হাতেম আল-আসম্ম এর সাথে স্বীয় উস্তায শাকীক আল-বালখী’এর অনুপ্রেরণা মূলক আলাপ-
একদিন এক উস্তায তার ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন,
তুমি কতদিন হলো আমার সঙ্গ পেয়ে আসছো?
ছাত্র বিনয়ের সাথে জবাব দিল, তেত্রিশ বছর, উস্তায।
তখন উস্তায কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন,
তাহলে এত দীর্ঘ সময়ে তুমি আমার থেকে কী শিখলে?
ছাত্র মাথা নিচু করে বলল, উস্তায, সত্য বলতে আমি মাত্র আটটি বিষয়ই শিখেছি। এর বেশি শেখার দাবি আমি করতে চাই না।
উস্তায অবাক হয়ে বললেন,
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। আমার পুরো জীবন তো গেল তোমাকে শেখাতে!
তবে বলো, সেই আটটি বিষয় কী?
এক. আমি দেখলাম যে, প্রত্যেক মানুষ কোনো না কোনো প্রিয় জিনিসকে ভালোবাসে; কিন্তু মৃত্যুর পর কবর পর্যন্ত তার কিছুই যায় না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার প্রিয় জিনিস হবে আমার সৎকর্ম, যেন কবরেও তা আমার সঙ্গী হয়।
দুই. আল্লাহর বাণী পড়লাম:
﴿وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ﴾
এরপর আমি নফসের খেয়াল-খুশিকে দমন করতে পরিশ্রম শুরু করলাম, যতক্ষণ না তা মহান আল্লাহর আনুগত্যে স্থির হয়।
তিন. মানুষকে দেখলাম যা মূল্যবান পায়, তা জমিয়ে রাখে। আমি আল্লাহর বাক্য স্মরণ করলাম:
﴿مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَمَا عِندَ ٱللَّهِ بَاقٍ﴾
তখন থেকেই মূল্যবান যা পাই, তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে শুরু করি, যাতে তিনি তা আমার জন্য সংরক্ষণ করেন।
চার. মানুষকে দেখলাম যে, কেউ ধন নিয়ে গর্ব করে, কেউ বংশ নিয়ে, কেউ আবার পদমর্যাদা নিয়ে।
আমি পড়লাম:
﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ ٱللَّهِ أَتْقكُمْ﴾
তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার গর্ব হবে তাকওয়া, মানুষ নয়; আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে।
পাঁচ. মানুষকে দেখলাম পরস্পরকে দোষারোপ করে, গালি দেয়, শত্রুতা করে। আর এ সবকিছুর মূল হলো হিংসা। আমি আল্লাহর বাণী স্মরণ করলাম:
﴿نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُمْ مَّعِيشَتَهُمْ﴾
তখন আমি বুঝলাম, রিযিক আল্লাহই বণ্টন করেন।
ফলে আমি হিংসা ত্যাগ করলাম এবং মনের প্রশান্তি অর্জন করলাম।
ছয়. মানুষকে দেখলাম একজন আরেকজনের শত্রু হয়ে আছে। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন:
﴿إِنَّ ٱلشَّيْطَـٰنَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَٱتَّخِذُوهُ عَدُوًّا﴾
আমি বুঝলাম, সত্যিকার শত্রু মানুষ নয়, শয়তান।
সুতরাং মানুষের সাথে শত্রুতা ছেড়ে দিয়ে আমি শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রহে মন দিলাম।
সাত. দেখলাম যে, মানুষ রিযিকের জন্য অপমানিত হয়, হারাম-হালাল ভুলে যায়। আল্লাহর কথা স্মরণ হলো:
﴿وَمَا مِن دَابَّةٍ فِى ٱلْأَرْضِ إِلَّا عَلَى ٱللَّهِ رِزْقُهَا﴾
তখন বুঝলাম, আমিও তাঁর সৃষ্টি। রিযিক তিনি দেবেনই। সুতরাং আমি রিযিক নিয়ে উৎকণ্ঠা ছেড়ে দিয়ে মহান আল্লাহর হক্ব আদায়ের দিকে মন দিলাম।
আট. মানুষকে দেখলাম যে, সবাই কারো না কারো ওপর নির্ভরশীল; কেউ সম্পদে, কেউ কর্তৃত্বে, কেউ স্বাস্থ্যে। আমি পড়লাম:
﴿وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ﴾
তখন থেকে আমি মাখলুকের ওপর ভরসা করা ছেড়ে দিয়ে শুধুই মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শুরু করলাম।
এতক্ষণ উস্তায তার ছাত্রের কথা শুনে আবেগে বললেন, বারাকাল্লাহু ফিক তথা আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন। তুমি অল্প শিখেছো, কিন্তু বড় কিছু শিখেছো!