▪️প্রশ্ন: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ এবং অন্যান্য মাযহাবের মাঝে [হানাফী, শাফেঈ, মালিকী ও হাম্বলী ইত্যাদি] পার্থক্য কী?
▪️উত্তর: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ এবং হানাফী, শাফেঈ, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের মাঝে কোনো বৈপরীত্য [পার্থক্য] নেই। বরং বৈপরীত্য হলো: যারা মানহাজ ও আক্বীদার ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট এবং বিদ’আতী তাদের সাথে। যেমন- আশ’আরিয়্যাহ, মু’তাযিলাহ, মুরজিআহ, সূফীয়্যাহ এবং অনুরূপ সাদৃশ্যপূর্ণ ফির্কাসমূহ।
হানাফী, শাফেঈ, মালিকী ও হাম্বলী এগুলো ফিফ্বহী মতাদর্শ [মাযহাব]। এ সকল মাযহাবের ইমামগণ শুধু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ এর অন্তর্ভুক্তই নন বরং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ এর নেতৃত্ব পর্যায়ের ইমামগণের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে, এ সমস্ত মাযহাব ও মাদরাসা সমূহের অধিকাংশ অনুসারীগন তাদের আক্বীদার ক্ষেত্রে পথভ্রষ্ট এবং বিদ’আতীদের অনুসরণ করছে। ফলস্বরূপ অধিকাংশ শাফেঈ ও মালিকী মাযহাবের অনুসারীরা আক্বীদাগত আশ’আরী হয়ে গেছে। অধিকাংশ হানাফী মাযহাবের অনুসারীরা আক্বীদাগত মাতুরিদী হয়ে গেছে। আর হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ ব্যতীত ভিন্ন মতাদর্শের আক্বীদা গ্রহণ থেকে মুক্ত রয়েছে। তবে কিছু সংখ্যক হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ভ্রান্ত আক্বীদা গ্রহণ করেছে; তবে তা খুবই কম।
একজন মুসলিমের জন্য মূলনীতি হলো, নবী [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম], তাঁর সাহাবী এবং তাঁদের অনুসারীদের [সালাফ] বুঝ ও পন্থা অনুযায়ী আল কুরআন ও সুন্নাহকে যথাযথভাবে আঁকড়ে ধরা। পক্ষান্তরে এই চার মাযহাব এবং অন্যান্য আরো যত মাযহাব রয়েছে সেগুলোর অনুসরণ করা ফরয [আবশ্যক] নয়; এমনকি সুন্নাহও নয়। অনুরূপভাবে কোনো মুসলিমের জন্য কোনো একটি মাযহাবকে নির্দিষ্ট করে নেয়াও উচিত নয়। বরং যে ব্যাক্তি সকল মাসআলার ক্ষেত্রে কোনো একটি মাযহাবকে নির্দিষ্ট করে নিল সে গোঁড়ামী, ভ্রান্তি এবং অন্ধানুসরণ করল।
[মা’ছূমী, একজন মুসলিমের জন্য চার মাযহাব থেকে যেকোন একটি অনুসরণ করা কি আবশ্যক?]
যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তির আল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে আহকাম [শরী’আতের বিধি-বিধান] বের করার ইলম না থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার জন্য চার মাযহাবের অনুসরণ করায় সমস্যা নেই। কিন্তু যখনই তার নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সঠিক মাসআলা তার অনুসৃত মাযহাবের খিলাফ [সাংঘর্ষিক], তখনই তার জন্য আবশ্যক হলো- সঠিকটা গ্রহণ করা এবং তার অনুসৃত মাযহাবকে পরিত্যাগ করা।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যারা নাবী ও রাসূলগনকে [আলাইহিমুস সালাম] বাদ দিয়ে নিজেদের বাপ-দাদার ধর্মকে অনুসরণ করেছে আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনে তাদেরকে তিরষ্কার করেছেন। আর এটাই হলো তাক্বলীদ যা আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] হারাম সাব্যস্ত করেছেন। তা হচ্ছে- রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বাদ দিয়ে অন্য কারো অনুসরণ করা যে ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] ভিন্নমত পোষণ করেছেন। আর এটা সকল মুসলিম বিদ্বানগণের ঐক্যমতেও হারাম। কেননা স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কোনো আনুগত্য নাই। রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর আনুগত্য করা নির্দিষ্ট, অনির্দিষ্ট, সদা-সর্বদা, প্রত্যেক স্থানে, প্রকাশ্যে, গোপনে মোটকথা সকল অবস্থায় ফরয। আর আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনের প্রায় চল্লিশ স্থানে সকল মানব জাতির উপর রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এর আনুগত্য করা ফরয করেছেন।
অনুরূপভাবে দলীল নিরুপণে বা মাসয়ালা নির্বাচনে অক্ষম ব্যাক্তির জন্য তাক্বলীদ করা জমহুর ওলামায়ে কিরামের নিকটে জায়েয। আর আল কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা’ দ্বারা সাব্যস্ত হারাম তাক্বলীদ হলো, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এর বিরুদ্ধাচরণ করা। এই বিরুদ্ধাচরণকারী যেই হোক না কেন তার অনুসরণ করা যাবে না।
যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তির আল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে শরী’আতের বিধি বিধান বের করার ইলম না থাকে সে ক্ষেত্রে তার জন্য চার মাযহাবের অনুসরণ করায় সমস্যা নেই। কিন্তু যখন তার নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, সঠিক মাসয়ালা তার মাযহাবের বিপরীত, তখন তার জন্য আবশ্যক হলো, সঠিকটা গ্রহণ করা এবং তার অনুসৃত মাযহাবকে পরিত্যাগ করা।
[ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১৯/২৬০-২৬৬]।
সালাফে সালিহীনের অনুসরণ করা; যারা তাদের মানহাজে, আক্বীদায় ও বুঝে [فهم] কিতাব ও সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন এবং যারা কিতাব ও সুন্নাহ দ্বারা যা সাব্যস্ত তার বিরোধীতা করেন নি।
শায়খ সালিহ আল ফাওযান [হাফিজাহুল্লাহ] বলেন,
সালাফী মাযহাব দ্বারা ঐ পন্থা উদ্দেশ্য, যার উপর সম্মানিত সাহাবী, তাবেয়ী এবং ইমামগণ; যারা বিশুদ্ধ আক্বীদায়, সঠিক মানহাজে, আন্তরিক বিশ্বাসে, রীতি নীতিতে, আদব-শিষ্টাচারে এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদিতে সম্মানিত সাহাবীদের উত্তম আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। আর তাদের মত নয় যারা বিদ’আতী, শরী’আত বিকৃতকারী এবং বিপথগামী।
যারা পূর্ববর্তী চার মাযহাবের প্রতি আহ্বান করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও তার ছাত্রবৃন্দ, শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব ও তার ছাত্রবৃন্দ [রাহিমাহুমুল্লাহ আজমাঈন]। এছাড়া আরো বহু সমাজ সংস্কারক ও মুজাদ্দিদগণ এর অন্তর্ভুক্ত; যার আহ্বান ও অনুসরণ কোনো সময়ই খালি [বন্ধ] ছিলনা। কাজেই তাদেরকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ হিসেবে আখ্যায়িত করা দোষের কিছু নয়। কেননা তাদের মাঝে এবং মাযহাব বিকৃতকারীদের মাঝে ঢের পার্থক্য আছে। আর এটা আত্মার পরিশুদ্ধতার জন্যও নয়। বরং এটা হচ্ছে হক্ব ও বাতিলপন্থীদের মাঝে পার্থক্য।
[শায়খ আল ফাওযান, আল মুনতাকা মিন ফাতাওয়া, খন্ড/১, প্রশ্ন নং- ২০৬]।
অতঃপর যদি কোনো মুসলিম মেয়ের বিয়ের জন্য এমন প্রস্তাব আসে যার ধার্মিকতা ও চরিত্র পছন্দনীয় তাহলে তা গ্রহণ করা আবশ্যক। যদিও সে এই চার মাযহাবের কোনো একটির দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত না করে। আর যদি প্রস্তাবকারী কোনো ভ্রান্ত বিকৃত মাযহাবের সাথে সম্পৃক্ত থাকে সে ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করবেনা [মহান আল্লাহ অধিক অবগত]।
[লেখাটি শায়খ ছালিহ আল মুনাজ্জিদ হাফিজাহুল্লাহ এর ইসলামকিউ.কম থেকে অনুদিত]।