দারস-তাদরীস ও ইলমী হালাকার পুনর্জাগরণ: দাওয়াতী কাজের করণীয়-বর্জনীয় ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা (দ্বিতীয় পর্ব)
দাওয়াতী কাজ কেবল কিছু বক্তব্য দেওয়া বা মানুষকে সাময়িকভাবে প্রভাবিত করার নাম নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, সুপরিকল্পিত ও ইলমভিত্তিক প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য মানুষের আকীদা, আমল ও চরিত্রে স্থায়ী পরিবর্তন আনা। প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করেছি, কীভাবে দারস ও ইলমী হালাকার পরিবর্তে ওয়াজকেন্দ্রিক সংস্কৃতি আমাদের সমাজে প্রাধান্য পেয়েছে এবং এর ফলে ইলমী দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এই দ্বিতীয় পর্বে আমরা আলোচনা করব এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের দাওয়াতী কাজ কীভাবে সাজানো উচিত, কী করণীয় এবং কী বর্জনীয়। ইনশাআল্লাহ, ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। দাওয়াতী কাজের মূল লক্ষ্য হতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষকে সত্যিকার অর্থে দ্বীনের পথে আনা। এখানে জনপ্রিয়তা, অনুসারীর সংখ্যা বা আর্থিক লাভ কোনো লক্ষ্য হতে পারে না। যখন দাওয়াতের উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ থাকে, তখন পদ্ধতিও স্বাভাবিকভাবে ইলমভিত্তিক ও স্থায়ী ফলদায়ক হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যে যদি খুঁত থাকে, তাহলে দাওয়াত আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনে না।
দাওয়াতী কাজের একটি মৌলিক করণীয় হলো ইলমকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালনা করা। প্রতিটি এলাকায় মসজিদভিত্তিক নিয়মিত দারস চালু করতে হবে। কুরআন তাফসীর, সহীহ হাদীস, আকীদা ও ফিকহ এসব বিষয়ে ধাপে ধাপে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। দাওয়াতের নামে শুধুমাত্র বক্তৃতা নয়, বরং একটি শিক্ষা-প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে। একজন ব্যক্তি যেন এক বছর, দুই বছর বা তারও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে শিখতে পারে এই ধরনের পরিকল্পনা জরুরি। এভাবেই একজন সাধারণ মুসলিম ধীরে ধীরে সচেতন, পরিপক্ব ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে গড়ে উঠবে।
একইসাথে দাওয়াতী কাজকে স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রত্যেক আলেম ও দাঈর উচিত নিজের এলাকার মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দূর-দূরান্তে গিয়ে বড় বড় মাহফিলে অংশগ্রহণ করার চেয়ে নিজ এলাকার মসজিদে নিয়মিত দারস দেওয়া অনেক বেশি ফলপ্রসূ। এতে মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাদের সমস্যা জানা যায় এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দেওয়া সম্ভব হয়। দাওয়াত তখন একটি জীবন্ত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়।
তরুণ সমাজকে দাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয়। বর্তমান প্রজন্ম প্রশ্ন করতে চায়, বুঝতে চায়, যুক্তি খুঁজে। তাই তাদের জন্য আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও চিন্তাশীল সেশন আয়োজন করতে হবে। তাদেরকে কেবল শ্রোতা বানিয়ে রাখলে চলবে না; বরং দাওয়াতের অংশীদার বানাতে হবে। যারা শিখবে, তাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের দাঈ ও আলেম তৈরি হবে।
দাওয়াতী কাজে প্রযুক্তির ব্যবহারও এখন অপরিহার্য। অনলাইন দারস, রেকর্ডেড ক্লাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্যবহুল কন্টেন্ট এসবের মাধ্যমে ইলমকে সহজলভ্য করা যায়। তবে এখানে সতর্কতা হলো, কন্টেন্ট যেন শুধু আকর্ষণীয় না হয়ে সত্যিকার অর্থে উপকারী ও ইলমসমৃদ্ধ হয়।
এবার বর্জনীয় দিকগুলোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় বর্জনীয় বিষয় হলো দাওয়াতকে বিনোদনে পরিণত করা। যদি দাওয়াতী প্রোগ্রাম শুধুমাত্র আবেগ সৃষ্টি, হাস্যরস বা চমক প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা দ্বীনের উদ্দেশ্য পূরণ করে না। মানুষ সাময়িকভাবে আনন্দ পেলেও তাদের জীবনে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসে না। তাই দাওয়াতের প্রতিটি ধাপেই ইলম ও হিকমাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অন্য একটি বর্জনীয় দিক হলো অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অপচয়। দাওয়াতের নামে বড় মঞ্চ, ব্যানার, অপ্রয়োজনীয় খরচ এসব থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ এই খরচ যদি ইলমী কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়, তাহলে তার সুফল অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে। সরলতা ও আন্তরিকতা দাওয়াতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, বাহ্যিক চাকচিক্য নয়।
এছাড়াও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা একটি বড় সমস্যা। দাওয়াত যদি কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ব্যক্তি না থাকলে কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে যায়। তাই ব্যক্তি নয়, বরং পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দাওয়াত গড়ে তুলতে হবে। একটি সুসংগঠিত টিম, নির্ধারিত সিলেবাস এবং ধারাবাহিক কার্যক্রম এসবই দাওয়াতকে স্থায়ী করে।
ভবিষ্যতের দাওয়াতী রূপরেখা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। ওয়াজ মাহফিলকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়, তবে এর ভূমিকা সীমিত রাখতে হবে। এটি মানুষের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করবে, আর সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে দারস ও হালাকার দিকে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ, ওয়াজ হবে সূচনা, আর হালাকা হবে পরিপূর্ণতা।
সবশেষে বলতে চাই, দাওয়াতী কাজের সফলতা নির্ভর করে ধারাবাহিকতা, পরিকল্পনা এবং ইলমের ওপর। যদি আমরা আমাদের দাওয়াতকে ইলমকেন্দ্রিক করতে পারি, মসজিদকে শিক্ষা-কেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারি এবং আলেম ও সাধারণ মানুষের মাঝে একটি জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, তাহলেই ইনশাআল্লাহ সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। অন্যথায় আমরা যত বড় আয়োজনই করি না কেন, তা সাময়িক প্রভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
অতএব, এখন সময় এসেছে আমাদের দাওয়াতী কাজকে নতুনভাবে ভাবার, আবেগ থেকে ইলমের দিকে, অনুষ্ঠান থেকে ধারাবাহিক শিক্ষার দিকে, এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে উম্মাহকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে অগ্রসর হওয়ার। তবেই ইনশাআল্লাহ আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক, সচেতন ও শক্তিশালী মুসলিম সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। মহান আল্লাহ তৌফীক্ব দান করুন। আমীন!
– বিনীত/ আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইনস্টিটিউট রাজশাহী-৬২০৩।