ইসলাম-ই সর্বপ্রথম এবং ইসলাম-ই সর্বশেষ
জাহিলিয়াত যুগে আরব সমাজের মূল ভিত্তি ছিল গোত্রীয় আসাবিয়্যাহ বা বংশীয় অহংকার। তারা এই আসাবিয়্যাহকেই তাদের আনুগত্য, পরিচয়, সম্মান ও মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হতো গোত্রের ভিত্তিতে; যুদ্ধ ঘোষণা হতো গোত্রের জন্য, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতো গোত্রের স্বার্থে। সে সময়কার রাজনৈতিক কাঠামোগুলোও গড়ে উঠেছিল এই সংকীর্ণ চিন্তার ওপর; কখনো জাতিগত, কখনো ধর্মীয়, আবার কখনো উভয়ের মিশ্রণে।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইসলাম নিয়ে আগমন করেন। তিনি মানুষের পরিচয়ের ভিত্তি আমূল পরিবর্তন করে দেন। গোত্র, বংশ, ভাষা বা ভূখণ্ডের পরিবর্তে তিনি আকীদাকে, অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ঈমানকে মানব পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু বানান। তিনি শুধু আরবদেরই নয়, বরং আরব ও অনারব সকল জাতিকে একই পতাকার নিচে একত্রিত করেন। তিনি জাহিলিয়াতের বিভাজনকে ভেঙে দেন এবং একটি নতুন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে মানুষকে মূল্যায়ন করা হয় তাকওয়ার ভিত্তিতে।
ইসলাম জীবন ও সমাজব্যবস্থায় একটি মৌলিক বিপ্লব ঘটায়। এটি মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক, শাসনব্যবস্থা সবকিছুকে পুনর্গঠন করে। আনুগত্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে একমাত্র মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবকিছুই ইসলামের অধীন হয়ে যায়। যুদ্ধ ও শান্তির ধারণাও ইসলামী শরীয়তের আলোকে নির্ধারিত হয়, যেখানে জিহাদ হলো মানুষের কাছে সত্য পৌঁছানোর একটি মাধ্যম, নিছক দখল বা আধিপত্য বিস্তারের উপায় নয়।
কিন্তু ইতিহাসের এক পর্যায়ে মুসলিমদের মাঝে চিন্তাগত ও রাজনৈতিক দুর্বলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দী (উনবিংশ শতাব্দী) থেকে ইউরোপীয় জাগরণ ও শক্তির প্রভাবে মুসলিম বিশ্বে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসহীনতা তৈরি হয়। এই সুযোগে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মাধ্যমে।
তারা মুসলিমদের ঐক্যের মূল ভিত্তি ইসলামী আকীদাকে আঘাত করে। সিরিয়ার খ্রিস্টান বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে তারা জাতীয়তাবাদ ও কৌমীয়তার ধারণা ছড়িয়ে দেয়। নাসিফ ইয়াজিজি, বুতরাস আল-বুস্তানি প্রমুখ ব্যক্তি ‘জাতীয় পরিচয়’ ও ‘রাষ্ট্রীয় জাতীয়তা’-র ধারণা প্রচার করে, যা ইসলামের উম্মাহ-ভিত্তিক ঐক্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানী খেলাফতের পতন ঘটে। এটি ছিল মুসলিম ঐক্যের শেষ শক্তিশালী প্রতীক। খেলাফত ভেঙে যাওয়ার পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রকে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তারা নতুন নতুন রাষ্ট্র তৈরি করে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদী চিন্তা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ায় তারা শিক্ষা ব্যবস্থা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে। মুসলিমদের শেখানো হয় তোমার পরিচয় ইসলাম নয়, বরং তোমার দেশ, ভাষা, জাতি। ফলে ধীরে ধীরে মুসলিমদের মধ্যে উম্মাহর চেতনা দুর্বল হয়ে যায়, আর জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এমনকি দুঃখজনকভাবে কিছু আলেম ও ইসলামী আন্দোলনও এই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। তারা জাতীয়তাবাদকে ইসলামের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে। حب الوطن من الإيمان (অর্থাৎ, দেশপ্রেম ঈমানের অংশ) এই ভিত্তিহীন কথাটি হাদীস হিসেবে প্রচারিত হতে থাকে, যদিও মুহাদ্দিসগণ একে জাল বলে ঘোষণা করেছেন।
এইভাবে পশ্চিমা চিন্তা মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। মুসলিমরা নিজেদের সম্পর্ক নির্ধারণ করে জাতীয়তার ভিত্তিতে, কুরআন-সুন্নাহ ব্যাখ্যা করে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে, এবং শরীয়তের বিধানকেও জাতীয় স্বার্থের সাথে মিলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে। ফলাফল হলো মুসলিমরা মুসলিমদের শত্রু ভাবতে শুরু করে, আর কাফিরদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে।
