কিভাবে ইলম অর্জনে তাদাররুজ ও তাসহীল অবলম্বন করা হয়?
ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে তাদাররুজ বা ধীরে-সুস্থে অগ্রসর হওয়ার মূলনীতি হলো একজন ত্বলিবুল ইলম যেন পুরো ইলম একসাথে অর্জনের চেষ্টা না করে; বরং ধাপে ধাপে, সময় নিয়ে, ধারাবাহিকভাবে জ্ঞান অর্জন করে।
ইমাম যুহরী (রাহিমাহুল্লাহ) ইউনুস ইবনু ইয়াযীদকে বলেছিলেন, হে ইউনুস! ইলমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে যেও না। ইলম হলো বিভিন্ন উপত্যকার মতো; তুমি যদি একটিকে একবারে অতিক্রম করতে চাও, তবে তা তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছার আগেই ক্লান্ত করে দেবে। বরং তুমি ইলমকে রাত-দিনের সঙ্গে ধীরে ধীরে গ্রহণ করো। একসাথে সবকিছু নিতে যেও না; কারণ যে ব্যক্তি একসাথে সব নিতে চায়, সে সবই হারিয়ে ফেলে। বরং একটু একটু করে, সময় নিয়ে গ্রহণ করো।
এই অর্থকে কবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন,
আজ কিছু জ্ঞান, কাল আরও কিছু
এভাবেই বাছাই করা জ্ঞান সঞ্চিত হয়।
এভাবেই মানুষ প্রজ্ঞা অর্জন করে, কারণ
স্রোতধারা গঠিত হয় ফোঁটা ফোঁটা পানির সমষ্টিতে।
এই নীতির বাস্তব উদাহরণ হলো কেউ যদি তাফসীর শাস্ত্র শিখতে চায় এবং শুরুতেই তাফসীরে ইবনু জারীর তবারী পড়া শুরু করে, যেখানে তাফসীরের প্রায় সব আলোচনা বিদ্যমান, তাহলে সে মূলত একসাথে পুরো ইলম গ্রহণ করতে চাচ্ছে। ফলস্বরূপ, সে কিছুই ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারবে না। পড়া শেষ করলেও, কোনো আয়াতের তাফসীর তাকে জিজ্ঞেস করলে স্পষ্টভাবে বলতে পারবে না, শুধু মনে থাকবে যে কিছু পড়েছিল।
একইভাবে, কেউ যদি হাদীস শাস্ত্র শিখতে গিয়ে শুরুতেই নাইলুল আওতার বা ফাতহুল বারী পড়া শুরু করে, কিংবা ফিকহ শিখতে গিয়ে আল-মুগনী বা আল-মাজমু পড়ে, তাহলে সে প্রকৃত ইলম অর্জন করতে পারবে না। সে হয়তো কিছু তথ্য জানবে, কিন্তু তা হবে বিচ্ছিন্ন ও অপ্রতিষ্ঠিত মূল ভিত্তি ছাড়া।
কারণ এসব বড় কিতাব মূলত পরিপক্ব আলিমদের জন্য; একজন নবীন শিক্ষার্থীর জন্য নয়। একজন ছাত্রের উচিত প্রথমে মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করা, তারপর ধীরে ধীরে বড় কিতাবের দিকে অগ্রসর হওয়া।
তাই ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে তাদাররুজ বা ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া একটি অপরিহার্য সুন্নাহ। এর বিপরীতে, সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিলে, তা ইলম অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে; কারণ এতে মূল ভিত্তি তৈরি হয় না, বরং ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
এছাড়াও, অনেক সময় দেখা যায় কিছু লোক দীর্ঘ ও জটিল কিতাবের দরসে অংশগ্রহণ করে, যেখানে একটি বই শেষ করতে বহু বছর লেগে যায়, কিংবা একটি অধ্যায় নিয়েই মাসের পর মাস আলোচনা চলে। অনেকেই মনে করে এতে তারা গভীর ইলম অর্জন করছে। কিন্তু বাস্তবে এটি কার্যকর পদ্ধতি নয়; কারণ এতে সুশৃঙ্খল ও ধাপে ধাপে শিক্ষা পদ্ধতি অনুপস্থিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, বরং তোমরা রব্বানী হও, যেহেতু তোমরা কিতাব শিক্ষা দাও এবং তা অধ্যয়ন করো। (সূরা আলে ইমরান: ৭৯)।
এই রব্বানী শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, রব্বানী সেই ব্যক্তি, যিনি মানুষকে ছোট (মৌলিক) জ্ঞান দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় জ্ঞানের দিকে নিয়ে যান।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো আলিমের জন্য এটি গৌরবের বিষয় যে তিনি একটি মাসআলায় তার সমস্ত জ্ঞান তুলে ধরেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য এটি সবসময় উপকারী নয়। কারণ একজন আলিমের কাজ শুধু তার জানা সবকিছু বলা নয়; বরং শ্রোতার প্রয়োজন ও তার বোধশক্তির পরিমাণ অনুযায়ী শিক্ষা প্রদান করা।
সুতরাং, ইলম অর্জনের সঠিক পদ্ধতি হলো ধীরে ধীরে, ভিত্তি মজবুত করে, অভিজ্ঞ আলিমদের তত্ত্বাবধানে, সময় নিয়ে অগ্রসর হওয়া। এটিই সফলতার পথ, এটিই বরকতময় ইলমের পথ। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন!