ইয়াকুব عليه السلام কেন বললেন: আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি, কিন্তু আমি ঘ্রাণ নিচ্ছি বললেন না?
প্রশ্ন হলো- কিছু নাস্তিক বা সংশয়বাদী লোক সূরা ইউসুফের এই আয়াত নিয়ে ভাষাগত আপত্তি তোলে:
وَلَمَّا فَصَلَتِ الْعِيرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ لَوْلَا أَنْ تُفَنِّدُونِ
– আর যখন কাফেলা রওনা হলো, তখন তাদের পিতা বললেন, আমি তো ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি, যদি তোমরা আমাকে বৃদ্ধ-বিভ্রান্ত না ভাবতে। (সূরা ইউসুফ: ৯৪)।
তাদের আপত্তি হলো, এখানে কেন أَجِدُ বলা হলো? কেন أَشُمُّ বলা হলো না? কারণ ঘ্রাণ তো শোঁকা হয়, পাওয়া হয় না।
এর উত্তর হলো, এই আপত্তি মূলতঃ কুরআনের ভাষা সম্পর্কে অগভীর ও সরলীকৃত বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আয়াতে أَجِدُ শব্দের ব্যবহার কোনো ভাষাগত ভুল নয়; বরং এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম, গভীর এবং প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পূর্ণ উপযুক্ত একটি শব্দচয়ন।
প্রথমত: أَجِدُ শব্দটি শুধু বাহ্যিক ইন্দ্রিয় দিয়ে কোনো কিছু অনুভব করার অর্থে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি অন্তরের অনুভব, গভীর উপলব্ধি এবং নিশ্চিত বোধকেও প্রকাশ করে। অন্যদিকে أَشُمُّ শব্দটি সাধারণত নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেওয়ার বাহ্যিক কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই যাকুব عليه السلام কেবল ইউসুফ عليه السلام-এর জামার ঘ্রাণ নাকে অনুভব করছিলেন, বিষয়টি এতটুকু ছিল না; বরং তিনি অন্তরের গভীরে ইউসুফের উপস্থিতির সংবাদ অনুভব করছিলেন। তাঁর হৃদয় যেন উপলব্ধি করছিল, ইউসুফ কাছেই আছে। তাই أَجِدُ শব্দটি এখানে বেশি গভীর ও যথাযথ। একজন কবি বলেছেন:
وليس صريرُ النعشِ ما تسمعونهُ
ولكنَّها أصلابُ قومٍ تقصَّفُ
وليس فتيقُ المسكِ ما تجدونهُ
ولكنَّه ذاك الثناءُ المخلَّفُ
– তোমরা যা শুনছ, তা জানাজার খাটিয়ার শব্দ নয়; বরং তা হলো একদল মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার শব্দ।
আর তোমরা যা পাচ্ছ, তা মেশকের সুগন্ধ নয়; বরং তা হলো রেখে যাওয়া প্রশংসার সুবাস।
এখানে কবি تجدونه শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ তোমরা তা পাচ্ছ বা অনুভব করছ। অথচ প্রসঙ্গ সুগন্ধের। এতে বোঝা যায়, আরবী ভাষায় কোনো ঘ্রাণ বা অনুভূতিকে وجد ধাতু দিয়ে প্রকাশ করা অস্বাভাবিক নয়।
তাফসীর আল-আমছালে বলা হয়েছে, আয়াতের فَصَلَتِ শব্দ থেকে বোঝা যায়, মিশর থেকে কাফেলা যাত্রা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াকুব عليه السلام বিষয়টি অনুভব করেন এবং তাঁর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু তাঁর আশপাশের লোকেরা, যারা সাধারণত তাঁর নাতি-নাতনি, পুত্রবধূ এবং পরিবার-পরিজনের লোক ছিল, তারা বিস্মিত হয়ে তাঁকে কঠোর ভাষায় বলল:
تَاللَّهِ إِنَّكَ لَفِي ضَلَالِكَ الْقَدِيمِ
আল্লাহর কসম, আপনি তো আপনার পুরোনো বিভ্রান্তিতেই আছেন। (সূরা ইউসুফ: ৯৫)।
তাদের ধারণা ছিল, বহু বছর আগে ইউসুফ মারা গেছে। অথচ ইয়াকুব عليه السلام এখনো মনে করেন, ইউসুফ জীবিত। এমনকি তিনি বলছেন, তিনি মিশর থেকে ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছেন। তাদের কাছে এটি বাস্তবতা থেকে দূরে থাকা এবং কল্পনার জগতে ডুবে থাকার মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, যাকুব عليه السلام ছিলেন আল্লাহর নবী, তাঁর অন্তর ছিল স্বচ্ছ, জাগ্রত এবং আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞানে আলোকিত। তারা নিজেদের কঠিন ও অন্ধকার হৃদয়ের মতোই ইয়াকুব عليه السلام-এর হৃদয়কেও ভেবেছিল।
