মানুষকে কল্যাণ শিক্ষা দেওয়ার মধ্যে বরকতের সর্বব্যাপীতা
(شمولية البركة في تعليم الناس الخير)
ইসলামে জ্ঞান শিক্ষা ও মানুষের মাঝে কল্যাণ ছড়িয়ে দেওয়াকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি নেক আমলই নয়, বরং এমন এক অব্যাহত সওয়াবের উৎস, যার বরকত দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে ছড়িয়ে পড়ে। একজন মানুষ যখন অন্যকে ভালো কিছু শেখায়, তখন সে কেবল একটি কাজই করে না; বরং সে একটি চলমান কল্যাণের ধারাকে চালু করে দেয়।
কুরআনের আলোকে শিক্ষা ও কল্যাণের গুরুত্ব-
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّن دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا
তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে এবং নিজেও সৎকর্ম করে। (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)। এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা, অর্থাৎ কল্যাণ শিক্ষা দেওয়া সবচেয়ে উত্তম কাজগুলোর একটি।
হাদীসে শিক্ষা দানের বরকত-
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখায়, সে ওই কাজটি সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। (সহীহ মুসলিম)।
আরেকটি হাদীসে এসেছে
إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ…
…তিনটি জিনিস ছাড়া মানুষের সব আমল বন্ধ হয়ে যায়… (তার মধ্যে একটি) উপকারী জ্ঞান। (সহীহ মুসলিম)।
এগুলো প্রমাণ করে, মানুষকে কল্যাণ শিক্ষা দেওয়া এমন একটি আমল, যার বরকত মৃত্যুর পরও চলমান থাকে।
শিক্ষা দানের বরকতের বিভিন্ন দিক-
১. সওয়াবের ধারাবাহিকতা (Continuous Reward): আপনি কাউকে একটি দোয়া, একটি আয়াত, কিংবা একটি সুন্নাহ শিখালেন সে তা আমল করল, আবার অন্যকে শেখাল, এভাবে একটি সওয়াবের চেইন তৈরি হলো। আপনি বসে আছেন, অথচ আপনার আমলনামা ভরে যাচ্ছে।
২. সমাজে নৈতিক পরিবর্তন: যখন সমাজে কল্যাণের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে অন্যায় কমে যায়, ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন শিক্ষক, একজন দাঈ পুরো সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হতে পারেন।
৩. অন্তরের প্রশান্তি ও জীবনের বরকত: যারা মানুষকে দ্বীনের শিক্ষা দেন, তাদের জীবনে এক ধরনের প্রশান্তি ও তৃপ্তি আসে, যা দুনিয়ার কোনো বস্তু দিয়ে অর্জন করা যায় না। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ বরকত।
৪. দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান: ইলম শিক্ষা দেওয়া ব্যক্তিকে আল্লাহ দুনিয়াতে সম্মানিত করেন এবং আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তিনি বলেন,
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ
আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত তাদের মর্যাদা উন্নত করবেন। (সূরা মুজাদালা: ১১)।
সালাফদের দৃষ্টিতে শিক্ষা দান-
সালাফে সালেহীনগণ শিক্ষা দানকে ইবাদতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপ হিসেবে দেখতেন। ইমাম হাসান বসরী (রহ.) বলেন, একজন মানুষকে হেদায়েত দেওয়া এটি দুনিয়া ও তার ভেতরের সবকিছুর চেয়েও উত্তম। তারা বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান যদি নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা পূর্ণতা পায় না; বরং অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিলেই এর প্রকৃত বরকত প্রকাশ পায়।
বাস্তব জীবনে প্রয়োগ-
১. নিজের পরিবারকে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা দেওয়া
২. শিক্ষার্থীদের মাঝে ইলম ছড়িয়ে দেওয়া
৩. সামাজিক মাধ্যমে সহীহ জ্ঞান প্রচার করা
৪. ছোট ছোট নসীহা ও উপদেশ দেওয়া
৫. শিশুদের ইসলামী আদব-আখলাক শেখানো
মানুষকে কল্যাণ শিক্ষা দেওয়া এমন একটি মহান কাজ, যার বরকত সীমাহীন। এটি ব্যক্তি, সমাজ এবং উম্মাহ সবার উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা যদি আমাদের জ্ঞানকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিই, তবে ইনশাআল্লাহ আমরা এমন এক সদাকায়ে জারিয়ায় শরীক হবো, যার প্রতিদান কখনো শেষ হবে না।
মহান আল্লাহর কাছে দুআ করি-
মহান আল্লাহ আমাদেরকে উপকারী জ্ঞান অর্জন করার, তা আমল করার এবং মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন। বারাকাল্লাহু ফিকুম!
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী-৬২০৩।