ইলমী মতভেদকে সাধারণ জনতার সংঘাতে পরিণত করা: তলিবুল ইলমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা-
হে প্রজ্ঞাবান তলিবুল ইলম! আল্লাহ আমাকে ও আপনাকে সঠিক বুঝ, দূরদৃষ্টি এবং সত্য গ্রহণের তাওফীক দান করুন।
জেনে রাখুন, ইলমী জগতের অন্যতম বিপজ্জনক পদ্ধতিগত ভুল হলো, বিশেষজ্ঞ আলেম ও গবেষকদের মধ্যকার সূক্ষ্ম ও জটিল মতভেদ সাধারণ মানুষের সামনে এমনভাবে তুলে ধরা, যেন জনমত, আবেগ অথবা অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে এসব বিষয়ের ফয়সালা করা সম্ভব। অথচ কিছু মাসআলা এমন আছে, যার সঠিক বিচার কেবল গভীর জ্ঞান, সুস্পষ্ট দলিল, গবেষণা, প্রাসঙ্গিকতা এবং সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রে দক্ষতার মাধ্যমেই করা যায়।
সাধারণ মুসলিমদের প্রধান প্রয়োজন হলো এমন জ্ঞান, যা তাদের আকীদা সংশোধন করবে, ইবাদত বিশুদ্ধ করবে, চরিত্র পরিশীলিত করবে এবং দৈনন্দিন লেনদেন সঠিক করবে। তাদেরকে আলেমদের জটিল মতভেদ, পারস্পরিক সমালোচনা কিংবা বিভিন্ন চিন্তাধারার সংঘর্ষের জ্বালানি বানানো কোনোভাবেই ইলমের খেদমত নয়। বরং এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, পক্ষপাত বৃদ্ধি পায় এবং ইলমি আলোচনার মর্যাদা নষ্ট হয়।
যখন গবেষণাগার, পাঠচক্র ও আলেমদের বৈঠকে সীমাবদ্ধ থাকার উপযুক্ত কোনো সূক্ষ্ম মতভেদ জনতার উত্তেজনা ও সামাজিক প্রচারণার অঙ্গনে চলে আসে, তখন সাধারণত দলিলের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আবেগ ও গোষ্ঠীগত পক্ষপাতের আওয়াজ উঁচু হয়ে যায়। তখন প্রমাণের জায়গা দখল করে নেয় জনপ্রিয় স্লোগান, গবেষণার বদলে ব্যবহৃত হয় গণমাধ্যমের প্রভাব, আর সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের পরিবর্তে অনুসারীর সংখ্যা হয়ে ওঠে সিদ্ধান্তের মাপকাঠি।
এ অবস্থায় বহু সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করে যার সমর্থক বেশি, তার কথাই নিশ্চয়ই সঠিক। অথচ সত্য কখনো অনুসারীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; সত্যকে চেনা হয় তার দলিল ও প্রমাণ দিয়ে। কোনো বক্তব্যের মূল্যায়ন করা হয় তার যুক্তির শক্তিতে, বক্তার খ্যাতি কিংবা জনসমর্থনের ব্যাপকতায় নয়।
এর অর্থ এই নয় যে সাধারণ মানুষকে দ্বীনি জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করতে হবে অথবা তাদের কাছে শরীয়তের বিধান গোপন রাখতে হবে। বরং তাদের এমন জ্ঞান শেখাতে হবে, যা তাদের ঈমানকে সঠিক করবে, সালাত ও অন্যান্য ইবাদতকে শুদ্ধ করবে, নৈতিকতা উন্নত করবে এবং সামাজিক ও আর্থিক লেনদেনকে সুশৃঙ্খল করবে।
কিন্তু যেসব জটিল মতভেদ সঠিকভাবে বুঝতে আরবি ভাষা, উসূলুল ফিকহ, হাদিসশাস্ত্র, আকীদা, ইতিহাস, প্রেক্ষাপট এবং প্রমাণের মধ্যে তুলনামূলক বিচার করার যোগ্যতা প্রয়োজন; সেসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে দলীয় সংঘর্ষে টেনে আনা উচিত নয়। কারণ তারা সাধারণত এসব মতভেদের পূর্ণ রূপ কল্পনা করতে কিংবা প্রমাণসমূহের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে সক্ষম নয়।
এই ব্যাধি কোনো একটি বিশেষ দল, মাযহাব বা চিন্তাধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে কোনো গোষ্ঠী যদি নিজেদের মত, নেতা, আলেম বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিজয় অর্জনের জন্য সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে এবং দলিল, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের পরিবর্তে জনতার শক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তারা ইলমের ক্ষতি করে।