তাফসীর আল-আমছালে আরও বলা হয়েছে, এখানে ضلال শব্দ দ্বারা আকীদাগত পথভ্রষ্টতা উদ্দেশ্য নয়; বরং ইউসুফ عليه السلام-এর অবস্থা সম্পর্কে যাকুব عليه السلام-এর ধারণাকে তারা ভুল মনে করেছিল। অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছিল, আপনি এখনও ইউসুফের ব্যাপারে আগের ভুল ধারণায় আছেন। (তাফসীর আল-আমসাল, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৯৬-২৯৭)।
দ্বিতীয়ত: বালাগাত বা অলংকারশাস্ত্রের সৌন্দর্য শুধু প্রচলিত শব্দ ব্যবহারে নয়; বরং প্রসঙ্গের গভীরতার সঙ্গে মানানসই শব্দ বেছে নেওয়ায়। এখানে ইয়াকুব عليه السلام মিসর থেকে রওনা হওয়া কাফেলার সঙ্গে সম্পর্কিত ইউসুফের ঘ্রাণ অনুভব করেছিলেন। এটি সাধারণ ঘ্রাণ নেওয়ার বিষয় ছিল না; বরং নববী অনুভূতি, অন্তরের উপলব্ধি এবং আল্লাহপ্রদত্ত বিশেষ জ্ঞানের প্রকাশ ছিল। তাই أَجِدُ শব্দটি أَشُمُّ শব্দের চেয়ে বেশি যথাযথ।
যখন পরে সুসংবাদবাহক ইউসুফ عليه السلام-এর জামা নিয়ে এল, তখন যাকুব عليه السلام তাঁর কথা অস্বীকারকারীদের বললেন:
قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না? (সূরা ইউসুফ: ৯৬) ।
তৃতীয়ত: আরবী ভাষায় وجد শব্দটি শুধু চোখে দেখা বা হাতে পাওয়া বোঝায় না; বরং কোনো কিছু অনুভব করা, উপলব্ধি করা এবং নিজের ভেতরে পাওয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যেমন বলা হয়, “আমি সূর্যের তাপ অনুভব করছি” বা “আমি ব্যথা অনুভব করছি।” এগুলো সবসময় বাহ্যিক স্পর্শ বা সরাসরি দেখা বোঝায় না; বরং অভ্যন্তরীণ অনুভূতিও বোঝায়।
তাই إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ অর্থ হলো, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ বা উপস্থিতির অনুভব পাচ্ছি। এটি কেবল নাকের মাধ্যমে ঘ্রাণ নেওয়া নয়; বরং এক ধরনের নিশ্চিত অন্তর্দৃষ্টি ও গভীর অনুভব।
চতুর্থত: ইয়াকুব عليه السلام ইউসুফ عليه السلام-এর সঙ্গে এক বিশেষ পিতৃসুলভ ও হৃদয়গত সম্পর্কের মধ্যে ছিলেন। তাঁর কাছে ইউসুফের ঘ্রাণ শুধু কোনো বস্তুগত সুবাস ছিল না; বরং তা ছিল প্রশান্তি, আশার পুনর্জাগরণ এবং প্রিয় সন্তানের সঙ্গে পুনর্মিলনের নিকটবর্তী হওয়ার অনুভূতি। এ কারণেই কুরআন أَشُمُّ না বলে أَجِدُ ব্যবহার করেছে, যাতে শুধু বাহ্যিক ঘ্রাণ নয়; বরং গভীর আবেগ, অন্তরের অনুভূতি এবং নিশ্চিত উপলব্ধি প্রকাশ পায়।
পঞ্চমত: এটাও বলা হয়েছে যে, ইউসুফ عليه السلام-এর ঘ্রাণ যেন তাঁর সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল। এখন ইয়াকুব عليه السلام তা আবার পেয়ে গেলেন। আর হারানো জিনিস ফিরে পেলে আরবীতে বলা হয়: وجدته — আমি তা পেয়েছি। এই দিক থেকেও أَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ বাক্যটি অত্যন্ত সুন্দর ও গভীর অর্থবহ।
সুতরাং এই আয়াতে কোনো ভাষাগত বা অলংকারগত ভুল নেই। বরং এখানে এমন এক সূক্ষ্ম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণ ঘ্রাণ নেওয়ার চেয়ে অনেক গভীর অর্থ প্রকাশ করে। ইয়াকুব عليه السلام শুধু ঘ্রাণ নেননি; তিনি ইউসুফ عليه السلام-এর উপস্থিতির সংবাদ, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং আল্লাহপ্রদত্ত সত্য অনুভব করেছিলেন। তাই কুরআনের أَجِدُ শব্দটি এখানে অত্যন্ত যথার্থ, গভীর এবং অলৌকিকভাবে বালাগাতপূর্ণ।
– আরবী থেকে অনূদিত
২৭ এপ্রিল, ২০২৬/ আল-ইলম ইনস্টিটিউট রাজশাহী।