ইয়েমেনের শিক্ষা ব্যবস্থা: মেধা ও প্রতিভার স্বর্গরাজ্য এবং ইলমের জীবন্ত সিলসিলা-
– আব্দুল হাকীম মাদানী
যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সংবাদে ইয়েমেনের যে পরিচয়টি প্রায়ই আড়ালে চলে যায়, তা হলো দেশটি আরব ও ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাচীন ভূখণ্ড। সানআ’, জাবিদ, তারীম, সা‘দাহ, ধামার ও হাযরামাউতের বিভিন্ন শহরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মসজিদ, মাদরাসা, কুত্তাব, রিবাত, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার এবং আলেমদের গৃহকে কেন্দ্র করে শিক্ষা বিস্তার লাভ করেছে। এ কারণেই ইয়েমেনকে সাহিত্যিক অর্থে “মেধা ও প্রতিভার স্বর্গরাজ্য” বলা যায়, যদিও এটি কোনো আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক র্যাংকিং বা আনুষ্ঠানিক উপাধি নয়।
ইউনেস্কোর বিবরণ অনুযায়ী, ঐতিহাসিক জাবিদ নগরী কয়েক শতাব্দী ধরে তার প্রসিদ্ধ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে সমগ্র আরব ও মুসলিম বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র ছিল। অন্যদিকে, হাযরামাউতের তারীম শহরের রিবাত ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলো স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত তালিবুল ইলমদেরও আকৃষ্ট করেছে। এ দুই নগরীর পাণ্ডুলিপি, পাঠচক্র, سماع বা শ্রবণ-নথি এবং ইজাযাহর দলিল ইয়েমেনের জ্ঞানচর্চাকে একটি দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ঐতিহ্যে পরিণত করেছে।
আধুনিক ইয়েমেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা-
ইয়েমেনের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম ধাপ হলো প্রাক্-মৌলিক শিক্ষা, অর্থাৎ নার্সারি ও কিন্ডারগার্টেন। সাধারণত তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরা এই পর্যায়ে অংশ নিতে পারে। এরপর ছয় বছর বয়সে শিশু মৌলিক শিক্ষার প্রথম শ্রেণিতে প্রবেশ করে। মৌলিক শিক্ষা মোট নয় বছরের এবং আইনে একে বাধ্যতামূলক সাধারণ শিক্ষা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
মৌলিক শিক্ষার নয় বছর শেষ করার পর শিক্ষার্থীরা তিন বছরের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রবেশ করে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়-পূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাধারণ কাঠামো হলো—
৩–৬ বছর: প্রাক্-মৌলিক শিক্ষা → ৯ বছর: মৌলিক শিক্ষা → ৩ বছর: মাধ্যমিক শিক্ষা → উচ্চশিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষা।
১৯৯৪ সাল থেকে সমন্বিতভাবে ব্যবহৃত এই কাঠামোকে সাধারণত ৯+৩ ব্যবস্থা বলা হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের পর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ইয়েমেনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই, শিক্ষকদের নির্দেশিকা, পাঠক্রম, পরীক্ষার ফলাফল, শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার এবং বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী প্রকাশ করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে দেশটির আধুনিক শিক্ষা কেবল ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পাঠক্রম ও পরীক্ষাভিত্তিক ব্যবস্থাও রয়েছে।
ইয়েমেনি শিশুর পড়াশোনা কীভাবে শুরু হয়?-
ইয়েমেনে একটি শিশুর শিক্ষাজীবনকে প্রধানত দুটি ধারায় বোঝা যায়, আধুনিক বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষা এবং ঐতিহ্যবাহী কুরআনি শিক্ষা। অনেক ক্ষেত্রে এই দুটি ধারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক।
বিদ্যালয়ভিত্তিক শুরু-