এ ধরনের আচরণ গোঁড়ামি ও ফিতনার দরজা খুলে দেয়, সাধারণ মানুষের অন্তরে আলেমদের মর্যাদা দুর্বল করে এবং ইলমি মতভেদকে সত্যে পৌঁছার মাধ্যম থেকে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা, অনুসারী সংগ্রহ করা ও ভিন্নমতাবলম্বীকে বাদ দেওয়ার অস্ত্রে পরিণত করে।
অথচ ইলম কোলাহল-উচ্চবাচ্য দিয়ে সংরক্ষিত হয় না এবং জনতার ভিড় দিয়ে বিজয়ী হয় না। ইলম সংরক্ষিত হয় গভীর জ্ঞান, আমানতদারি, সততা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। এটি শক্তিশালী হয় ন্যায়বিচার ও ইনসাফে এবং বিজয়ী হয় সুস্পষ্ট দলিল ও প্রমাণের মাধ্যমে।
ইমাম মালিক رحمه الله-এর নামে প্রসিদ্ধ একটি কথা হলো,
كُلٌّ يُؤْخَذُ مِنْ قَوْلِهِ وَيُرَدُّ إِلَّا صَاحِبَ هَذَا الْقَبْرِ ﷺ
অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষের বক্তব্য থেকে কিছু গ্রহণ করা হবে এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করা হবে; তবে এই কবরের অধিবাসী রাসূলুল্লাহ ﷺ ব্যতীত।
এই নীতি থেকে আমাদের শেখার আছে, কোনো আলেম, শায়খ, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। প্রত্যেক বক্তব্য কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং গ্রহণযোগ্য শরয়ি প্রমাণের আলোকে যাচাই করতে হবে।
প্রকৃত তলিবুল ইলম কখনো অনুসারীর সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত থাকে না; সে শক্তিশালী দলিল অনুসন্ধান করে। সে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বিশেষজ্ঞ আলেমদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করে না; বরং জটিল ও নতুন সমস্যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিজ্ঞ আলেমদের কাছে ফিরে যায়।
কারণ ইলম একটি আমানত, ন্যায়বিচার একটি ফরজ দায়িত্ব এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য উচ্ছৃঙ্খল জনতার প্রয়োজন হয় না। সত্যের প্রয়োজন এমন কিছু জ্ঞানী, আমানতদার ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের, যারা তাকে সঠিকভাবে চিনবেন এবং হিকমাহ, প্রমাণ ও ইনসাফের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করবেন।
তাই আমার-আপনার কর্তব্য হলো, মতভেদের সময় অহেতুক উত্তেজনা নয়, দলিল অনুসন্ধান করা; ব্যক্তিপূজা নয়, সত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া; দলীয় বিজয় নয়, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। আপনার প্রিয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিপক্ষে হলেও সত্যকে গ্রহণ করুন এবং যাদের সঙ্গে মতভেদ করেন, তাদের প্রতিও ন্যায়বিচার ও শিষ্টাচার বজায় রাখুন।
হে আল্লাহ! আমাদের উপকারী জ্ঞান, সঠিক উপলব্ধি, কথা ও বিচারে ন্যায়পরায়ণতা এবং ইলমের ক্ষেত্রে আমানতদারি দান করুন। আমাদের সমমত ও ভিন্নমত সবার সঙ্গে ইনসাফ করার তাওফীক দিন। আমাদের কাছে সত্যকে আমাদের নিজস্ব মত, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দলীয় পরিচয়ের চেয়েও অধিক প্রিয় করে দিন। নিশ্চয়ই আপনিই সরল পথের দিকে হিদায়াত করেন। আমীন!
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।