ইলম অন্বেষণের মর্যাদা ও তলিবুল ইলমের আদব-
ইসলামে ইলম অন্বেষণের মর্যাদা অত্যন্ত মহান। ইলম এমন এক নূর, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর পরিচয় লাভ করে, ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি জানে, হালাল-হারাম বুঝে, সুন্নাহ ও বিদআতের পার্থক্য চিনে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের পথকে স্পষ্টভাবে দেখতে পায়। এ কারণেই সালাফে সালেহীন ইলম অর্জনের জন্য সফর করতেন, আলেমদের কাছে যেতেন, মাসআলা জিজ্ঞেস করতেন এবং দলীলের উপর ভিত্তি করে দ্বীন বুঝতে আগ্রহী থাকতেন।
এই প্রসঙ্গে যির্র ইবনু হুবাইশ رحمه الله-এর একটি ঘটনা অত্যন্ত শিক্ষণীয়। তিনি বলেন,
أَتيْتُ صفْوانَ بْنِ عسَّالٍ رضِي الله عنْهُ أَسْأَلُهُ عَن الْمَسْحِ عَلَى الْخُفَّيْنِ، فَقالَ: مَا جَاءَ بِكَ يَا زِرُّ؟ فقُلْتُ: ابْتغَاءَ الْعِلْمِ، فقَال: إِنَّ الْملائِكَةَ تَضَعُ أَجْنِحتَها لِطَالِبِ الْعِلْمِ رِضًا بمَا يَطلُبُ
অর্থাৎ, যির্র ইবনু হুবাইশ বলেন, আমি সাফওয়ান ইবনু আসসাল رضي الله عنه-এর কাছে এলাম, যাতে তাঁকে মোজার উপর মাসেহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বললেন, হে যির্র! কী উদ্দেশ্যে এসেছ? আমি বললাম, ইলম অন্বেষণের জন্য। তখন তিনি বললেন, নিশ্চয়ই ফেরেশতারা তালিবুল ইলমের জন্য তাদের ডানা বিছিয়ে দেন, সে যা অন্বেষণ করছে তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে।
এই হাদীসটি ইমাম তিরমিযী رحمه اللهসহ অন্যরা বর্ণনা করেছেন এবং তিরমিযী বলেছেন, حديث حسن صحيح তথা হাদীসটি হাসান সহীহ।
এই হাদীস থেকে ইলমের মর্যাদা, তলিবুল ইলমের সম্মান এবং মহান আল্লাহর কাছে ইলম অন্বেষণের গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন মানুষ যখন দুনিয়ার কোনো স্বার্থে নয়, বরং দ্বীন বোঝার জন্য, সুন্নাহ জানার জন্য, ইবাদত শুদ্ধ করার জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইলমের পথে বের হয়, তখন তার এই চলাকে ফেরেশতারাও সম্মান করে।
হাদীসে এসেছে,
إِنَّ الْمَلائِكَةَ تَضَعُ أَجْنِحَتَهَا لِطَالِبِ الْعِلْمِ رِضًا بِمَا يَطْلُبُ
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই ফেরেশতারা তালিবুল ইলমের জন্য তাদের ডানা বিছিয়ে দেন, সে যা অন্বেষণ করছে তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে।
এই ফেরেশতাদের ডানা বিছিয়ে দেওয়া কথাটির ব্যাখ্যায় আলেমগণ কয়েকটি অর্থ উল্লেখ করেছেন। ইমাম খাত্তাবী رحمه الله তাঁর মা‘আলিমুস সুনান গ্রন্থে বলেন, এ বিষয়ে তিনটি ব্যাখ্যা হতে পারে।
প্রথম ব্যাখ্যা হলো: ফেরেশতারা বাস্তবেই তাদের ডানা প্রসারিত করেন এবং তালিবুল ইলমের জন্য তা বিছিয়ে দেন; যেন ইলমের পথে চলার সময় তা তার জন্য বিছানা ও সহায়ক হয়।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো: এটি ফেরেশতাদের বিনয়ের অর্থে। অর্থাৎ তারা তালিবুল ইলমের মর্যাদা ও ইলমের সম্মানের কারণে তার সামনে বিনয় প্রকাশ করেন, নিজেদের ডানা সংযত করেন এবং উড্ডয়ন থেকে নিচু করেন। যেমন আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার ব্যাপারে বলেন,
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ
অর্থাৎ, আর তাদের উভয়ের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও। সূরা আল-ইসরা: ২৪।
তৃতীয় ব্যাখ্যা হলো: ফেরেশতারা ইলম ও যিকিরের মজলিসে অবতরণ করেন এবং সেখানে অবস্থান করেন। এর সমর্থনে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই হাদীস উল্লেখ করা হয়,
مَا مِنْ قَوْمٍ يَذْكُرُونَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ إِلَّا حَفَّتْ بِهِمُ الْمَلَائِكَةُ، وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ، وَنَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
