ভ্রাতৃত্ব ও সঙ্গ-সাথীর আদব: সালাফদের বাণী
সম্মানিত সালাফে সালিহীন (রাহিমাহুমুল্লাহ) ভ্রাতৃত্ব ও উত্তম সঙ্গের আদব সম্পর্কে বহু মূল্যবান বাণী রেখে গেছেন। আল্লাহর রহমতে সেগুলোর কিছু এখানে সংকলিত হলো। আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন এগুলো দ্বারা সকলকে উপকৃত করেন।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মদ ﷺ, তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবীর উপর।
এরপর মহান আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব এবং নেক সঙ্গ এটি এক মহান নিয়ামত। এ নিয়ামতকে সংরক্ষণ করা এবং স্থায়ী করার জন্য বিশেষ যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হয় ভ্রাতৃত্ব ও সঙ্গের আদব মেনে চলার মাধ্যমে। এসব আদব সহজ হলেও আল্লাহর তাওফীক ও সাহায্যের পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তরিক ইচ্ছা এবং কিছু সময়ের জন্য আত্মসংযম ও সাধনা, যতক্ষণ না তা অভ্যাসে পরিণত হয়।
সালাফদের বাণীসমূহ-
১. সম্পর্কের সৌন্দর্য ও আচরণ-
উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তোমার ভাইয়ের সাথে ভালোবাসা দৃঢ় করার উপায় হলো তাকে দেখলে আগে সালাম দেওয়া, তার প্রিয় নামে ডাকা এবং তাকে বসার জায়গা করে দেওয়া।
আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, সোহবত বা সঙ্গের শর্ত হলো ভুল ক্ষমা করা, সহনশীলতা দেখানো এবং কষ্টে পাশে থাকা। সুন্দর সাক্ষাৎ করা বুদ্ধিমত্তার অংশ। মুমিনের সাথে অন্তর দিয়ে মিশো, আর ফাসিকের সাথে আচরণে ভালো ব্যবহার করো। প্রকৃত বন্ধু সেই, যে অনুপস্থিতিতেও বন্ধুকে রক্ষা করে এবং মৃত্যুর পরও তার হক আদায় করে। বন্ধুকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দাও, কিন্তু সব গোপন কথা বলে দিও না।
২. সম্পর্ক রক্ষার সতর্কতা-
মু‘আয (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, যদি তোমার আল্লাহর জন্য কোনো ভাই থাকে, তার সাথে তর্ক করো না এবং কারো কথা শুনে তার বিরুদ্ধে মনোভাব পোষণ করো না।
আকতাম ইবনু সাইফী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, অতিরিক্ত কঠোরতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়, আর নমনীয়তা মানুষকে কাছে আনে; অনেক আনন্দ নিহিত রয়েছে উপেক্ষা করার মধ্যে।
মূসা ইবনু জা‘ফর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, বন্ধুর ব্যাপারে সতর্ক থাকো, কারণ মানুষের অন্তর পরিবর্তনশীল।
৩. চরিত্র ও অন্তরের পরিশুদ্ধতা-
সালাফদের একটি মূলনীতি হলো, মুমিন তার ভাইয়ের জন্য অজুহাত খোঁজে, আর মুনাফিক তার দোষ খোঁজে।
হাসান বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মুমিন তার ভাইয়ের আয়না।
ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তুমি যদি তোমার সঙ্গীর দোষ বলতে চাও, আগে নিজের দোষ স্মরণ করো।
আবু দারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ভাইকে সংশোধন করা তার হারানোর চেয়ে সহজ।
৪. উত্তম আচরণের কিছু মূলনীতি-
ভাইয়ের দোষকে ক্ষমা করা এবং তা নিয়ে তাকে লজ্জা না দেওয়া।
তার উপর আল্লাহর নেয়ামত দেখে হিংসা না করা, বরং খুশি হওয়া।
অন্তর পরিষ্কার রাখা এবং আন্তরিকভাবে উপদেশ দেওয়া।
ভাইয়ের কথা ভালো অর্থে গ্রহণ করা।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করা, এটি মুনাফিকির লক্ষণ।
সম্পর্কের সময়কার গোপন বিষয় প্রকাশ না করা।
অহংকার পরিহার করে বিনয়ী হওয়া।
ভালো আচরণ ও শালীনতা বজায় রাখা।
৫. ইমাম গাযালী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দৃষ্টিতে ভ্রাতৃত্বের অধিকার-
ইমাম গাযালী (রাহিমাহুল্লাহ) ভ্রাতৃত্বের কিছু মৌলিক অধিকার তুলে ধরেছেন। যথা-
সম্পদ দিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করা।
প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করা।
তার দোষ গোপন রাখা।
তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা না করা।
ভালোবাসা প্রকাশ করা, কারণ এতে ভালোবাসা বাড়ে।
ভুলত্রুটি ক্ষমা করা।
গোপনে উপদেশ দেওয়া।
জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় তার জন্য দোয়া করা।
বিশ্বস্ত থাকা এবং সম্পর্ক পরিবর্তন না করা।
৬. সম্পর্কের ভারসাম্য-
অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা ও কৃত্রিমতা পরিহার করা।
এমন বন্ধু নির্বাচন করা, যার সাথে স্বাভাবিকভাবে থাকা যায়।
প্রকৃত বন্ধু সেই, যে তোমার দোষ ধরিয়ে দেয়, শুধু উপহার দেয় না।
৭. ইমাম ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মূল্যবান উপদেশ-
যে তোমাকে চায় না, তার পেছনে ছুটো না।
নিজের গোপন কথা সংরক্ষণ করো।
উপদেশ দাও, গ্রহণ করুক বা না করুক।
উপদেশ গোপনে দাও, প্রকাশ্যে নয়।
অপ্রয়োজনীয় কষ্টদায়ক কথা বন্ধুকে বলো না।
পরিশেষে শেষে বলা যায়-
যদি তুমি তোমার ভাইদের পক্ষ থেকে সম্মান ও ভালোবাসা পাও, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো। আর যদি তাদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা দেখো, তাহলে নিজের ভুল খুঁজে দেখো। কোনো সামান্য কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত নয়, এটি বিশ্বস্তদের চরিত্র নয়। কারণ সম্পর্ক ভেঙে গেলে তার কষ্ট গভীর হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তৌফীক্ব দান করুন। আমীন!
আমরা আল্লাহর কাছে দুআ‘আ করি,
হে আল্লাহ! আমাদেরকে উত্তম চরিত্রের দিকে হেদায়েত দিন, কারণ আপনি ছাড়া কেউ তা দিতে পারে না। আর আমাদের থেকে মন্দ চরিত্র দূর করে দিন, কারণ আপনি ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না।
৩ এপ্রিল, ২০২৬
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।