▪️তাওহীদকে আমরা কীভাবে বুঝব-
ইসলামের মূল ভিত্তি, সমস্ত আমলের প্রাণ এবং নবীদের দাওয়াতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো তাওহীদ। আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জ্বিনকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য। তিনি বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ -আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য। (আয-যারিয়াত: ৫৬)
কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কি সত্যিই তাওহীদকে সঠিকভাবে বুঝি? নাকি কেবল শব্দে ও ধারণায় সীমাবদ্ধ রাখি? তাওহীদ বোঝা মানেই কেবল ‘আল্লাহ এক’ বলা নয়; বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ আকীদা, চিন্তা ও জীবনব্যবস্থা।
১. তাওহীদের প্রকৃত অর্থ-
তাওহীদ শব্দটি এসেছে وَحَّدَ – يوحد ধাতু থেকে। যার অর্থ একত্ব, একক বলে স্বীকার করা। শারঈ পরিভাষায় তাওহীদ বলতে বোঝায়, মহান আল্লাহকে তাঁর রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও আসমা-সিফাতে একক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাওহীদ হলো মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা, যা কেবল তাঁরই প্রাপ্য।
২. তাওহীদের তিনটি স্তম্ভ-
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ সালাফদের অনুসরণে তাওহীদকে তিন ভাগে ব্যাখ্যা করেছেন। এটি কোনো নতুন বিভাজন নয়; বরং কুরআন-সুন্নাহকে সহজে বোঝার একটি পদ্ধতি। যথা:
(ক) তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ: মহান আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, জীবন-মৃত্যুর মালিক, বিশ্ব পরিচালনাকারী এ বিশ্বাস। সমস্যা হলো মুশরিকরাও এই তাওহীদ অনেকাংশে স্বীকার করত, তবু তারা মুশরিক ছিল। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ -যদি তুমি তাদের জিজ্ঞেস কর—কে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। (সূরা লুকমান: ২৫)। অতএব শুধু রুবূবিয়্যাহ মানলেই মানুষ মুমিন হয় না।
(খ) তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ: এটাই তাওহীদের মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর অর্থ সব ইবাদত কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করা। দুআ, সালাত, সিজদা, কুরবানি, মানত, ভরসা, ভয়, আশা সবই হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। এই তাওহীদেই মূলত অধিকাংশ মানুষ ব্যর্থ হয়েছে। ইমাম ইবনুল ক্বয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নবীদের দাওয়াতের আসল কেন্দ্র ছিল উলূহিয়্যাহর তাওহীদ।
(গ) তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত: আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে সঠিক বিশ্বাস রাখা। কোনো ধরনের বিকৃতি (تحريف) ছাড়া, অস্বীকার (تعطيل) ছাড়া, তুলনা (تمثيل) ছাড়া, কেমন তা জিজ্ঞাসা না করে (تكييف); যেভাবে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে এসেছে, সেভাবেই মানা। আর এটাই সালাফদের পথ।
৩. তাওহীদ বোঝার ক্ষেত্রে সাধারণ ভুল-
ক. তাওহীদকে শুধু দার্শনিক তত্ত্ব মনে করা।
খ. তাওহীদ মানে শুধু আল্লাহ একজন-এটুকু ভাবা।
গ. ইবাদতের নামে শিরকি কাজকে হালকা করে দেখা।
ঘ. তাওহীদ ও বাস্তব জীবনের মাঝে সম্পর্ক না রাখা।
শাইখ মুহাম্মদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, অনেকেই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, কিন্তু এর দাবি ও শর্ত জানে না।
৪. তাওহীদের বাস্তব প্রভাব-
যে ব্যক্তি তাওহীদকে সঠিকভাবে বুঝে সে মহান আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না, সে ইবাদতে খাঁটি হয়, সে বিদআত ও শিরক থেকে সতর্ক থাকে, তার চরিত্রে দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদা আসে এবং সে আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে। তাওহীদ কেবল মসজিদের বিষয় নয় বরং এটি চিন্তা, রাজনীতি, সমাজ, নৈতিকতা ও ব্যক্তিজীবনের দিশারি।
সুতরাং كيف نفهم التوحيد এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বইয়ে নয়, বরং জীবনে খুঁজতে হয়। তাওহীদ মানে আল্লাহকে জানা, মানা ও মানিয়ে চলা। এটি কেবল আক্বীদা নয় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওহীদকে সঠিকভাবে বুঝে, খাঁটি মনে ধারণ করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দিন। آمين
– আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।