শহুরে বা সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পরিবারে শিশুকে প্রথমে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করা হতে পারে। সেখানে ভাষা, সংখ্যা, রং, আচরণ, পরিচ্ছন্নতা, দলবদ্ধ কার্যক্রম এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করা হয়। ছয় বছর পূর্ণ হলে সে প্রথম শ্রেণিতে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে আরবি পড়া-লেখা, গণিত ও অন্যান্য সাধারণ বিষয় শেখে। প্রাক্-মৌলিক শিক্ষার আইনি উদ্দেশ্যের মধ্যেও শিশুর মনে শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি, উত্তম অভ্যাস গঠন এবং পরবর্তী শিক্ষার জন্য তাকে প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে।
কুত্তাব বা “মা‘লামাহ”-ভিত্তিক শুরু-
ইয়েমেনের ঐতিহ্যবাহী প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রকে আরবিতে الكُتّاب—আল-কুত্তাব এবং স্থানীয়ভাবে অনেক অঞ্চলে المعلامة—আল-মা‘লামাহ বলা হয়। এটি সাধারণত কোনো মসজিদের কক্ষ, মসজিদসংলগ্ন ঘর, শিক্ষকের বাড়ি কিংবা ছোট একটি পাঠকেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে উঠত। আধুনিক বিদ্যালয় বিস্তারের আগে কুত্তাবই ছিল ইয়েমেনের সবচেয়ে পরিচিত প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
মা‘লামাহে শিশুর পড়াশোনা সাধারণত আরবি বর্ণমালা দিয়ে শুরু হতো। শিক্ষক কাঠের তক্তা বা বোর্ডে অক্ষর লিখতেন, শিশুরা নিজ নিজ ফলক বা তক্তায় সেই অক্ষর অনুলিখন করত এবং উচ্চারণ করত। একক অক্ষর শেখার পর অক্ষর যুক্ত করে শব্দ গঠন, তারপর কুরআনের ছোট ছোট অংশ পড়া ও মুখস্থ করার পর্যায় আসত। পরবর্তী পর্যায়ে ইমলা, হাতের লেখা, মৌলিক গণিত, নামতা, ওজু-সালাত, আদব-আখলাক এবং সামাজিক শিষ্টাচারও শেখানো হতো।
এই শিক্ষাপদ্ধতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল পুনরাবৃত্তি ও সরাসরি শ্রবণ। শিশু শিক্ষককে শুনত, তার উচ্চারণ অনুকরণ করত, বারবার পাঠ করত এবং ভুল হলে শিক্ষক তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করতেন। কখনো অগ্রসর শিক্ষার্থীরা ছোটদের অক্ষর, শব্দ বা মুখস্থ পাঠ শিখতে সাহায্য করত। ফলে একই পাঠকক্ষে ব্যক্তিগত শিক্ষা, দলীয় পাঠ এবং সহপাঠী-শিক্ষণ তিনটিই কার্যকর থাকত।
তারীমের প্রাচীন মা‘লামাহগুলোর একটিতে শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন অল্পসংখ্যক আয়াত লিখে মুখস্থ করার রীতি ছিল। কুরআন হিফজের পর কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রাথমিক ফিকহ ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করত। বর্তমানে কিছু ঐতিহ্যবাহী মা‘লামাহ বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে যেমন আসরের পর কুরআন, তাজবিদ ও প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষা প্রদান করে।
কেন ইয়েমেনকে “মেধা ও প্রতিভার স্বর্গরাজ্য” বলা হয়?-
ইয়েমেনকে এই নামে অভিহিত করার অর্থ এই নয় যে দেশটির বর্তমান বিদ্যালয়ব্যবস্থা পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানের। বরং এর অর্থ হলো দীর্ঘকাল ধরে ইয়েমেনি সমাজে জ্ঞান, মুখস্থশক্তি, ভাষা, কবিতা, বংশতত্ত্ব, ইতিহাস, ফিকহ, হাদিস, ভূগোল ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণকে অত্যন্ত সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
জাবিদ ছিল ইসলামী শিক্ষা ও পাণ্ডুলিপির একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। তারীমের মসজিদ, রিবাত ও আলেমদের গৃহে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। সেখানে শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় ছিল না; বরং শিক্ষককে অনুসরণ করা, গ্রন্থ পাঠ করা, আলোচনা করা, আচার-আচরণ শেখা এবং দীর্ঘদিন কোনো আলেমের সাহচর্যে থাকার সমন্বিত প্রক্রিয়া ছিল।
