সাহিত্য (الأدب) কেবল ভাষা নয়, মানুষ গড়ার বিদ্যা-
অনেকেই মনে করেন, আদব (الأدب) বা সাহিত্য পড়ার উদ্দেশ্য শুধু ভাষা সুন্দর করা, বিশুদ্ধভাবে কথা বলা কিংবা অলংকারপূর্ণ বাক্য রচনা শেখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আদবের প্রকৃত উদ্দেশ্য এর চেয়ে অনেক গভীর ও ব্যাপক। আদব শুধু ভাষা ও জিহ্বাকে শুদ্ধ করে না; এটি মানুষের চিন্তাকে পরিশীলিত করে, চরিত্রকে পরিণত করে, আত্মাকে মার্জিত করে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা বৃদ্ধি করে।
এ কারণেই প্রাচীন মুসলিম মনীষীরা আদবকে কেবল সাহিত্যিক রচনা হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁরা এটিকে মানুষ গড়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ইবনুল মুকাফ্ফা (رحمه الله)। তিনি তাঁর দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম রেখেছেন—الأدب الصغير (আল-আদাবুস সাগীর) এবং الأدب الكبير (আল-আদাবুল কাবীর)।
প্রথম গ্রন্থে তিনি মানুষের আত্মশুদ্ধি, চরিত্র গঠন, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত উন্নতির আলোচনা করেছেন। আর দ্বিতীয় গ্রন্থে তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক আচরণ, নেতৃত্ব, শিষ্টাচার এবং সুন্দর ব্যবহারের নীতিমালা তুলে ধরেছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুটি গ্রন্থে প্রচলিত অর্থে কবিতা বা সাহিত্যিক অলংকারের আধিক্য নেই। তবুও তিনি এগুলোর নাম রেখেছেন “আদব”। কারণ তাঁর দৃষ্টিতে আদব মানে শুধু সাহিত্যচর্চা নয়; বরং মানুষকে উত্তম চরিত্র ও পরিশীলিত চিন্তার অধিকারী করে তোলা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইবনুল মুকাফ্ফা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ কালীলা ও দিমনা (كليلة ودمنة)-এর তুলনায় আল-আদাবুল কাবীর ও আল-আদাবুস সাগীর-এ অধিক গভীরতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ কালীলা ও দিমনা-তে তিনি পূর্ববর্তী জাতির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হয়েছেন, কিন্তু আদাবুল কাবীর ও আদাবুস সাগীর-এ তিনি নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে সরাসরি তুলে ধরেছেন।
এ থেকে বোঝা যায়, ভাষা ও জ্ঞান যত বিস্তৃত হয়, মানুষের চিন্তার জগতও তত সমৃদ্ধ হয়। নতুন শব্দ শেখা শুধু শব্দভাণ্ডার বাড়ায় না; বরং নতুন ধারণা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন চিন্তার দ্বারও উন্মুক্ত করে।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক আল-জাহিয (رحمه الله) এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি প্রাচীন সাহিত্য পড়ে শুধু ভাষা শুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে, সে সাহিত্য পাঠের মূল উদ্দেশ্যই অনুধাবন করতে পারেনি। কারণ সাহিত্য পাঠের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলো অর্থ, ভাব ও প্রজ্ঞা অর্জন করা। শব্দের প্রকৃত অর্থ ও প্রয়োগ না জানলে মানুষ সঠিক শব্দও ভুল জায়গায় ব্যবহার করতে পারে। তাই ভাষার সৌন্দর্যের পাশাপাশি অর্থের গভীরতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতপক্ষে আদবের গ্রন্থগুলো মানবজাতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। সেখানে শুধু গল্প বা কবিতা নয়; বরং রয়েছে বিভিন্ন জাতির ইতিহাস, জ্ঞানীদের অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি, মানব-সম্পর্কের শিক্ষা, নৈতিক উপদেশ, মনোবিজ্ঞান, প্রজ্ঞা, জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং চরিত্র গঠনের অমূল্য দিকনির্দেশনা।
তাই কেউ যদি আদবের বইকে শুধু গল্প, কবিতা বা ঐতিহাসিক ঘটনার সংকলন মনে করে, তবে সে এই বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে।
আরেকটি বাস্তব বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্লাসিক্যাল আদবের গ্রন্থে একই ধরনের বহু ঘটনা, কবিতা, প্রবাদ ও ঐতিহাসিক বর্ণনা পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তাই এই বিষয়ে অগণিত বই পড়ার চেয়ে একটি বা দুটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ বারবার পড়া, চিন্তা করা, নোট নেওয়া এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা অনেক বেশি উপকারী।
একটি উৎকৃষ্ট বই যদি বারবার পড়া হয়, তবে প্রতিবারই নতুন শিক্ষা, নতুন উপলব্ধি এবং নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে যায়। পক্ষান্তরে, অসংখ্য বই দ্রুত পড়ে শেষ করলে জ্ঞান গভীর হয় না।
এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় গবেষকের একটি মূল্যবান গ্রন্থের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দশটি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর গ্রন্থের নাম—
«سحر الألفاظ في شعر الألحاظ»
এটি আরবি ভাষায় বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলোর উৎস, বিকাশ ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ, যা ভাষাপ্রেমী ও সাহিত্যপাঠকদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
সারকথা, আদব কেবল ভাষা শেখায় না; মানুষ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এটি চিন্তাকে শাণিত করে, রুচিকে পরিশীলিত করে, চরিত্রকে উন্নত করে এবং মানুষকে প্রজ্ঞাবান করে তোলে। তাই যে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়, তার জন্য কুরআন-সুন্নাহ অধ্যয়নের পাশাপাশি উৎকৃষ্ট আদবের গ্রন্থ পাঠও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ! সাহিত্য পড়ুন, আদব শিখুন, আদর্শ শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে গড়ুন। বারাকাল্লাহু ফিকুম!
– আরবী থেকে অনূদিত: আব্দুল হাকীম মাদানী।