পবিত্র কুরআন অনুধাবন এবং এর স্তরসমূহ
যখন একজন মুসলিম কুরআন তিলাওয়াত করে, সুন্দরভাবে পড়তে শেখে এবং তা হিফয ও আয়ত্ত করে, তখন তার উচিত কুরআনের আয়াত, কাহিনী, মূল্যবোধ, মানদণ্ড, চিন্তা-ধারা, মূলনীতি, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা। কারণ কুরআন অনুধাবন (তাদাব্বুর) হলো কুরআনের প্রতি গভীর মনোযোগেরই একটি রূপ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا﴾
আর তিনি আরও বলেন,
﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا﴾
একজন তাফসীর কারক বলেন,
এই আয়াত মানুষকে বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করে, তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? কুরআন অনুধাবন হৃদয়ের পর্দা সরিয়ে দেয়, অন্তরকে আলোকিত করে, অনুভূতিকে জাগ্রত করে, হৃদয়কে সজীব করে তোলে এবং আত্মাকে নতুন জীবন দান করে। আর যদি হৃদয় তালাবদ্ধ থাকে, তবে তা কুরআনের আলো গ্রহণ করতে পারে না।
কুরআন বোঝার উপায়-
কুরআন অনুধাবনের অন্যতম মাধ্যম হলো আরবী ভাষা শেখা। এর ব্যাকরণ, সাহিত্য ও শৈলীসহ। কারণ কুরআন নাজিল হয়েছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।
তেমনি নবী ﷺ এর সুন্নাহ বোঝাও জরুরি, কারণ সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যাকারী, এর অস্পষ্ট বিষয়কে পরিষ্কার করে এবং এর সংক্ষিপ্ত বিষয়কে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে।
একজন দাঈ (আহ্বানকারী) এর জন্য কুরআন বোঝা অত্যন্ত জরুরি, যাতে তিনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সঠিক উপলব্ধির সাথে দাওয়াত দিতে পারেন। নতুবা ইচ্ছা ভালো হলেও ভুল বোঝার কারণে ক্ষতি হতে পারে।
আল্লাহ বলেন,
﴿كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ﴾
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য হলো সঠিক বুঝ আল্লাহর মহান নিয়ামত। তিনি বলেন, সঠিক বোঝাপড়া এবং সৎ উদ্দেশ্য এ দুটো আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত। এর মাধ্যমেই মানুষ হেদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা পায়।
সঠিক বুঝ হলো আল্লাহ প্রদত্ত এক আলোক, যার মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা, হক-বাতিল ও হেদায়াত-গোমরাহি আলাদা করা যায়। আর এটি বৃদ্ধি পায় খাঁটি ইখলাস, তাকওয়া এবং সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে।
কুরআন বোঝার স্তরসমূহ-
১. শব্দার্থ অনুধাবন: কুরআনের শব্দ ও শব্দভাণ্ডারের অর্থ জানা, যাতে আয়াতের মূল অর্থ পরিষ্কার হয়।
২. সামগ্রিক অর্থ বোঝা: আয়াত, গল্প বা সূরার সামগ্রিক বার্তা ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করা।
৩. গভীর ও সূক্ষ্ম অনুধাবন: কুরআনের উদ্দেশ্য, হিকমাহ, রহস্য ও গভীর অর্থ বুঝতে পারা। এটি পূর্ববর্তী দুই স্তরের উপর ভিত্তি করে দীর্ঘ চিন্তা ও ইখলাসের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়ন পদ্ধতি (القراءة الموضوعية)-
কুরআন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়ন। যেমন:
– তাকওয়া কুরআনে কীভাবে এসেছে
– আখিরাত সম্পর্কে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
– নারী সম্পর্কে কুরআনের আলোচনা
– মানুষ সম্পর্কে কুরআনের বর্ণনা
এর জন্য পুরো কুরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে সেই নির্দিষ্ট বিষয়ের সব আয়াত একত্র করে চিন্তা করতে হয়। শুধু শব্দ-ভিত্তিক অনুসন্ধান করলে অনেক সময় অসম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়; কিন্তু বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়ন গভীর ও পূর্ণাঙ্গ বোঝাপড়া প্রদান করে।
সঠিক বোঝাপড়া ও কুরআন অনুধাবন হলো আল্লাহর এক মহান অনুগ্রহ। যে ব্যক্তি ইখলাস, চিন্তা-ভাবনা ও নিয়মিত অধ্যয়নের মাধ্যমে কুরআনের দিকে অগ্রসর হয়, তার জন্য কুরআন খুলে দেয় হেদায়াত, জ্ঞান ও হৃদয়ের আলো।