আমরা সত্যিই বহুত দূরে… খুব দূরে।
প্রতিবার যখন আমি কোনো বোনকে আল্লাহর কিতাবের একটি সূরা দৃঢ়ভাবে মুখস্থ করাতে টেলিগ্রাম গ্রুপে সঙ্গ দিই, তখন এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যা হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়। আমার সঙ্গে এমন তিনটি ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাটি আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারব না।
প্রথম ঘটনা:
ইয়েমেনের এক বোন। আমরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তিলাওয়াত শোনাতাম। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিয়মিত ও দায়িত্বশীল। একদিন বললেন, ক্ষমা করবেন, আজ একটু দেরি হবে, সময়টা বদলাতে হবে।
আমি মজা করে বলেছিলাম, মনে হয় আমি বেশি সময় নিয়ে ফেলছি!
তিনি শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন,
— না, আজ আমার বিয়ে।
হ্যাঁ…
আজ তার বিয়ের দিন।
আমি কিছুক্ষণ নীরব হয়ে গেলাম। বিষয়টি হজম করতে সময় লাগছিল। অথচ আমরা কত মাস, কত বছর কুরআনের হালাকা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি। বাগদান, বিয়ের প্রস্তুতি, আকদ, বিয়ের পর—সব কিছুর অজুহাতে! আল্লাহ যাদের উপর দয়া করেন, তারাই কেবল ব্যতিক্রম।
দ্বিতীয় ঘটনা:
মরক্কোর এক বোন। ভীষণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। আমাদের তিলাওয়াত হতো খুব সংক্ষিপ্তভাবে। কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা নয়, কোনো ঢিলেমি নয়। যা আমাদের অভ্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।
একদিন আমি তিলাওয়াতে দুর্বল ছিলাম, বারবার ভুল করছিলাম। তখন তিনি বললেন,
—তুমি পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন চলছ না? আমরা কি ঠিক করিনি, প্রতি নামাজের পর পুনরাবৃত্তি করবে? এভাবে তো ঠিক হচ্ছে না।
আমি বললাম, সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি, বিশেষ করে যমজ বাচ্চা।
তার জবাব আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিল,
— এতে আশ্চর্যের কী আছে? আমি ছয় সন্তানের মা। তাদের মধ্যে তিনজনকে একসঙ্গে গর্ভে ধারণ করেছি। এখন তাদের বয়স প্রাইমারি থেকে দুধের শিশু পর্যন্ত। সন্তান আল্লাহর নেয়ামত, বিয়ে আল্লাহর নেয়ামত, কুরআনও আল্লাহর নেয়ামত। তবে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা কোথায়? সময় গুছিয়ে নাও, তাহলে বরকত আসবেই।
তৃতীয় ঘটনা:
লিবিয়ার এক বোন। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত তিলাওয়াত করতেন। হঠাৎ টানা দু’দিন অনুপস্থিত, কোনো কারণ ছাড়াই।
আমার স্বভাবসুলভ কৌতূহল থেকে জিজ্ঞেস করলাম,
— আপনি ঠিক আছেন তো? আমরা কি সূরাটি শেষ করব?
তিনি বললেন,
— হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ আগামীকাল।
পরদিন যোগাযোগ হলে ক্ষমা চাইলেন। কারণ তিনি তখন সন্তান প্রসব করছিলেন।
গর্ভাবস্থার শেষ সময় পর্যন্ত তিলাওয়াত চালিয়ে গেছেন। কেবল অপারেশনের দিন ও তার পরের দিন এই দু’দিন বিরতি। এরপর আবার ফিরে এসেছেন, যেন কিছুই হয়নি।
আর তখন নিজের কথা মনে পড়ল…
প্রথম গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মের সময় আমি পুরো দুই বছর কুরআন মুখস্থ বন্ধ রেখেছিলাম।
এই ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু আজ যে ঘটনাটি ঘটল, তা আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিল।
আজকের ঘটনা:
এক বোন, যার সঙ্গে আমি প্রায় দুই মাস ধরে আছি। অত্যন্ত কোমল ও স্নেহশীলা। আমার সন্তানদের কোলাহলে তিনি বিরক্ত হন না। বরং জোর দেন একটি আয়াত বিশবার না পড়া পর্যন্ত স্থির করবেন না।
তিনি ফিলিস্তিনি। বর্তমানে জর্ডানে থাকেন। তার পরিবারের অনেকেই শহীদ হয়েছেন। আমি তাকে সান্ত্বনা দিলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন,
— তারা জান্নাতের শহীদ। আমরা আল্লাহর পথে জিহাদের জন্যই সৃষ্টি হয়েছি। তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।
এই বোন সপ্তাহে তিন দিন তিলাওয়াতের সময় পরিবর্তন করেন। আমি খোলাখুলি বললাম পুরোনো সময়টাই আমার জন্য সুবিধাজনক। জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কি অন্য কোনো হালাকা বা কাজে যুক্ত?
