যদি প্রত্যেক জালিম তার শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যেত, অথবা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার পরিণতি দেখে ফেলত, তাহলে ঈমানের কোনো প্রকৃত অর্থ বা মূল্য থাকত না। এই জীবনও আর পরীক্ষা থাকত না। তখন কেউই জুলুম করার সাহস করত না, আল্লাহর আদেশ অমান্য করার দুঃসাহসও দেখাত না।
আল্লাহর বিধান হলো, এই দুনিয়ার জীবন হবে পরীক্ষা ও যাচাইয়ের জায়গা। তাই অনেক সময় জালিমকে কিছুদিন ভোগ করতে দেওয়া হয়, এমনকি সে নিজেই নিজের জুলুমের পরিণতি ভুলে যায় এবং যে অবস্থায় আছে, তা নিয়ে ধোঁকায় পড়ে যায়। তার এই বাহ্যিক সাফল্য তার অনুসারীদের জন্যও ফিতনা হয়ে দাঁড়ায়, আর যারা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে, তারাও এতে বিভ্রান্ত হয়।
অন্যদিকে, যদি প্রত্যেক মুমিন ঈমানের ফলাফল হিসেবে দুনিয়াতেই সঙ্গে সঙ্গে সম্মান, বিজয় ও ক্ষমতা পেয়ে যেত, তাহলে মানুষ সবাই মুমিন হয়ে যেত। কিন্তু তখন তাদের ঈমান আল্লাহর জন্য হতো না; বরং তা হতো দুনিয়াবি ফলাফল, বস্তুগত লাভ এবং মুমিনদের প্রাপ্ত সুবিধার প্রতি ঈমান।
এই দুনিয়ার পরীক্ষার মূল রহস্য এখানেই। কখনো সত্যকে কঠিন, ভারী ও অনেক দায়িত্বপূর্ণ মনে হয়; আর বাতিলকে মনে হয় শক্তিশালী, দাপুটে, ক্ষমতাবান এবং জীবনের লাগাম তার হাতেই।
এই অবস্থাতেই স্পষ্ট হয়, কে সত্যিই আল্লাহ, তাঁর কালাম এবং আখিরাতের ওপর ঈমান এনেছে, আর কে কেবল বাহ্যিক শক্তি, প্রভাব ও বিজয়ের মোহে পড়ে গেছে।
দুনিয়ার পরীক্ষায় ধৈর্য ধরতে হলে আখিরাতকে সামনে রাখতে হয়। একইভাবে মানুষ জুলুম, অহংকার ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে পারে তখনই, যখন সে আখিরাতকে স্মরণে রাখে।
তবুও আল্লাহ রহমান, রহীম, হাকীম ও হালীম। তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তাই এই পরীক্ষার মূল নিয়ম বজায় রেখেও তিনি দুনিয়ায় তাঁর বান্দাদেরকে কিছু দৃশ্য দেখিয়ে দেন। কখনো তিনি জালিমদের পরিণতি দেখান, অহংকারীদের পতন দেখান, মাজলুমদের বিজয় দেখান, আর অবস্থার পালাবদল ও তাকদীরের উল্টে যাওয়া দেখান।
কারণ যদি সব সময় একই অবস্থা চলতে থাকত, তাহলে মানুষ সবাই কুফরের দিকে ঝুঁকে পড়ত। মানুষ তো মানুষই; দীর্ঘ সময় ধরে একটানা পরীক্ষা সহ্য করার ক্ষমতা তার সীমিত। এ কারণেই আল্লাহ تعالى বলেন:
﴿وَلَوْلَا أَنْ يَكُونَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً لَجَعَلْنَا لِمَنْ يَكْفُرُ بِالرَّحْمَٰنِ لِبُيُوتِهِمْ سُقُفًا مِنْ فِضَّةٍ وَمَعَارِجَ عَلَيْهَا يَظْهَرُونَ وَلِبُيُوتِهِمْ أَبْوَابًا وَسُرُرًا عَلَيْهَا يَتَّكِئُونَ وَزُخْرُفًا وَإِنْ كُلُّ ذَٰلِكَ لَمَّا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا﴾
– আর যদি সব মানুষ এক জাতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তাহলে যারা রহমানকে অস্বীকার করে, তাদের ঘরের ছাদ আমি রূপার করে দিতাম, আর এমন সিঁড়ি দিতাম, যার ওপর তারা আরোহণ করত। তাদের ঘরের জন্য দরজা দিতাম এবং এমন আসন দিতাম, যার ওপর তারা হেলান দিয়ে বসত। আর দিতাম নানা অলংকার। অথচ এসবই তো কেবল দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী।