ইয়েমেনের জ্ঞান-ঐতিহ্যের বিস্তৃতি কেবল ধর্মীয় বিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, দশম শতাব্দীর ইয়েমেনি পণ্ডিত আবু মুহাম্মদ আল-হামদানি ইতিহাস, ভূগোল, আরব বংশতত্ত্ব এবং খনিজসংক্রান্ত জ্ঞানচর্চার জন্য পরিচিত। তাঁর ভ্রমণ ও গবেষণাভিত্তিক রচনাগুলো আরব উপদ্বীপের ইতিহাস ও ভূগোল বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তী যুগে মুহাম্মদ ইবন আলী আশ-শাওকানি ইয়েমেনের অন্যতম বিশিষ্ট ফকিহ, মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদ হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর জীবন থেকে বোঝা যায় যে ইয়েমেনি শিক্ষাব্যবস্থায় কুরআন মুখস্থ, আলেমদের নিকট পাঠগ্রহণ, ব্যাপক ব্যক্তিগত অধ্যয়ন, গ্রন্থ রচনা এবং স্বাধীন গবেষণা সবকিছুর সমন্বয় ঘটত।
অতএব, ইয়েমেনের “প্রতিভা” কেবল জন্মগত মেধার গল্প নয়। এর পেছনে ছিল পরিবার ও সমাজে জ্ঞানের মর্যাদা, অল্প বয়সে ভাষা ও কুরআন শিক্ষা, স্মৃতিশক্তির অনুশীলন, শিক্ষকের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক, নিয়মিত পাঠচক্র এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা।
“ইলমের সিলসিলা” বলতে কী বোঝায়?-
সিলসিলা—سلسلة শব্দের অর্থ শৃঙ্খল বা ধারাবাহিক সংযোগ। ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে “ইলমের সিলসিলা” বলতে বোঝায় একজন শিক্ষার্থী কার কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করলেন, তাঁর শিক্ষক কার কাছ থেকে শিখলেন, সেই শিক্ষকের শিক্ষক কে ছিলেন এভাবে পূর্ববর্তী আলেমদের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের উৎস পর্যন্ত পৌঁছানো একটি ধারাবাহিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক।
এই ব্যবস্থার কয়েকটি প্রধান পরিভাষা হলো—
التلقّي—তালাক্কি: সরাসরি শিক্ষকের কাছ থেকে শোনা ও শেখা।
المشافهة—মুশাফাহাহ: মুখোমুখি উচ্চারণ করে পাঠ গ্রহণ।
السند—সনদ: শিক্ষক ও পূর্ববর্তী শিক্ষকদের ধারাবাহিক নামের শৃঙ্খল।
الإجازة—ইজাযাহ: শিক্ষার্থী কোনো নির্দিষ্ট পাঠ বা বিদ্যায় যোগ্যতা অর্জন করেছে—শিক্ষকের এমন স্বীকৃতি।
المتن—মতন: মুখস্থ বা অধ্যয়ন করা মূল সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ।
الشرح—শরহ: সেই মূল গ্রন্থের ব্যাখ্যা।
কুরআনের ক্ষেত্রে সিলসিলা-
একজন শিক্ষার্থী প্রথমে কোনো কারির কাছে শুদ্ধ উচ্চারণ, মাখরাজ ও তাজবিদ শেখে। এরপর পুরো কুরআন দেখে অথবা মুখস্থ অবস্থায় শিক্ষকের কাছে পাঠ করে। শিক্ষক প্রতিটি ভুল সংশোধন করেন। শিক্ষার্থী যথাযথভাবে পাঠ সম্পন্ন করলে শিক্ষক তাকে ইজাযাহ দিতে পারেন। সেই ইজাযাহতে শিক্ষক থেকে তাঁর শিক্ষক এভাবে কুরআনের পাঠপরম্পরার একটি সংযুক্ত সনদ উল্লেখ থাকতে পারে।
হাদিস ও অন্যান্য শাস্ত্রে সিলসিলা-
হাদিসশাস্ত্রে সনদ দ্বারা কোনো বর্ণনা কার মাধ্যমে কার কাছে পৌঁছেছে তা বোঝানো হয়। ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ, তাফসির বা অন্য কোনো গ্রন্থের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী শায়খের কাছে গ্রন্থটি পড়তে পারে, শায়খের পাঠ শুনতে পারে, ব্যাখ্যা ও প্রশ্নোত্তরে অংশ নিতে পারে এবং পাঠ সম্পন্ন হলে নির্দিষ্ট গ্রন্থ বা বিষয়ে ইজাযাহ লাভ করতে পারে।
জাবিদ ও তারীমের পাণ্ডুলিপিগুলোতে পাওয়া মালিকানা-নথি, পাঠ-নথি, سماع বা শ্রবণের তথ্য এবং ইজাযাহকে গবেষকেরা এক ধরনের “পাঠের নিরাপত্তা-শৃঙ্খল” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এসব নথি থেকে জানা যায় কোন গ্রন্থ কে লিখেছেন, কে কপি করেছেন, কার সামনে পড়া হয়েছে এবং কোন পথে তা পরবর্তী পাঠকের কাছে পৌঁছেছে।
তবে ইজাযাহকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে দেখা ঠিক নয়। ইজাযাহ প্রধানত কোনো শায়খের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীর পাঠ, দক্ষতা বা শিক্ষাদানের যোগ্যতার সাক্ষ্য। ইসলামী ঐতিহ্যের আলেমদের ব্যাখ্যায়, প্রত্যেক বিদ্যায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইজাযাহ সব সময় অপরিহার্য শর্ত নয়; কিন্তু শিক্ষার্থীর যোগ্যতা সাধারণ মানুষের কাছে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়ন হিসেবে কাজ করেছে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে বর্তমান ইয়েমেন-