অর্থাৎ, যে কোনো সম্প্রদায় আল্লাহ عز وجل-কে স্মরণ করে, ফেরেশতারা তাদের ঘিরে ফেলেন, রহমত তাদের ঢেকে নেয়, তাদের উপর প্রশান্তি নেমে আসে এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের মাঝে তাদের কথা উল্লেখ করেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম رحمه الله দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিকে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ফেরেশতাদের ডানা বিছানো তালিবুল ইলমের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি বিনয় প্রকাশের অর্থ বহন করে।
এই হাদীসের বড় একটি শিক্ষা হলো, ইলম অর্জনের জন্য সফর করা সালাফদের পথ। যির رحمه الله সাফওয়ান رضي الله عنه-এর কাছে গিয়েছিলেন একটি নির্দিষ্ট মাসআলা জানতে, মোজার উপর মাসেহের বিধান। এতে বোঝা যায়, দ্বীনের কোনো বিষয় অস্পষ্ট হলে আহলে ইলমের কাছে যেতে হবে। নিজের অনুমান, প্রচলিত অভ্যাস বা অজ্ঞদের কথার উপর নির্ভর করে দ্বীনের বিধান গ্রহণ করা উচিত নয়।
আরেকটি শিক্ষা হলো, সালাফরা দলীল জানতে চাইতেন। কারণ প্রকৃত ইলম হলো সেই জ্ঞান, যা দলীলের উপর প্রতিষ্ঠিত। শুধু কথার বাহুল্য, আবেগ, ব্যক্তিগত মত বা প্রচলিত ধারণার নাম ইলম নয়। যে কথা কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফদের বুঝের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই সত্যিকার ইলম।
এই হাদীসের আরেকটি ফিকহী দিক হলো, এটি মোজার উপর মাসেহের বৈধতার দলীল। সফর ও মুকীম উভয় অবস্থাতেই শরীয়ত মোজার উপর মাসেহের সুযোগ দিয়েছে। এতে ইসলামী শরীয়তের সহজতা ও রহমত প্রকাশ পায়। সফর সাধারণত কষ্ট, ক্লান্তি ও অসুবিধার স্থান। তাই শরীয়ত সফরকারীর জন্য এমন কিছু সহজতা দিয়েছে, যা মুকীমের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
হাদীস থেকে জানা যায়, সফরকারীর জন্য মোজার উপর মাসেহের সময়সীমা তিন দিন ও তিন রাত, আর মুকীমের জন্য এক দিন ও এক রাত। একই সঙ্গে বোঝা যায়, এই মাসেহ ছোট নাপাকির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; বড় নাপাকির ক্ষেত্রে মোজা খুলতে হবে। অর্থাৎ গোসল ফরজ হলে মোজার উপর মাসেহ যথেষ্ট নয়; বরং পা ধোয়ার জন্য মোজা খুলতে হবে।
এই বর্ণনায় আরও বোঝা যায়, পায়খানা, পেশাব ও ঘুম এসব ওযু ভঙ্গের কারণ। ইসলামী ফিকহের বহু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা এ ধরনের হাদীস থেকেই জানা যায়। তাই তালিবুল ইলমের জন্য হাদীস শুধু ফযীলতের বিষয় নয়; বরং আকীদা, ইবাদত, আদব, ফিকহ ও জীবনব্যবস্থার মূল উৎস।
এই দীর্ঘ হাদীসের আলোচনায় আরও কিছু বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতের প্রতি দয়া ও কোমলতা। কোনো অশিক্ষিত বেদুঈন যদি অজ্ঞতার কারণে ভুল করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে এমনভাবে শিক্ষা দিতেন, যাতে তার আমল নষ্ট না হয়, সে ভেঙে না পড়ে এবং দ্বীন থেকে দূরে সরে না যায়। এটি দাওয়াহ ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদব।
এ হাদীসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি নবী ﷺ, আবু বকর, উমর, উসমান, আলী رضي الله عنهم এবং অন্যান্য সালেহীনকে ভালোবাসে, তার জন্য সুসংবাদ রয়েছে যে, সে আখিরাতে তাদের সঙ্গে থাকবে। কারণ মানুষ যাদের ভালোবাসে, তাদের সঙ্গেই তার হাশর হওয়ার আশা করা যায়। তবে এর বিপরীত দিকটিও ভয়ংকর। ফাসিক, কাফির ও আল্লাহর অবাধ্য লোকদের ভালোবাসা এবং তাদের প্রতি মাওয়ালাত রাখা বিপজ্জনক; কারণ এতে আশঙ্কা থাকে, মানুষ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গেই উঠানো হবে। তাই মুমিনের ভালোবাসা ও ঘৃণা, বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক সবই ঈমানের মানদণ্ডে হওয়া উচিত।
