আল্লাহ তাআলা ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিমের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন। তাঁদেরকে এমন দৃঢ়তা, সাহস ও সত্য প্রকাশের শক্তি দিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, তা সমাজে প্রচার করেছেন এবং এমন বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের কাছে তাঁদের চিন্তা, বক্তব্য ও দাওয়াতকে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁদের এই সাহসী অবস্থান ও বিস্তৃত রচনাকর্মের ফলেই তাঁদের বক্তব্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
কেউ যদি তাঁদের এই দৃঢ়তা ও প্রকাশ্য অবস্থানকে শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে সংঘটিত ক্ষতি, বিপদ কিংবা পার্থিব পরিণতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেন, তাহলে তিনি বিষয়টির একটি সীমিত অংশই দেখবেন। কারণ কোনো সংস্কারকের কর্মের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু তাঁর জীবদ্দশার তাৎক্ষণিক ক্ষতি দেখলেই হয় না; বরং তাঁর কাজের সুদূরপ্রসারী দ্বীনি প্রভাব, মানুষের চিন্তাজগতে তার পরিবর্তন এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তার প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
এখানেই ইমাম যাহাবী (রহ.)-এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা সামনে আসে। আকীদাগত বিভিন্ন বিষয়ে ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম ও ইমাম যাহাবী (রহ.)-এর বক্তব্যের মধ্যে যেখানে মিল রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে তাঁদের প্রভাবের বিস্তৃতির দিকে তাকালে ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিমের প্রভাব অনেক বেশি দৃশ্যমান। ইমাম যাহাবী (রহ.) নিজেও আকীদা ও অন্যান্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা করেছেন। তবে তাঁর জীবনী সম্পর্কে আল-মাকরিযীর বর্ণনায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আকীদা-সংক্রান্ত তাঁর কিছু রচনা প্রকাশ্যে প্রচার করার ক্ষেত্রে তিনি সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা করতেন। ফলে ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিমের মতো প্রকাশ্য দৃঢ়তা ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তাঁর মধ্যে একই মাত্রায় দেখা যায়নি। আর এর ফলে আকীদাগত সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রভাবের পরিধিতেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কোনো কাজের মূল্যায়ন শুধু তার তাৎক্ষণিক ফলাফল দেখে করা যথেষ্ট নয়। কখনো কোনো সত্য কথা বলা বা কোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ব্যক্তিগতভাবে বিপদ, বিরোধিতা কিংবা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু সেই কাজের দীর্ঘমেয়াদি ফল যদি মানুষের ঈমান, জ্ঞান, চিন্তা ও আমলের ক্ষেত্রে বৃহত্তর কল্যাণ বয়ে আনে, তাহলে শুধু নিকটবর্তী ক্ষতির দিকে তাকিয়ে তার সামগ্রিক মূল্যায়ন করা সঠিক নয়।
প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো নিকটবর্তী ফলাফল ও দূরবর্তী পরিণতি উভয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করা। যে ব্যক্তি শুধু সামনে থাকা সামান্য ক্ষতিটুকু দেখতে পায়, কিন্তু বহু দূরে অপেক্ষমাণ বৃহত্তর কল্যাণ দেখতে পায় না, তার দৃষ্টিভঙ্গি স্বভাবতই সীমিত। পক্ষান্তরে দূরদর্শী ব্যক্তি কোনো সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি তার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলও বিবেচনা করেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সম্ভাব্য ক্ষতি কিংবা বাস্তব বিপদকে উপেক্ষা করাই সাহসিকতা। ইসলামী প্রজ্ঞা বেপরোয়া পদক্ষেপের নাম নয়। বরং প্রকৃত হিকমত হলো সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, বাস্তবতা বোঝা, সম্ভাব্য কল্যাণ ও ক্ষতির পরিণতি বিবেচনা করা এবং শরিয়তের উদ্দেশ্য ও বৃহত্তর দ্বীনি স্বার্থের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
তাই একজন সংস্কারক বা দাঈকে বিচার করার সময় শুধু এই প্রশ্ন করা যথেষ্ট নয় যে, তাঁর সিদ্ধান্তে তাঁর নিজের জীবনে কী ক্ষতি হয়েছিল। বরং আরও দেখতে হবে, তাঁর সেই অবস্থান পরবর্তীতে কী ধরনের জ্ঞান, চিন্তা, দাওয়াত ও সংস্কারের দরজা খুলে দিয়েছে এবং মানুষের জীবনে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি দেখে থেমে যাওয়া সবসময় প্রজ্ঞার পরিচয় নয়; আবার দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের অজুহাতে বেপরোয়া হওয়াও প্রজ্ঞা নয়। প্রকৃত হিকমত হলো সত্য, বাস্তবতা, শরিয়তের উদ্দেশ্য এবং সুদূরপ্রসারী পরিণতি সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া, যার ফলাফল শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর কল্যাণের দিকে নিয়ে যায়।