ইয়েমেনের এই সমৃদ্ধ শিক্ষাঐতিহ্য বর্তমানে গভীর সংকটের মুখোমুখি। ইউনিসেফের আরবি তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের কারণে প্রায় ৬০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৫ সালের আরেকটি ইউনিসেফ প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৭ লাখের বেশি শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। দুটি সংখ্যার সংজ্ঞা এক নয়—প্রথমটি শিক্ষা বিঘ্নিত হওয়ার বিস্তৃত ঝুঁকি, আর দ্বিতীয়টি কার্যকর শিক্ষাসুযোগ না পাওয়া শিশুদের নির্দেশ করে।
বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শিক্ষকসংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে স্কুলে যাওয়া এবং গ্রামীণ এলাকায় বিশেষত মেয়েশিশুদের প্রবেশাধিকার সবকিছু শিক্ষাকে কঠিন করে তুলেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ এক হাজারের বেশি বিদ্যালয় পুনর্বাসন, ৩৫ হাজারের বেশি শিক্ষক ও বিদ্যালয়কর্মীকে প্রণোদনা এবং গ্রামীণ এলাকার দুই হাজারের বেশি নারী শিক্ষককে নিয়মিত আর্থিক সহায়তার কর্মসূচির কথা জানিয়েছে।
এই বাস্তবতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্ট হয়: ইয়েমেনে প্রতিভার অভাব নেই; অভাব হচ্ছে নিরাপদ বিদ্যালয়, প্রশিক্ষিত ও বেতনপ্রাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষাসামগ্রী এবং অবিচ্ছিন্ন শিক্ষার সুযোগের।
ইয়েমেনি শিক্ষাধারা থেকে আমাদের শিক্ষা-
ইয়েমেনের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থার সবকিছু হুবহু গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর কয়েকটি শক্তিশালী দিক আধুনিক শিক্ষায়ও মূল্যবান-
প্রথমত, শিশুকে অল্প বয়সে ভাষা, শুদ্ধ উচ্চারণ ও নিয়মিত পাঠের অভ্যাস করানো। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করা। তৃতীয়ত, মুখস্থের সঙ্গে অর্থ, ব্যাখ্যা, অনুশীলন ও চরিত্রগঠন যুক্ত করা। চতুর্থত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমাজ ও পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা।
তবে বর্তমান যুগে এর সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান, গবেষণা, শিশুর মানসিক নিরাপত্তা এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা যোগ করা জরুরি। শাস্তিভিত্তিক শিক্ষা, অন্ধ মুখস্থ এবং শিক্ষককে প্রশ্ন করা যাবে না—এমন মানসিকতা পরিহার করে ঐতিহ্যের শক্তিকে শিশুকেন্দ্রিক আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করাই হবে গঠনমূলক পথ।
সর্বোপরি ইয়েমেনের শিক্ষার ইতিহাস মূলত একটি ধারাবাহিক যাত্রা-
ঘর থেকে মা‘লামাহ,
মা‘লামাহ থেকে মসজিদের হালাকা,
হালাকা থেকে রিবাত ও মাদরাসা,
গ্রন্থ থেকে শিক্ষক,
শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থী,
এবং শিক্ষার্থী থেকে পরবর্তী প্রজন্ম।
এই ধারাবাহিকতাই ইয়েমেনের ইলমের সিলসিলা। যুদ্ধ ও সংকট দেশটির বিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিশুদের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও জ্ঞানকে সম্মান করার ঐতিহ্য এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তাই ইয়েমেনকে “মেধা ও প্রতিভার স্বর্গরাজ্য” বলার গভীরতম অর্থ হলো সেখানে জ্ঞান কেবল পরীক্ষায় পাস করার উপকরণ ছিল না; জ্ঞান ছিল আমানত, শিক্ষক ছিলেন সেই আমানতের বাহক এবং শিক্ষার্থী ছিল পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বশীল উত্তরাধিকারী।
১১ জুলাই, ২০২৬
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।