মাযহাব মানা যাবে কিনা?
মাযহাব মানা যাবে কিনা? এ প্রশ্নটি আমাদের সমাজে বিশেষ করে জ্ঞানপিপাসু দ্বীনীভাইদের মাঝে বহু বিতর্ক ও অনুসন্ধানের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত যারা সালাফী বা আহলে হাদীস চিন্তাধারার অনুসারী, তারা সরাসরি মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে দ্বীনের অনুসরণ করতে আগ্রহী এবং অন্ধ আনুগত্য থেকে মুক্ত থাকতে চান।
মাযহাবের সংজ্ঞা (مفهوم المذ هب):
মাযহাব শব্দের অর্থ পথ, মত বা মতবাদ। ইসলামী শরীআহর পরিভাষায় মাযহাব বলতে চার ইমামের (ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ রাহিমাহুমুল্লাহ) ফিক্বহী চিন্তাধারা ও ব্যাখ্যা পদ্ধতির অনুসৃত ধারা বোঝানো হয়।
মাযহাব অনুসরণে সালাফী তথা আহলে হাদীস দৃষ্টিভঙ্গি: এক্ষেত্রে তাদের কিছু মূলনীতি রয়েছে। যেমন-
১. কুরআন ও সহীহ হাদীসই একমাত্র দলীল। সালাফীরা বিশ্বাস করেন যে, ইসলাম হলো কুরআন এবং সহীহ হাদীস ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা। এখানে কোনো ইমামের মতামত তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তা কুরআন ও হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, كلٌّ يُؤخذُ من قولِه ويُتركُ إلا صاحبَ هذا القبر -অর্থাৎ, সবার কথাই নেওয়া বা ছেড়ে দেওয়া যাবে, কিন্তু এই কবরের অধিবাসী তথা রাসূল ﷺ ব্যতীত।(ইবনু আব্দিল বার, জামিঊ বায়ানিল ইলম)।
ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, إذا صح الحديث فهو مذهبي -অর্থাৎ, যদি হাদীস সহীহ হয়, সেটিই আমার মাযহাব। সুতরাং, কোনো ইমামের বক্তব্য হাদীসের বিরোধী হলে, সালাফীদের মতে সেই বক্তব্য পরিত্যাজ্য।
২. মাযহাব নয়, বরং অনুসরণ করতে হয় কুরআন ও সুন্নাহ। সালাফী তথা আহলে হাদীসগণ মাযহাবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও, তারা বিশ্বাস করেন যে, মাযহাব মানা যাবে, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। কোনো একটি মাযহাবের সব ফতোয়া বা ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত মনে করা ঠিক নয়। ইজতিহাদ ও হাদীস যাচাই করার ক্ষমতা যাদের আছে, তাদের উচিত সরাসরি দলীল থেকে ফয়সালা করা।
৩. সালাফীরা তাকলীদ ও অন্ধ আনুগত্যের বিরোধিতা করেন। সালাফী তথা আহলে হাদীসদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় আপত্তি হলো তাকলীদ বা অন্ধ অনুসরণ। তারা মনে করেন যে, একজন সাধারণ মুসলিমকে কুরআন-সুন্নাহ বোঝাতে সাহায্য নিতে ইমামদের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু তাকে এমনভাবে অনুসরণ করা যাবে না যে, দলীল থাকলেও সে নিজের ইমামের মত ছাড়তে নারাজ থাকে। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ليس لأحدٍ أن يُنصّب شخصًا يدعو إلى أقواله ويوالي ويعادي عليها غير النبي ﷺ -অর্থাৎ, রাসূল ﷺ ব্যতীত আর কাউকে এমনভাবে অনুসরণ করা বৈধ নয়, যার কথায় মানুষকে আহ্বান জানানো হবে এবং বন্ধুত্ব-শত্রুতা স্থাপন করা হবে।
৪. সাধারণ মানুষের জন্য করণীয়: সাধারণ মানুষ হাদীস বিশ্লেষণ বা ইজতিহাদ করতে পারে না। তাই এক্ষেত্রে তারা ইলমী ও বিশ্বস্ত আলেমদের দ্বারস্থ হবে। আলেমদের ব্যাখ্যার পেছনে দলীল থাকলে তা গ্রহণ করবে এবং এক আলেমের ভুল ধরলে দলীলের ভিত্তিতে অন্য মত গ্রহণ করতেও দ্বিধা করবে না। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, সাধারণ মানুষের জন্য ইমামদের মত গ্রহণ করা জায়েয, তবে দলীলভিত্তিক বুঝে ও যাচাই করে, অন্ধভাবে নয়।
৫. ইকতিদা ও তাকলীদ এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইকতিদা হলো, দলীলভিত্তিক অনুসরণ (যা প্রশংসনীয়)। আর তাকলীদ হলো, অন্ধ অনুসরণ (যা ত্রুটিপূর্ণ)। সালাফীদের আহ্বান হলো ইকতিদার দিকে, তাকলীদের বিপরীতে।
সালাফী তথা আহলে হাদীসদের মতে, মাযহাবের ইমামগণ সম্মানিত। তাঁদের ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য। তবে দলীল থাকলে তা গ্রহণ করা হবে, না থাকলে তা পরিত্যাজ্য হবে। কুরআন ও সহীহ হাদীসই চূড়ান্ত মানদণ্ড। মাযহাব মানা যাবে, কিন্তু দলীলকে ছাপিয়ে নয়।সুতরাং একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, জ্ঞানীদের থেকে জ্ঞান নেওয়া, কিন্তু চূড়ান্ত দলীল হিসেবে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা। আর এটাই ছিল সাহাবীদের পথ, সালাফদের পন্থা, আর এটাই সালাফী তথা আহলে হাদীস দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা।