রিযিকের প্রকৃতি: আল্লাহর পক্ষ থেকে দুই ধরনের দান
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَكَأَيِّن مِّن دَابَّةٍ لَّا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
পৃথিবীতে এমন কত জীবজন্তু আছে যারা নিজেদের রিযিক বহন করে না; আল্লাহই তাদের রিযিক দেন এবং তোমাদেরও দেন। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আনকাবূত: ৬০)।
এই আয়াত আমাদেরকে একটি গভীর সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো রিযিকের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। মানুষের ধারণা, পরিকল্পনা কিংবা সামর্থ্যের ওপর নয়; বরং তাঁর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার ওপরই নির্ভর করে সকল জীবের জীবিকা।
আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রিযিক মূলত দুই প্রকার। যথাঃ
১. সাধারণ রিযিক-
প্রথম প্রকার হলো সাধারণ বা সর্বজনীন রিযিক। এই রিযিকের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় দেহের প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানীয় ও জীবিকার উপকরণ। এটি এমন এক রিযিক যা আল্লাহ তাআলা সব সৃষ্টিকে দান করেন; সৎ ও অসৎ, মুমিন ও কাফির, অতীত ও বর্তমান সকল মানুষকে।
কুরআনে আল্লাহ বলেন,
وَمَا مِن دَابَّةِ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا
পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়। (সূরা হূদ: ৬)।
এই রিযিকের আধিক্য বা স্বল্পতা কখনোই আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা বা অপমানের মাপকাঠি নয়। অনেক সময় মানুষ মনে করে যার কাছে বেশি সম্পদ আছে সে আল্লাহর কাছে বেশি সম্মানিত, আর যার সম্পদ কম সে যেন অবহেলিত। কিন্তু কুরআন এই ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَأَما الإنسنُ إِذَا مَا ابْتَلَـٰهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعْمَهُ، فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَـٰهُ فَقَدَر َ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَـٰنَنِ، كَلَّا
মানুষ যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করে সম্মান ও নিয়ামত দেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার রিযিক সংকুচিত করেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে অপমান করেছেন। কখনোই নয়!। (সূরা ফজর: ১৫–১৭)।
অর্থাৎ, দুনিয়ায় ধন-সম্পদ পাওয়া মানেই আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়া নয়, আবার অভাব-অনটন মানেই অপমানিত হওয়াও নয়। বরং সম্পদ ও অভাব উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এর মাধ্যমে তিনি যাচাই করেন কে কৃতজ্ঞ এবং কে অকৃতজ্ঞ, কে ধৈর্যশীল এবং কে অধৈর্য।
২. বিশেষ রিযিক-
দ্বিতীয় প্রকার হলো বিশেষ রিযিক, যা মূলত অন্তরের রিযিক। এটি দেহের নয়, বরং হৃদয়ের খাদ্য; যেমন ইলম (জ্ঞান), ঈমান, তাকওয়া এবং হালাল রিযিক যা মানুষের দ্বীনকে সুসংহত করতে সাহায্য করে।
এই রিযিক আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে মুমিন বান্দাদেরকে দান করেন। তবে মুমিনদের মধ্যেও এই দানের মাত্রা এক নয়; আল্লাহ তাঁর হিকমত ও রহমতের ভিত্তিতে যাকে যতটুকু উপযুক্ত মনে করেন ততটুকু দান করেন।
এই বিশেষ রিযিকই প্রকৃত সম্মান ও কল্যাণের পথ খুলে দেয়। এর পরিণতিতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করান। কুরআনে বলা হয়েছে,
وَمَن يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَيَعْمَلُ صَالِحًا يُدْخِلْهُ جَنَّتِ تجرى مِن تَحْتِهَا الْأَنْهـٰرُ خَلِدِينَ فِيهَا أَبدًا قَدْ أَحْسَنَ اللَّهُ لَهُ رِرْقَا.
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে; তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার জন্য উত্তম রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন। (সূরা তলাক্ব: ১১)।
সুতরাং মানুষের উচিত দুনিয়ার সাময়িক সম্পদের দিকে তাকিয়ে নিজের মর্যাদা বিচার না করা। বরং প্রকৃত রিযিক হলো সেই নিয়ামত যা হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়; ঈমান, জ্ঞান, হালাল জীবিকা ও নেক আমলের তাওফিক।
যে ব্যক্তি এই রিযিক লাভ করে, প্রকৃত অর্থে সে-ই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের অধিকারী।
তথ্যসূত্র: মুখতাসার ফিকহুল আসমাউল হুসনা।
– আব্দুল হাকীম মাদানী
ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী