হে আমার নফস! কুরআন মুখস্থ করতে গিয়ে ভুলে গেলে হতাশ হয়ো না
একদিন আমি নিজেকেই প্রশ্ন করলাম—হে আমার নফস! কুরআন মুখস্থ করার পর এত দ্রুত ভুলে যাই কেন?
আমার নফস যেন উত্তর দিল—কারণ তুমি তাড়াহুড়ো করে মুখস্থ করতে চাও, কিন্তু যথেষ্ট পুনরাবৃত্তি করো না। নতুন অংশ মুখস্থ করার আগ্রহ থাকে, অথচ পুরোনো অংশ নিয়মিত মুরাজাআহ (مراجعة) করো না। মনে রেখো, কুরআন শুধু মুখস্থ করলেই স্থায়ী হয় না; বরং নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ও আমলের মাধ্যমেই হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমি বললাম—তবু তো অনেক কষ্ট হয়। কখনো মনে হয়, এত পরিশ্রম করেও সব যেন বৃথা হয়ে যাচ্ছে।
নফস বলল—না, কখনোই নয়। আল্লাহর জন্য করা কোনো পরিশ্রমই বৃথা যায় না। কুরআনের প্রতিটি অক্ষর তিলাওয়াতের বিনিময়ে রয়েছে সওয়াব। মুখস্থ করার প্রতিটি চেষ্টা ইবাদত, প্রতিটি পুনরাবৃত্তি আল্লাহর পথে মুজাহাদা, আর ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু করার ধৈর্যও তোমার জন্য নেকির কারণ। আল্লাহ তাআলা কোনো আমলকারীর আমল বিনষ্ট করেন না।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম—তাহলে মুখস্থ কীভাবে আরও দৃঢ় হবে?
নফস বলল—প্রতিদিন অল্প হলেও নিয়মিত পড়ো। একদিনে অনেক মুখস্থ করে কয়েক দিন বিরতি দেওয়ার চেয়ে প্রতিদিন সামান্য পরিমাণে স্থায়ীভাবে পড়া অনেক বেশি উপকারী। নতুন মুখস্থের চেয়ে পুরোনো অংশের মুরাজাআহকে বেশি গুরুত্ব দাও। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরআন নিয়মিত পুনরাবৃত্তি করার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন; কেননা মুরাজাআহ ছাড়া কুরআন দ্রুত স্মৃতি থেকে সরে যেতে পারে।
আমি বললাম—আমার ভয় হয়, অন্যরা আমার আগে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
নফস উত্তর দিল—মুখস্থের প্রকৃত সফলতা আগে শেষ করার মধ্যে নয়; বরং শেষ পর্যন্ত তা সংরক্ষণ করার মধ্যে। কত মানুষ দ্রুত মুখস্থ করেছে, কিন্তু ধরে রাখতে পারেনি। আবার কত মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়েছে, কিন্তু সারাজীবন কুরআনের সঙ্গী হয়ে থেকেছে। আল্লাহর কাছে মূল্যবান হলো ইখলাস (الإخلاص), ধারাবাহিকতা এবং দৃঢ়তা; মানুষের প্রশংসা বা প্রতিযোগিতা নয়।
শেষে আমি বললাম—তোমার শেষ উপদেশ কী?
নফস বলল—তোমার নিয়তকে সবসময় আল্লাহর জন্য খাঁটি রাখো। মানুষের প্রশংসা, উপাধি বা খ্যাতির জন্য নয়; কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরআন মুখস্থ করো। ধৈর্য ধরো, পুনরাবৃত্তিকে ভালোবাসো এবং কখনো হতাশ হয়ো না। কুরআন মহান ও ভারী এক আমানত; আল্লাহ যাদের অন্তরকে সত্যবাদিতা, তাকওয়া ও আন্তরিকতা দিয়ে প্রস্তুত করেন, তারাই এ আমানত বহন করার তাওফিক লাভ করে।
হে আমার নফস! যদি কখনো ভুলে যাও, তবে নিরাশ হয়ো না। ভুলে যাওয়া পথের সমাপ্তি নয়; বরং আরও বেশি মুরাজাআহর আহ্বান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তুমি যেন কুরআনের পথ ছেড়ে না দাও। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সত্যবাদী হয়, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন, তার অন্তরকে দৃঢ় রাখেন এবং ধীরে ধীরে তাঁর কিতাবের আলো দিয়ে তাকে সম্মানিত করেন।