-আহমাদ ফারিদ
তাওবার প্রতি উৎসাহ:
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। আমরা তাঁর গুণকীর্তন করি। তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি। তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। তাঁর নিকট পানাহ চাই আমাদের আত্মিক ও কর্মের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তাআলা যাকে হিদায়াত দেন কেউ তাঁকে বিপথগামী করতে পারে না। তিনি যাকে বিপথগামী করেন কেউ তাঁকে হিদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নাই। তিনি একক। তাঁর কোন শরিক নাই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবার পরজনের প্রতি, ও সঙ্গী-সাথীদের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
পরকথা হলো, সালাফগণ বলেন, গুনাহ হলো, একপ্রকার জিঞ্জির-যা লেগে থাকে পাপীর ঘাড়ে। কেবল তাওবা-ইসতিসতিগফার ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা তা বিচ্ছিন্ন হয় না। আজ রমজানের শেষ দশকের বেজোর রাত্রীসমূহের একটি। আমরা আশা করি, আজ লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ‘হাজার মাসের চেয়ে উত্তম’ (সুরা আল-কদর আয়াত নং ০৩)।
ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ সংকলিত মুয়াত্তায় উল্লেখ রয়েছে, নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ববর্তী উম্মতদের বয়স দেখে তাঁর উম্মতের বয়স অনেক কম মনে করলেন। তিনি ভয় পেলেন, পূর্ববর্তী উম্মতেরা দীর্ঘ হায়াত পাওয়ায় সাওয়াবের যে স্তরে উপনীত হয়েছে তাঁর উম্মত সে স্তরে উপনীত হতে পারবে না। তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে লাইলাতুল কদর প্রদান করেন-যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এই মুবারক মাস তাওবা করা, কিয়ামুল লাইল পালন করা, জিকির-আজকার করা, ইবাদাত-বন্দেগি করা ও দুআ করার এক মোক্ষম সুযোগ। নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ইমানের সাথে সাওয়াবের নিয়তে লাইলাতুল কদরে কিয়ামুল লাইল পালন করবে আল্লাহ তাআলা তাঁর পূর্বের গুনাহ মাফ করে দিবেন। ভাইয়েরা আমার, এই রাত এক বিশেষ সুযোগ তাওবা করে আল্লাহ দিকে ফিরার ও গুনাহ না করার প্রতি দৃঢ়-প্রত্যয়ী হওয়ার।
হে আল্লাহর বান্দারা, প্রতিটি পাপের কথা স্মরণ করে আল্লাহর নিকট তাওবা করুন। জনৈক সালাফ বলেন, বান্দা যখন গুনাহ পরিত্যাগ করার দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হয় সর্বদিক থেকে তাঁর নিকট আল্লাহর সাহায্য আসতে থাকে। বান্দা তাওবা করে গুনাহ পরিহারের নিয়ত করলে এই সাহায্য পেয়ে থাকে । আজ এই মুবারক রাতে আমরা তাওবা করব ও তাতে অটল-অবিচল থাকার প্রত্যয় নেব। আল্লাহ তাআলা তাওবা নামক এই সদর দরজা সকলের জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন। তিনি জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বান্দাকে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইয়াহুদি খ্রিস্টানদের প্রতি তাওবার নির্দেশ:
ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদেরও তিনি এর নির্দেশ দিয়েছেন। তারা তো বলেছিলো , إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلاثَةٍ অর্থ; ‘আল্লাহ তিন জনের তৃতীয়’ (সুরা আল-মায়িদা আয়াত ৭৩) । আরো বলেছিলো, وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا অর্থ; ‘আর ইয়াহুদিরা বলে আল্লাহর হাত বাঁধা। তাঁদের হাতই বাঁধা। আর তারা যা বলে এর জন্য তারা লা’নতপ্রাপ্ত হবে’ (সুরা আল-মায়িদা আয়াত নং ৬৪) । তাদের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনার পরই তিনি বলেন, أَفَلا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ অর্থ: ‘তারা কী আল্লাহর নিকট তাওবা করবে না? তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে না’? (সুরা আল-মায়িদা আয়াত নং ৭৪) ।
মুশরিকদের প্রতি তাওবার নির্দেশ:
মুশরিকদের প্রসঙ্গে বলেন, فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ ‘যদি তারা তাওবা করে সলাত আদায় করে, যাকাত প্রদান করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও’ (সুরা আত-তাওবা আয়াত নং ০৫)। তিনি আরো বলেন, فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ‘যদি তারা তাওবা করে সালাত আদায় করে, যাকাত প্রদান করে, তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই’ (সুরা আত-তাওবা আয়াত নং ১১)।
মুনাফিকদের প্রতি তাওবার নির্দেশ:
