ত্বলিবুল ইলমের জন্য সাহস: দায়িত্ব, প্রয়োজন ও বাস্তব প্রয়োগ
সংস্কারক ও সত্যনিষ্ঠ ত্বলিবুল ইলমের জন্য সাহস ততটাই অপরিহার্য, যতটা অপরিহার্য তার অর্জিত জ্ঞান এবং সে যে বাতাস নিঃশ্বাস নেয়। আর যখন এই সাহস প্রজ্ঞা দ্বারা বেষ্টিত হয়, তখন এ দিক থেকে তার পূর্ণতা সম্পন্ন হয়। এই কথা শুধু আবেগী উক্তি নয়; বরং ইসলামের জ্ঞান-ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং বাস্তবতার একটি শক্তিশালী সত্য।
কেন জ্ঞানসন্ধানীর জন্য সাহস অপরিহার্য?
শুধু জানা যথেষ্ট নয়, সত্য বলার শক্তিও দরকার-
জ্ঞান মানুষকে সত্য দেখায়, কিন্তু সাহস মানুষকে সেই সত্য প্রকাশের শক্তি দেয়। সাহস না থাকলে জ্ঞান কেবল গহিন বুকে লুকিয়ে থাকা একটি তথ্য হয়ে থাকে। সাহাবা, তাবেঈন, মুজতাহিদ ইমামগণ কারো জীবনেই শুধুমাত্র পড়াশোনা ছিল না; ছিলেন দৃঢ় চরিত্রের, অবিচল সাহসী মানুষ।
সাহসহীন আলেম একটি অসম্পূর্ণ সত্তা-
যদি কোনো ছাত্রের ইলম থাকে, কিন্তু মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়, অন্যায়ের প্রতিবাদে নীরব থাকে, সত্য পথে মানুষকে ডাকতে সংকোচবোধ করে; তাহলে সে পূর্ণাঙ্গ দাঈ, মুছলিহ বা আলেম নয়; বরং নিরাপদ অঞ্চলে থাকা এক দর্শক মাত্র। ইসলাম দর্শক তৈরি করে না; নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও পরিবর্তন আনতে সক্ষম মানুষ তৈরি করে।
সাহসের সাথে চাই প্রজ্ঞা ও ভারসাম্য-
ত্বলিবুল ইলমের সাহস যেন বেপরোয়া না হয়। সাহস যদি হঠকারিতার সাথে মিশে যায়, তবে তা ফিতনা সৃষ্টি করে।
সেই কারণে উলামাগণ বলেছেন, الشجاعة بلا حكمة تهور، والحكمة بلا شجاعة عجز -অর্থাৎ, প্রজ্ঞাহীন সাহস বেপরোয়া, আর সাহসহীন প্রজ্ঞা হলো অক্ষমতা।
আরো সহজে বললে, ত্বলিবুল ইলমের সাহস থাকবে কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত হবে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, সু-বিবেচনা ও শরীয়ত জ্ঞানে।
ইসলামের ইতিহাস সাহসী আলেমদের ইতিহাস-
ইসলামের উন্নতির অধ্যায়গুলো উলামাদের দৃঢ় সাহসের সাক্ষ্য বহন করে। যেমন ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ মিহনা বা কুরআন সৃষ্ট বিষয়ক রাষ্ট্রীয় চাপের মুখেও সত্যের অবস্থান থেকে সরে যাননি। অনুরূপ ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ শাসকের পদ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কারাবরণ ও প্রহার সহ্য করেছিলেন। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ কারাবাসের মাঝেও কলম থামাননি, সত্য উচ্চারণ বজায় রেখেছেন। কাজেই তাঁরা শুধু শিক্ষক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সাহসী সংস্কারক।
আধুনিক বাস্তবতায় শুদ্ধ জ্ঞানের সাথে সাহসের প্রয়োজন আরও বেশি। কেননা আজকের যুগ বিভ্রান্তি বেশি, সত্য গোপন বেশি এবং মিডিয়া প্রভাবশালী ও মিথ্যা সংগঠিত। এ যুগে যে আলেম সাহসী নয় সে সমাজকে পথ দেখাতে পারবে না। সত্যিকার পরিবর্তন আনতে পারবে না। দুর্বল মুসলিম সমাজকে শক্ত করতে পারবে না।
কাজেই কেমন হবে একজন সাহসী জ্ঞানসন্ধানীর চরিত্র?
ক. সত্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়। মানুষের ভয় নয়, মহান আল্লাহর ভয় হৃদয়ে থাকবে।
খ. সংস্কারের মানসিকতা। ভুল দেখলে সংশোধনের চেষ্টা।
গ. ধৈর্যশীল। প্রতিক্রিয়া, বিরোধিতা, অপবাদ কিছুতেই ভেঙে না পড়া।
ঘ. প্রজ্ঞাবান। সময়, স্থান, প্রেক্ষাপট বুঝে কথা বলা।
ঙ. আদর্শিক দৃঢ়তা। জনপ্রিয়তা নয়, সত্যকে অনুসরণ করা।
পরিশেষে জ্ঞান যদি হয় আলো, তবে সাহস হলো সেই আলোর শক্তি। জ্ঞান যদি হয় অস্ত্র, তবে সাহস হলো সেই অস্ত্র ব্যবহারের যোগ্যতা। আর যখন সাহস প্রজ্ঞার সাথে মিলিত হয়, তখনই গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ মুসলিহ আলেম, সমাজের দিশারি এবং উম্মাহর প্রকৃত সম্পদ। সুতরাং, আজকের ত্বলিবুল ইলমদের জন্য শুধু পড়াশোনা নয়, বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ আর প্রজ্ঞাপূর্ণ নেতৃত্ব; এই তিনটিই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সেই পথে কবুল করুন। আমীন!
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।