সেলিব্রিটিজমের উত্থান, জ্ঞানচর্চার সংকট ও আমাদের নীরবতা
আমরা ক্রমশ এক অদ্ভুত সেলিব্রিটিজমের দিকে ধাবিত হচ্ছি। সমাজে পরিচিতি অর্জন করাটাই যেন যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠছে। অবশ্যই, কেউ কেউ নিজেদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, কর্ম ও বিশেষ যোগ্যতার মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করছেন। তাঁদের কথা ভিন্ন। তাঁদের পরিচিতি তাঁদের কাজের স্বাভাবিক স্বীকৃতি। কিন্তু আমাদের আলোচনার বিষয় সেই শ্রেণি নয়; বরং এমন এক বুর্জোয়া সেলিব্রিটিজম, যেখানে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, আদর্শ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে অর্জিত যোগ্যতার চেয়ে চাকচিক্য, প্রচার-প্রচারণা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
এই ধারার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এখানে যোগ্যতার চেয়ে দৃশ্যমানতা বেশি মূল্য পায়। আশপাশের কিছু মানুষের অযাচিত প্রশংসা, সমর্থন ও তোষামোদে একশ্রেণির মানুষ ক্রমাগত ফুলে-ফেঁপে ওঠেন। তাঁরা নিজেদের সম্পর্কে একধরনের কৃত্রিম উচ্চ ধারণা পোষণ করতে শুরু করেন। আত্মসমালোচনা, আত্মজিজ্ঞাসা কিংবা নিজেদের কাজের যথার্থতা যাচাই করার অবকাশ তাঁদের আর থাকে না। পারিপার্শ্বিকতার সাময়িক উন্মাদনাই তাঁদের চিন্তা ও কর্মের গতিপথ নির্ধারণ করে। ফলে জীবনের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য, আদর্শিক অবস্থান কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠে না।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই প্রবণতা এখন কেবল সাধারণ সামাজিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ নেই; রাজনৈতিক ও আদর্শিক অঙ্গনেও এর বিস্তার ঘটেছে। কট্টরপন্থী ও শিথিলপন্থী, উভয় ধারার মধ্যেই এমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারসর্বস্বতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কেউ রাজনীতির ময়দানে জনপ্রিয়তার পুঁজি কাজে লাগাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ এই জনপ্রিয়তাকে ভিত্তি করেই খেলাফত প্রতিষ্ঠার মতো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক স্বপ্ন দেখছেন। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ও দায়িত্বের জন্য যে গভীর জ্ঞান, ব্যাপক অধ্যয়ন, প্রজ্ঞা, চারিত্রিক পরিপক্বতা এবং বাস্তবতা অনুধাবনের সক্ষমতা প্রয়োজন, সেসব অর্জনের প্রতি তাঁদের আগ্রহ ও প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ।
ধ্রুপদি কিতাবপত্রের সঙ্গে গভীর ও নিয়মিত সম্পর্ক নেই। সমকালীন জ্ঞানচর্চা, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত অধ্যয়নও অনুপস্থিত। বাংলা ভাষায় কিছু বইপত্র পড়া কিংবা বিচ্ছিন্ন কিছু বক্তব্য আত্মস্থ করাকেই অনেকে যথেষ্ট মনে করেন। অথচ সামান্য পাঠ, কিছু বক্তৃতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি এবং একদল অনুসারীর সমর্থন কখনোই একজন মানুষকে জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান কিংবা নেতৃত্বের উপযুক্ত করে তোলে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যাঁরা সত্যিকার অর্থে জ্ঞানচর্চা করেন, যাঁরা আগামী প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক বিকাশ নিয়ে ভাবেন, তাঁদের একটি অংশের নীরবতা। এই নীরবতা অনেক সময় অপরিণত চিন্তা, অগভীর জ্ঞান ও প্রচারসর্বস্ব নেতৃত্বের পথকে আরও প্রশস্ত করে দেয়। যোগ্য মানুষের অনুপস্থিতি যতটা ক্ষতিকর, যোগ্য মানুষের নীরবতাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ততটাই বিপজ্জনক।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য যাঁরা নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁরা এখনো হয়তো বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত নন। তাঁরা অধ্যয়ন করছেন, নিজেদের সমৃদ্ধ করছেন, চিন্তার ভিত্তি মজবুত করছেন এবং প্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ সংগ্রহ করছেন। তাঁদের অনেকেই এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের এই প্রস্তুতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করার পরিবর্তে আমরা যদি সাময়িক জনপ্রিয়তা ও বাহ্যিক চাকচিক্যকে প্রাধান্য দিই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অপরিণত ও অগভীর ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পরিসরগুলো দখল করে নেবেন। তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নতুন প্রজন্মের একটি অংশও ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে।
আমাদের এখনই ভাবতে হবে, আমরা কেমন মানুষকে সামনে আনছি এবং কাদের হাতে ভবিষ্যতের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক নেতৃত্ব তুলে দিচ্ছি। জনপ্রিয়তা কখনো যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। অনুসারীর সংখ্যা জ্ঞানের গভীরতা নির্ধারণ করে না, আর প্রচারের ব্যাপকতা কোনো চিন্তার যথার্থতার প্রমাণ নয়।
তাই যাঁরা পড়াশোনা করেন, যাঁরা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার চর্চা করেন, যাঁরা ব্যক্তি-আরাধনার ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শ, সত্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তাঁদের আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি। তাঁদের উচিত নিজেদের অর্জিত জ্ঞানকে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া, গঠনমূলক আলোচনা তৈরি করা, অপরিণত চিন্তার বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা করা এবং নতুন প্রজন্মের সামনে অধ্যয়ন, যোগ্যতা ও আদর্শনিষ্ঠার প্রকৃত মানদণ্ড তুলে ধরা।
আমরা যেন ব্যক্তির চাকচিক্যে মুগ্ধ না হয়ে তাঁর জ্ঞান, চিন্তার গভীরতা, কর্মের ফলাফল ও আদর্শিক অবস্থান যাচাই করতে শিখি। কারণ কোনো সমাজের ভবিষ্যৎ সাময়িক জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; দাঁড়িয়ে থাকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার ওপর।
ব্যক্তিকে বড় করে তোলার চেয়ে জ্ঞানকে বড় করে তোলা জরুরি। আর জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটা নয়, যোগ্যতা ও আদর্শের ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করাই হওয়া উচিত আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।