ইলম অন্বেষণে ঘুমের গুরুত্ব: বিশ্রাম নয়, বরং ইবাদত ও ইলমের সহায়ক
অনেক আলেম ও ইলমের ছাত্র নিজের ঘুমের সময় নিয়ে একধরনের সংকোচ বোধ করেন। তারা প্রায়ই মনে করেন, যত কম ঘুমানো যাবে, তত বেশি ইলম অর্জন করা যাবে। অনেকেই নিজের প্রয়োজনীয় ঘুমকেও অলসতা মনে করে নিজেকে দোষারোপ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ঘুম কোনো অপচয় নয়; বরং এটি ইলম অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ইসলাম মধ্যপন্থার শিক্ষা দেয়। তাই যেমন অতিরিক্ত ঘুম ক্ষতিকর, তেমনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘুম কমিয়ে শরীর ও মস্তিষ্ককে দুর্বল করে ফেলা ইসলামের কাম্য নয়। একজন তালিবুল ইলমের জন্য ঘুম বিলাসিতা নয়; বরং এটি শরীর, মস্তিষ্ক ও স্মৃতিশক্তির পুনর্গঠনের একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে, ঘুমের সময় মানুষের মস্তিষ্ক সারাদিনে অর্জিত তথ্যগুলো দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে। এ কারণেই মুখস্থ করা বিষয় ঘুমের পর আরও দৃঢ়ভাবে মনে থাকে। সম্ভবত এ কারণেই পূর্ববর্তী আলেমগণ ফজরের পর কিংবা ঘুমের পূর্ববর্তী সময়কে মুখস্থ করার জন্য সর্বোত্তম সময় হিসেবে গুরুত্ব দিতেন। কারণ তখন মন সবচেয়ে স্বচ্ছ থাকে, আর ঘুম সেই তথ্যকে স্মৃতিতে স্থায়ী করতে সাহায্য করে।
অপরদিকে অতিরিক্ত রাত জাগা শরীরের জন্য বহু ক্ষতির কারণ হয়। এটি শারীরিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে, মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়, অতিরিক্ত ক্ষুধা ও স্থূলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও মস্তিষ্কজনিত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ায়।
দুঃখজনকভাবে, অনেক মানুষের ধারণা একজন প্রকৃত আলেম বা ইবাদতকারীকে দিনে মাত্র তিন বা চার ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। অথচ ইসলামের প্রাচীন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে এমন কোনো সাধারণ নির্দেশনা পাওয়া যায় না। বরং আলেমগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, শরীর সুস্থ রাখতে যতটুকু ঘুম প্রয়োজন, ততটুকু ঘুমানোই সুন্নাহসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি।
ইমাম আবু হামিদ (রহ.) বলেন, দিন-রাত মিলিয়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় আট ঘণ্টা ঘুমই মধ্যপন্থা। ঘুম আত্মার খাদ্য, যেমন খাদ্য দেহের খাদ্য। তাই এটিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনের চেয়ে কম ঘুম শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
ইমাম বদরূদ্দীন ইবনু জামাআহ (রহ.) বলেন, শরীর ও মেধার ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত ঘুম কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে সাধারণভাবে দিন-রাত মিলিয়ে আট ঘণ্টার বেশি ঘুমানো উচিত নয়। আর কারও যদি এর চেয়ে কম ঘুমেই শরীর ঠিক থাকে, তাহলে সে ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইমাম ইবনুল কইয়্যিম (রহ.) বলেন, সবচেয়ে উপকারী ও ভারসাম্যপূর্ণ ঘুম হলো রাতের প্রথমাংশ এবং শেষ ষষ্ঠাংশ মিলিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা। চিকিৎসকদের কাছেও এটিই সর্বোত্তম। এর বেশি বা কম হলে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্যে প্রভাব পড়ে।
বাস্তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই চার বা পাঁচ ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট হতে পারে, তবে এটি অত্যন্ত বিরল এবং সবার জন্য অনুসরণযোগ্য নয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইতিহাসে যেসব আলেমের অত্যন্ত কম ঘুমানোর কথা বর্ণিত হয়েছে, তাঁদের অনেকে তুলনামূলক কম বয়সে ইন্তিকাল করেছেন। এর সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় জানা না গেলেও অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনার কথা সমকালীন চিকিৎসাবিজ্ঞান উল্লেখ করে। কিছু সমকালীন আলেমও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেক তালিবুল ইলম প্রয়োজনীয় ঘুমানোর পরও নিজেকে অপরাধী মনে করেন। তিনি ভাবেন, আমি এত ঘুমালাম, নিশ্চয়ই আমি অলস। অথচ এই অযৌক্তিক অপরাধবোধই অনেক সময় তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং ইলম অর্জনের উদ্যম কমিয়ে দেয়।
মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনের সময় সীমিত। আপনি যদি প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কমও ঘুমান, তবুও পৃথিবীর সব বই পড়ে শেষ করতে পারবেন না, সব ইলম অর্জন করতে পারবেন না। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা তার জীবনের চেয়েও দীর্ঘ। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত সময়কে বরকতময় করা, কেবল সময় বাড়ানো নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন ছিল সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর জীবনে ইবাদত, দাওয়াহ, জিহাদ, পরিবার, সমাজ সবকিছুর মধ্যেও তিনি বিশ্রামের অধিকারকে অস্বীকার করেননি। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি ঘুমাতেন, আবার তাহাজ্জুদের জন্য জাগতেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় অতিরঞ্জন নয়, বরং ভারসাম্যই সফলতার পথ।
সুতরাং একজন মুসলিম, বিশেষ করে একজন তালিবুল ইলমের উচিত নিজের ঘুমকে সুশৃঙ্খল করা। এত কম ঘুমানো উচিত নয়, যাতে শরীর ও মেধা ক্ষতিগ্রস্ত হয়; আবার এত বেশি ঘুমানোও উচিত নয়, যাতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। বরং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিয়ে সতেজ মন ও সুস্থ শরীর নিয়ে ইলম, ইবাদত ও আমলের পথে অগ্রসর হওয়াই হলো প্রজ্ঞার পরিচয়।
সবশেষে মনে রাখা উচিত যেমন জেগে থাকার সময় সওয়াবের নিয়ত করা যায়, তেমনি ঘুমের ক্ষেত্রেও করা যায়। যদি একজন মুসলিম এই নিয়তে ঘুমায় যে, বিশ্রাম নিয়ে সে আরও ভালোভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, ইলম অর্জন করবে এবং মানুষের উপকার করবে, তাহলে তার ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়। তাই নিজের ঘুমকে অবহেলা করবেন না; বরং নিয়তকে শুদ্ধ করুন, ঘুমকে সুসংগঠিত করুন এবং বিশ্রামকে ইলম ও আমলের শক্তিতে রূপান্তরিত করুন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন!
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।