বর্তমান সময়ে وطني أولاً (আমার দেশ আগে) এই স্লোগান নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে। এটি দেখতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে এটি একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধারণা। এটি মুসলিমদেরকে তাদের উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তাদেরকে একটি ছোট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে।
এই স্লোগান বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তুরস্কে খেলাফত বিলুপ্ত করার জন্য, মিশরে ইসরাইলের সাথে আপস করার জন্য, ফিলিস্তিনে ভূমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য, পাকিস্তানে মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য এভাবে প্রত্যেক ক্ষেত্রে দেশ আগে স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে ইসলামের স্বার্থের বিরুদ্ধে।
ইসলাম এই ধারণাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ইসলাম নির্দেশ দেয় মহান আল্লাহ, তাঁর রাসূল ﷺ এবং জিহাদের প্রতি ভালোবাসা সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ… أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ… فَتَرَبَّصُوا
-অর্থাৎ, যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে দুনিয়াবী সম্পর্ক বেশি প্রিয় হয়, তবে তোমরা অপেক্ষা করো (শাস্তির জন্য)।
নবী ﷺ বলেছেন, من دعا إلى عصبية فليس منا অর্থাৎ, যে ব্যক্তি গোত্রীয়তা বা পক্ষপাতিত্বের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইসলাম মুসলিমদের সম্পর্ককে এক দেহের সাথে তুলনা করেছে, مثل المؤمنين في توادهم… অর্থাৎ, তারা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের মতো।
ইসলাম উম্মাহর ধারণাকে আকীদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছে। মুসলিমরা একে অপরের সাহায্যকারী, একে অপরের বন্ধু, একে অপরের শক্তি। আল্লাহ বলেন, وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ – অর্থাৎ, ইসলাম মুসলিমদের একত্রিত থাকার নির্দেশ দেয় এবং বিভক্তিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে। এমনকি একাধিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকেও নিরুৎসাহিত করেছে।
তাছাড়া ইসলাম জিহাদকে ফরজ করেছে, যাতে ইসলামের দাওয়াত সারা পৃথিবীতে পৌঁছে যায়। তাই সংকীর্ণ জাতীয় সীমানা ইসলামের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাংঘর্ষিক।
সবশেষে বলা যায়, وطني أولاً তথা দেশ সবার আগে ধারণা মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি তাদের ঐক্য নষ্ট করে, আকীদা দুর্বল করে এবং ইসলামের শাসন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজেকে ইসলামের প্রকৃত চেতনায় গড়ে তোলা, উম্মাহর ঐক্যের জন্য কাজ করা, এবং এই ভ্রান্ত জাতীয়তাবাদী ধারণাকে প্রতিহত করা।
কারণ আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত الإسلام أولاً وأخيراً অর্থাৎ, ইসলামই প্রথম, ইসলামই শেষ।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝা ও মানার তৌফীক্ব দান করুন। আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমীন! বারাকাল্লাহু ফিকুম।
বিনীত-
১ লা এপ্রিল, বুধবার
আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।

![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/সালাতে-অন্তরের-উপস্থিতির-মনোযোগ-গুরুত্ব-350x250.jpg)
![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/ইমাম-ইবনুল-জাওযী-رحمه-الله-এক-গভীর-সত্য-কথা-বলেছেন-350x250.jpg)
![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/মানুষের-সম্পর্কের-জগৎ-বড়ই-বিচিত্র-350x250.jpg)

![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/বই-পড়ার-প্রতি-গভীর-আসক্তি-350x250.jpg)
![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/নম্রতার-সৌন্দর্য-ও-প্রকৃত-পরিপূর্ণতা-350x250.jpg)
![সালাতে অন্তরের উপস্থিতির [মনোযোগ] গুরুত্ব](https://alilmbd.com/wp-content/uploads/2026/10/তাড়াহুড়ো-করে-গড়ে-তোলা-নৈতিক-নির্মাণ-যার-পূর্ণতা-খুব-অল্প-350x250.jpg)