মুনাফিকদেরও নির্দেশ দিয়েছেন তাওবার সিংহদ্বার দিয়ে প্রবেশের। তার ভাষায়, إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلَّهِ فَأُوْلَئِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا অর্থ; ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকেরা থাকবে জাহন্নামের সবচেয়ে নিম্নস্তরে। তুমি তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না। তবে যারা তাওবা করে নিজেদের শুধরে নেয়, আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে, দ্বীনে নিষ্ঠাবান হয়; তারা মুমিনদের সাথে থাকবে। আল্লাহ অচিরেই মুমিনদেরকে মহাপুরস্কার প্রদান করবেন’ (সুরা আন-নিসা আয়াত ১৪৫-১৪৬) ।
সীমালঙ্ঘনকারীদের প্রতি তাওবার নির্দেশ:
মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করেছে ও নিজের উপর অতিশয় জুলুম করে আশাহীন হয়ে পড়েছে তাদেরকে তাওবার নির্দেশ দিয়ে বলেন, قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ মাফ করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (সুরা আয-যুমার আয়াত নং ৫৩)।
সাদিকিনদের প্রতি তাওবার নির্দেশ:
আল্লাহ তাআলা সাদিকিন বা সত্যবাদী মুমিনদেরকেও তাওবার উন্মুক্ত দরজা দিয়ে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছেন, وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ‘হে মুমিনগণ তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো; যাতে তোমরা সফল হতে পারো’ (সুরা আন-নুর আয়াত নং ৩১) । এই আয়াতটি মাদানি। হিজরতের পর নাজিল নয়। নাজিল হয় ইমান, জিহাদ ও সবর সংক্রান্ত আয়াত নাজিলের পর। আল্লাহ তাআলা সাহাবিদেরকে তাওবা করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং তাদের কল্যাণ তাওবার সাথে শর্তযুক্ত করেন। অতএব কেবল তাওবাকারীরাই সাফল্যের আশা করতে পারে। ইরশাদ হচ্ছে, وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ‘হে মুমিনগণ তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তাওবা করো; যাতে তোমরা সফল হতে পারো’ (সুরা আন-নুর আয়াত নং ৩১) ।
নাবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওবা:
আল্লাহ তাআলা নাবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের, আনসারদের ও মুহাজিরদের তাওবার কথা উল্লেখ করে বলেন, لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ ‘অবশ্যই আল্লাহ নাবির, আনসারদের ও মুহাজিরদের তাওবা কবুল করলেন, যারা তাঁর অনুসরণ করেছে সংকট মুহূর্তে-তাদের একদলের অন্তর সত্যচ্যুত হওয়ার উপক্রম হওয়ার পর। এরপর আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু’ (সুরা আত-তাওবা আয়াত নং ১১৭)।
তাওবার শর্ত:
তাওবার শর্ত ৬টি। (১) ইখলাস: তাওবা একটা স্বতন্ত্র ইবাদাত। বরং সবচেয়ে প্রিয়ো ইবাদাত। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন, ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন’ (সুরা আল-বাকারা আয়াত নং ২২২)। অন্য সকল ইবাদাতে যেমন ইখলাস বা নিষ্ঠার নিয়্যাত থাকতে তদ্রূপ তাওবার ক্ষেত্রেও ইখলাস থাকতে হয়। মানুষের নিন্দা ও ভর্ৎসনার ভয়ে কিংবা সাধুবাদ ও বাহবা পাওয়ার উদ্দেশ্যে পাপ বর্জন করলে তা তাওবা হবে না। বান্দার পাপ বা মন্দাচার পরিহারটা অবশ্যই আল্লাহর ভয়ে হতে হবে।
(২) পাপ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা। পাপে রত থেকে তাওবা করা অসম্ভব।
(৩) কৃত পাপের জন্য অনুশোচনা করা। কৃত পাপের কারণে অনুতপ্ত না হওয়া মানে ওই পাপে সন্তুষ্ট থাকা।
(৪) আর কভু ওই পাপ না করার জন্য দৃঢ়-সংকল্প হওয়া।
(৫) অপরের অধিকার সংশ্লিষ্ট পাপ হলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দেয়া।
(৬) তাওবা কবুলের সময়ে তাওবা করা। মৃত্যুর গড়গড়ি শুরু হওয়া ও পশ্চিমাকাশে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাওবা কবুলের সময়। নাবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা দিনের বেলা হাত প্রসারিত করেন যেন রাতের বেলা পাপকারী তাওবা করে। রাতের বেলা হাত বাড়িয়ে দেন যেন দিনের বেলা পাপকারী তাওবা করে। পশ্চিমাকাশে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। পশ্চিমাকাশে সূর্য উদিত হওয়া কিয়ামাতের বড় আলামতসমূহের মধ্যে অন্যতম। কিয়ামাতের নিকটতম সময়ে এটা প্রকাশ পাবে। এই আলামত প্রকাশ পেলে মানুষ প্রতিযোগিতামূলকভাবে তাওবা করতে থাকবে। কিন্তু সে সময়ের তাওবা কোন কাজে আসবে না। এরপর কেউ ইমান আনলে তার ইমানও গ্রহণযোগ্য হবে না।