ইসলামপন্থীদের মধ্যে এত মতভেদ দেখা যায় কেন?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمْ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ (البقرة: ٢١٣)
এই আয়াতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। প্রথম অংশটি তথ্যবাচক তথা জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত, যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে জ্ঞান আসার পর। আর দ্বিতীয় অংশটি কারণ নির্দেশ করে, এই মতভেদের মূল কারণ হলো বাগী বা পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও অহংকার; জ্ঞানের অভাব নয়।
বর্তমান সময়ে ইসলামপন্থীদের মতভেদ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। অধিকাংশ লেখায় এই মতভেদের বহিরঙ্গ ও এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। কিন্তু এখানে আমরা একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করবো, সংক্ষেপে হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো তুলে ধরবো এবং একই সাথে এই মতভেদের কিছু ইতিবাচক দিকও উল্লেখ করবো।
প্রথমত: ইসলামপন্থীদের মধ্যে মতভেদ অন্যদের তুলনায় কম। বাস্তবতা হলো ইসলামপন্থীরা অন্য যেকোনো মতাদর্শের অনুসারীদের তুলনায় অনেক কম বিভক্ত। তা হোক মূল উৎস (কুরআন ও সুন্নাহ) বোঝার ক্ষেত্রে, অথবা বাস্তব জীবনে তাদের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে।
আপনি যদি সন্দেহ করেন, তাহলে সমাজতান্ত্রিকদের দিকে তাকান, একটি ছোট দেশেও তারা অসংখ্য ছোট ছোট দলে বিভক্ত। অথচ তাদের সংখ্যা কম, এবং তাদের মূল গ্রন্থ (মার্কস ও এঞ্জেলসের লেখা) অপেক্ষাকৃত নতুন। তবুও তাদের মধ্যে বিভক্তি প্রবল।
লিবারেলদের অবস্থাও একই। তারা সাধারণত কোনো লাভ বা বাহ্যিক চাপ ছাড়া একত্রিত হতে পারে না। দুজন লিবারেলের মধ্যেও একমত হওয়া বিরল।
দার্শনিকদের কথা তো বলাই বাহুল্য, যারা সত্য ও যুক্তির দাবি করে, তারাও একমত নয়। নাস্তিকদের মধ্যেও চরম মতভেদ, মূল্যবোধে অস্থিরতা, এবং এক ধরনের দিকহীনতা দেখা যায়। খ্রিস্টানদের মধ্যেও শত শত উপদল, যারা একে অপরকে অস্বীকার করে।
এর বিপরীতে ইসলামপন্থীদের মধ্যে মতভেদ সীমিত পরিসরে। তারা মূলত একটি বৃহৎ কাঠামোর অংশ, যার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এমনকি বাইরের লোকেরা তাদের একদল হিসেবেই দেখে, তাদের ভেতরের সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো কেবল বিশেষজ্ঞরাই বুঝতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামপন্থীদের বিকাশ হচ্ছে সংযোগমূলক (ترابطي) ধাঁচে, বিচ্ছিন্নতার দিকে নয়। আগে ছিল ব্যক্তি নেতৃত্ব, পরে দল, আর এখন আবার উম্মাহ ধারণা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ক্রমাগত ভাঙন ও বিচ্ছিন্নতা।
দ্বিতীয়ত: অজ্ঞতা নয়, বরং অন্তরের রোগ মতভেদের কারণ। আল্লাহ তাআলার আয়াত স্পষ্টভাবে বলে মতভেদ জ্ঞানের অভাব থেকে নয়, বরং বাগী অর্থাৎ অহংকার, হিংসা, প্রতিযোগিতা ও অন্তরের রোগ থেকে আসে। এই অর্থ কুরআনের আরও আয়াতে এসেছে। যেমন:
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا (آل عمران: ١٠٥)
এখানে লক্ষ্যণীয় প্রথমে বিভক্তি (تفرقوا), তারপর মতভেদ (اختلفوا) উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে—প্রথমে বিভক্ত হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়, এরপর মতভেদকে তার অজুহাত বানানো হয়। অর্থাৎ, সমস্যা জ্ঞানে নয়—সমস্যা নিয়ত ও অন্তরের অবস্থায়।
তৃতীয়ত: ব্যক্তিগত সক্ষমতা, একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চূড়ান্ততার প্রবণতা। ইসলামপন্থীদের ভিন্ন ভিন্ন কার্যক্রমের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ব্যক্তিগত প্রবণতা ও সক্ষমতা। কেউ জ্ঞানপ্রিয়, সে ইলমের দিকে ঝোঁকে। কেউ সংগ্রামী, সে জিহাদ বা প্রতিরোধের দিকে ঝোঁকে। কেউ সমাজসেবী, সে দাওয়াত ও কল্যাণমূলক কাজে যুক্ত হয়। এই বৈচিত্র্য স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হয় যখন প্রত্যেকে নিজের পথকেই একমাত্র সঠিক মনে করে। এই একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জন্ম নেয় বন্ধ কাঠামো (closed systems) দল, সংগঠন, গোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট শায়েখকেন্দ্রিক জোট। প্রত্যেকটি গোষ্ঠী মনে করে দ্বীনের সাহায্য তাদের মাধ্যমেই সম্ভব।
ফলে তারা অন্যদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, এমনকি নিজেদের আশেপাশের লোকদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, যদি এই গোষ্ঠীগুলো বিশেষায়িত কার্যক্রমে (specialization) রূপান্তরিত হতো, তাহলে তারা পরস্পরের সহযোগী হতে পারত, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
চতুর্থত: ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার প্রভাব। ইসলামপন্থীদের মতভেদের একটি বড় দায় বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার ওপরও বর্তায়। কারণ এই ব্যবস্থা মূলত সংঘর্ষভিত্তিক। এটি সমাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে। একদিকে ছোট ছোট গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখে, অন্যদিকে বড় কোনো শক্তি গড়ে উঠলে তা ভেঙে দেয়। ফলে মুসলিম সমাজে একধরনের স্থায়ী বিভক্তি ও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যা ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
পঞ্চমত: মতভেদের কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই মতভেদের মধ্যেও কিছু উপকারিতা রয়েছে। এই ভিন্নতা ইসলামপন্থীদের জন্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে। যদি তারা শুরু থেকেই একক কাঠামোতে আবদ্ধ থাকত, তাহলে বিরোধীদের আঘাত সরাসরি সেই কাঠামোর ওপর পড়ত। কিন্তু বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত থাকার ফলে তারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে।
সবমিলিয়ে ইসলামপন্থীদের মতভেদ একটি বাস্তবতা। তবে এর মূল কারণ অজ্ঞতা নয়, বরং অন্তরের রোগ, ব্যক্তিগত প্রবণতা, এবং বহিরাগত প্রভাব। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোকে এমন এক কাঠামোয় রূপান্তর করা যায়, যা উম্মাহর জন্য কল্যাণকর হবে? কীভাবে এই বিভক্ত শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ না হলেও অন্তত সহযোগিতামূলক শক্তিতে পরিণত করা যায়? যদি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়, তবে ইনশাআল্লাহ এই মতভেদই একসময় উম্মাহর শক্তিতে পরিণত হবে। আল্লাহর তৌফীক্ব কামনা করছি। আমীন!
২ এপ্রিল, ২০২৬
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।