তানদের দ্বীন ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া।
যদি কেউ বিচারক হয়, তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
যদি কেউ দায়িত্বশীল বা নেতা হয়, তবে মানুষের অধিকার রক্ষা করা, তাদের সমস্যা সমাধান করা এবং কোনো প্রকার প্রতারণা বা স্বার্থপরতা থেকে দূরে থাকা। প্রত্যেক অবস্থানে মানুষের কিছু দায়িত্ব আছে, আর সেই দায়িত্বগুলো সময়মতো পালন করাই হলো প্রকৃত সৎকাজে অগ্রসর হওয়া।
উত্তম আমলের কিছু দিক-
মানুষের জীবনে অনেক সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সৎকাজ রয়েছে। যেমন-
সালাম প্রচার করা: এটি ভালোবাসা ও শান্তি ছড়িয়ে দেয় এবং জান্নাতের পথ সুগম করে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা: এটি রিযিক বৃদ্ধি ও আয়ু বরকতময় হওয়ার কারণ।
ইয়াতীমের দায়িত্ব নেওয়া: এটি জান্নাতে নবী ﷺ-এর সান্নিধ্য লাভের একটি বিশেষ মাধ্যম।
প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ: এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার অংশ।
মানুষের মাঝে সম্পর্ক ঠিক করা: দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দেওয়া, ভালো কথা বলা, অন্যকে সাহায্য করা, সবই সদকা হিসেবে গণ্য হয়।
জীবন খুবই সীমিত, আর সুযোগও ক্ষণস্থায়ী। তাই সময় ফুরানোর আগে, সামর্থ্য থাকা অবস্থায়, সুস্থতা ও অবকাশের সময়ে, সৎকাজে অগ্রসর হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষ জানে না, কখন তার জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিলম্ব নয়, এখনই শুরু করতে হবে। কাজেই সৎকাজ অপেক্ষা করে না, যে এগিয়ে যায়, সে-ই সফল হয়।
-২৪ এপ্রিল, জুমাবার
জহুরুল হক্ব নগর, বগুড়া