[সূরা আয-যুখরুফ: ৩৩-৩৫]।
অর্থাৎ যারা কুফর করে, তারা শেষ পর্যন্ত দুনিয়ার জীবন ছাড়া আর কিছু পাবে না। আল্লাহ চাইলে প্রত্যেক কাফিরকে এমন বিলাস, ঐশ্বর্য ও আরামে রাখতে পারতেন যে তার ঘরের ছাদ রূপার হতো, তার উঁচু বারান্দা থাকত, প্রশস্ত ঘর থাকত, বহু দরজা থাকত, বিছানা, বালিশ, আসন, অলংকার ও সাজসজ্জায় ভরে থাকত। কিন্তু আল্লাহ তা করেন না। কারণ যদি তিনি তা করতেন, তাহলে মানুষ সবাই ফিতনায় পড়ে যেত এবং বহু মানুষ কুফরের দিকে ঝুঁকে পড়ত, কাফিরদের ভোগ-বিলাস দেখে।
আল্লাহর আরেকটি রহমত হলো, তিনি বান্দাদের দেখান এবং জানিয়ে দেন যে দুনিয়ার এই ভোগ, যার মধ্যে জালিম ও তাদের অনুসারীরা ডুবে থাকে, তা কেবল বাহ্যিক সুখ। এর ভেতরে আছে দীর্ঘ যন্ত্রণা ও অস্থিরতা। আল্লাহ تعالى বলেন:
﴿وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا﴾
– আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবন। ।[সূরা ত্বহা: ১২৪]
আল্লাহ تعالى আরও বলেন:
﴿فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا﴾
– তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাকে বিস্মিত না করে। আল্লাহ তো এগুলোর মাধ্যমেই দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে শাস্তি দিতে চান। [সূরা আত-তাওবাহ: ৫৫]।
আপনি কি দেখেন না, প্রাসাদের বাসিন্দারাও কত ভয় ও আতঙ্কে ঘেরা থাকে? এমনকি তারা প্রত্যেক শব্দকেই নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে। তারা ভোগের মধ্যে থেকেও তৃপ্তি পায় না, নেয়ামতের মধ্যে থেকেও শান্তি পায় না।
আর আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য তাদের সুখ, প্রশান্তি ও আরাম তাদের বুকের ভেতরে রেখে দিয়েছেন। কত মানুষকে আপনি দেখবেন, সে যেন পরীক্ষায় সম্পূর্ণ ডুবে আছে, কিন্তু আল্লাহ তাকে সেই অবস্থাতেই ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও হৃদয়ের প্রশান্তি দিয়েছেন।
সত্যই বলা হয়েছে- সম্পদ বালিশ কিনতে পারে, কিন্তু ঘুম কিনতে পারে না। প্রাসাদ কিনতে পারে, কিন্তু আরাম কিনতে পারে না। খাবার কিনতে পারে, কিন্তু স্বাদ ও তৃপ্তি কিনতে পারে না।
ফিরআউনের হাতে ছিল ক্ষমতা, প্রভাব, সাম্রাজ্য, বাহিনী ও রাজদণ্ড। তবু এগুলো তাকে ভয় থেকে রক্ষা করতে পারেনি। সে এমন আতঙ্কে ছিল যে প্রতিটি নবজাতক ছেলেশিশুকে হত্যা করত, কারণ সে ভয় করত, তার জীবনের শেষ ওই শিশুর হাতেই লেখা আছে।
বিরাট বাহিনীও কোনো অত্যাচারীকে রক্ষা করতে পারেনি। কেউ সাগরে ডুবে গেছে, কেউ উৎসবের মাঝেই নিহত হয়েছে, আর কত বাহিনী নিজ শাসকের বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে প্রাসাদ থেকে কারাগারে নামিয়ে এনেছে।
সারকথা হলো, পরীক্ষার বাস্তবতা এই যে, দুনিয়াকে অনেক সময় অন্যায়ভরা মনে হবে। সত্যকে মনে হবে পরাজিত, আর বাতিলকে মনে হবে প্রতিষ্ঠিত ও ক্ষমতাবান। এই অবস্থাতেই ঈমান যাচাই হয়, অন্তর ছাঁকা হয়, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী পৃথক হয়। আর এর ওপরই আখিরাতের প্রতিদান নির্ভর করে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে জালেম হওয়া থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন!
– আল-ইলম একাডেমী রাজশাহী।