তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি: সবর ও রিয়ার এক জীবন্ত চিত্র
ইতিহাসের পাতা আমাদের এমন কিছু মানুষের কথা শোনায়, যাদের জীবন ছিল দুঃখ-কষ্টে পূর্ণ; কিন্তু তাদের অন্তর ছিল তাওয়াক্কুল, সবর ও মহান আল্লাহর তাকদীরের প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টিতে ভরপুর। এই মানুষগুলো আমাদের শেখায় কষ্ট আসা স্বাভাবিক, কিন্তু কষ্টের সামনে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, সেটাই আসল পরীক্ষা।
একজন মহান তাবেঈ উরওয়া ইবন জুবায়র (রহ.)-এর জীবনে এমনই এক কঠিন পরীক্ষা নেমে এসেছিল। তিনি একবার শাসকের ডাকে যাত্রা করেন। পথে তার পায়ে মারাত্মক রোগ দেখা দেয়, যা আজকের ভাষায় গ্যাংগ্রিন নামে পরিচিত। চিকিৎসকরা জানালেন, তার পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই; না হলে রোগটি শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, তোমরা তোমাদের কাজ করো। এরপর তার পা কেটে ফেলা হলো। এই অবস্থাতেই তিনি যাত্রা অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু পরীক্ষার এখানেই শেষ হয়নি। তার এক সন্তান ঘোড়ার আঘাতে মৃত্যুবরণ করল। এমন অবস্থায় যখন তাকে এই সংবাদ দেওয়া হলো, তিনি কোনো অভিযোগ করলেন না, কোনো হতাশা প্রকাশ করলেন না; বরং তাঁর মুখে উচ্চারিত হলো কৃতজ্ঞতার বাণী। তিনি বললেন- হে আল্লাহ! তুমি আমাকে চারটি অঙ্গ দিয়েছিলে, একটি নিয়েছো, তিনটি রেখে দিয়েছি, তোমারই প্রশংসা। তুমি আমাকে সাতটি সন্তান দিয়েছিলে, একটি নিয়েছো, ছয়টি রেখে দিয়েছি, তোমারই প্রশংসা। যদি তুমি আমাকে পরীক্ষায় ফেলো, তবে তুমি তো দীর্ঘকাল আমাকে সুস্থতাও দিয়েছো; আর যদি তুমি কষ্ট দাও, তবে তুমি বহুদিন আমাকে নেয়ামতও দিয়েছো। তার এই কথাগুলো শুধু মুখের উচ্চারণ ছিল না; বরং এটি ছিল এমন এক অন্তরের প্রতিফলন, যা তাকদীরের প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টিতে ভরপুর।
অন্য এক ঘটনার কথা বলা হয়, এক বৃদ্ধ মানুষ শাসকের দরবারে উপস্থিত হলো। তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ—অন্ধ, নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ। শাসক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অবস্থা কী? তোমার গল্প কী? বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন- একসময় আমি ছিলাম ধনী। আমার ছিল সম্পদ, সন্তান, পশু সবকিছু। কিন্তু এক রাতে ভয়াবহ বন্যা এসে আমার সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমার সম্পদ হারালাম, আমার পরিবার হারালাম। তখন আমার কাছে বাকি ছিল শুধু একটি ছোট সন্তান ও একটি উট।
আমি উটটিকে ধরতে গেলাম, কিন্তু সেটি পালিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় আমি আমার সন্তানের চিৎকার শুনতে পেলাম। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, একটি নেকড়ে তাকে ধরে ফেলেছে। আমি ছুটে গেলাম, কিন্তু ততক্ষণে সে মারা গেছে।
এরপর আমি আবার উটের দিকে গেলাম। যখন তাকে ধরতে চাইলাম, তখন সে আমাকে এমনভাবে লাথি মারল যে আমার মুখ ভেঙে গেল, দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেল। এক মুহূর্তে আমি সবকিছু হারালাম সম্পদ, পরিবার, দৃষ্টি সব।
এত ভয়াবহ ঘটনার পর যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো এখন তুমি কী বলো? তিনি জবাব দিলেন- আমি বলি: আলহামদুলিল্লাহ, যিনি আমার জন্য একটি জিকিরকারী জিহ্বা এবং একটি জীবন্ত হৃদয় রেখে দিয়েছেন।
এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে, জীবনে বিপদ আসবেই, পরীক্ষা আসবেই; কিন্তু প্রকৃত সফলতা হলো সে পরীক্ষার ভেতরেও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। যার অন্তর তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট, তার কাছে কষ্টও প্রশান্তিতে রূপ নেয়। যার হৃদয়ে ঈমান আছে, সে হারিয়েও হারায় না, বরং আল্লাহর কাছে আরও নিকটবর্তী হয়। সুতরাং
সবর মানে শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়, বরং কষ্টের মাঝেও আলহামদুলিল্লাহ বলতে পারার নামই প্রকৃত সবর। আলহামদুলিল্লাহ।