এই হাদীসের আলোচনায় আরও এসেছে, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হলে তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। এর দ্বারা বোঝা যায়, তাওবার সুযোগ থাকতে থাকতে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা জরুরি। মৃত্যু আসার আগে, কিয়ামতের বড় আলামত প্রকাশের আগে, অবসর ও সুস্থতার সময়েই বান্দার উচিত নিজের আমল সংশোধন করা।
ইলমের মজলিসে সাক্ষাৎ হলে সেই সুযোগকে ইলম, মুযাকারা ও উপকারে লাগানোও সালাফদের আদব। তাঁদের কাছে সাক্ষাৎ মানে শুধু সৌজন্য বিনিময় ছিল না; বরং দ্বীনের কোনো মাসআলা জানা, হাদীস স্মরণ করা, ফিকহ আলোচনা করা এবং নিজেদের ইলম বৃদ্ধি করা ছিল তাঁদের স্বভাব।
এই হাদীসের সঙ্গে একটি সতর্কতামূলক ঘটনা জড়িত আছে, যা ইলম ও হাদীস নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপের ভয়াবহতা বুঝিয়ে দেয়। ইমাম তাবারানী رحمه الله আস-সুন্নাহ গ্রন্থে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যা শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ رحمه الله তাঁর মাজমূঊল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন।
যাকারিয়্যা ইবনু ইয়াহইয়া আস-সাজী رحمه الله বলেন,
كُنَّا نَخْتَلِفُ إِلَى بَعْضِ الشُّيُوخِ لِسَمَاعِ حَدِيثِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَرَعْنَا فِي الْمَشْيِ وَمَعَنَا شَابٌّ مَاجِنٌ. فَقَالَ: ارْفَعُوا أَرْجُلَكُمْ عَنْ أَجْنِحَةِ الْمَلَائِكَةِ لَا تَكْسِرُوهَا. قَالَ: فَمَا زَالَ حَتَّى جَفَتْهُ رِجْلَاهُ.
অর্থাৎ, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস শোনার জন্য কিছু শায়খের কাছে যাতায়াত করতাম। একবার আমরা দ্রুত হাঁটছিলাম, আমাদের সঙ্গে এক বেহায়া যুবক ছিল। সে বলল, তোমাদের পা ফেরেশতাদের ডানা থেকে উঠিয়ে রাখো, যেন তা ভেঙে না ফেলো। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই তার দুই পা শুকিয়ে যায়।
ইমাম নববী رحمه الله-ও বুস্তানুল আরিফীন গ্রন্থে এই ঘটনা সনদসহ উল্লেখ করেছেন। আস-সাজী رحمه الله বিশ্বস্ত ছিলেন। এই ঘটনা ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথার প্রতি উপহাস, হাদীসের অর্থ নিয়ে ঠাট্টা এবং ইলমের মর্যাদাকে হালকা করে দেখা কত ভয়াবহ বিষয়।
হাদীস নিয়ে মজা করা, ইলমের মজলিসকে তুচ্ছ করা, তলিবুল ইলমের মর্যাদা নিয়ে উপহাস করা—এসব মুমিনের আচরণ হতে পারে না। ইলমের পথে বিনয়, আদব, সম্মান ও ভয় থাকা জরুরি। কারণ এই ইলম আল্লাহর দ্বীন, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং আখিরাতের মুক্তির পথ।
সারকথা হলো, সাফওয়ান ইবনু আসসাল رضي الله عنه-এর এই হাদীস আমাদের সামনে ইলমের মর্যাদা, তালিবুল ইলমের সম্মান, আলেমদের কাছে ফিরে যাওয়ার গুরুত্ব, দলীলের উপর দ্বীন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এবং শরীয়তের সহজতা সবকিছু একসঙ্গে তুলে ধরে। একই সঙ্গে এটি আমাদের সতর্ক করে, যেন আমরা ইলম, হাদীস ও দ্বীনের নিদর্শনগুলোর সঙ্গে কখনো হালকাভাবে আচরণ না করি।
তলিবুল ইলমের পথ সম্মানের পথ, কিন্তু সেই পথ আদব, বিনয়, ধৈর্য ও আন্তরিকতা দাবি করে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইলমের পথে চলে, ফেরেশতারাও তার পথকে সম্মান করে। তাই মুমিনের উচিত ইলমকে ভালোবাসা, আলেমদের কাছে যাওয়া, দলীল অনুসন্ধান করা এবং অর্জিত ইলমকে আমলে রূপ দেওয়া। কারণ ইলমের আসল সৌন্দর্য শুধু জানায় নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্যে তা বাস্তবায়নে।
দারসে হাদীস/সংকলন: আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী-৬২০৩।