তিনি শান্তভাবে বললেন—
— না। এই দিনগুলোতে আমি খুব ভোরে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে যাই। ফিরতে দেরি হয়। তাই অন্য সময়ে আপনার সঙ্গে যুক্ত হই।
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।
গত দুই মাস ধরে ডায়ালাইসিস শেষে তিনি বাড়ি ফেরেন, তারপর ফোন করেন, তিলাওয়াত শোনান, বারবার পুনরাবৃত্তি করেন, সূরা দৃঢ় করেন এমনকি একাধিকবার আবার কল করেন।
তিনি এখনো অবিবাহিতা, বয়স বিশের শেষের দিকে। আর আমরা সবাই জানি কিডনি ডায়ালাইসিস কতটা কঠিন।
আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, হে মহান আল্লাহ, আরশের মহান রব, তাকে পূর্ণ আরোগ্য দান করুন এমন আরোগ্য, যার পর আর কোনো অসুস্থতা থাকবে না।
আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম—
আমি কি তাকে সান্ত্বনা দেব?
না কি বলব, আল্লাহ তোমাকে সুস্থ রাখুন?
না কি নিজের জন্য কাঁদব?
আমাদের কী এমন দূরে রাখে আল্লাহ থেকে, কুরআন থেকে?
কোন অজুহাত আমাদের আছে যখন কেউ মৃত্যু, রোগ আর শোকের মাঝেও কুরআন ছাড়ে না, রবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না?
আমরা কী নিয়ে বিরক্ত হই, কিসে অতিষ্ঠ হই এইসব পরীক্ষিত মানুষের জীবনের তুলনায়?
সত্যিই…
আল্লাহ তাদের বেছে নিয়েছেন।
আর আমরা—অবহেলাকারী, গাফেল।
হে আল্লাহ,
আমাদের ক্ষমা করুন,
আমাদের ইখলাস দান করুন,
আমাদের জীবনে বরকত দিন,
এবং সুন্দর পরিণতি দান করুন।
ইখলাসের দুআ: মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ-এর হৃদয়স্পর্শী ঘটনা
বিশিষ্ট তাবেঈ মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, একদিন আমি বসরা নগরীতে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, মানুষজন বড় মসজিদে সমবেত হয়ে যোহর থেকে এশা পর্যন্ত অবিরাম আল্লাহর কাছে দুআ করছে। তারা মসজিদ ছাড়েনি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের কী হয়েছে?
তারা বলল, আকাশ বৃষ্টি আটকে রেখেছে তথা বৃষ্টি হচ্ছে না, নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। আমরা আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি।
আমি তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম।
যোহরের পর দুআ, আসরের পর দুআ, মাগরিবের পর দুআ, এশার পর দুআ। কিন্তু এক ফোঁটাও বৃষ্টি হলো না।
সবাই হতাশ হয়ে নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেল।
মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার তো কোনো ঘর ছিল না, তাই আমি মসজিদেই রয়ে গেলাম। হঠাৎ একটি লোক মসজিদে প্রবেশ করল। সে ছিল কালো বর্ণের, নাক চ্যাপ্টা, পেট মোটা, অত্যন্ত দরিদ্র, শরীর ঢাকার জন্য তার কাছে ছিল মাত্র দুটি ছেঁড়া কাপড়; একটিতে সে লজ্জাস্থান ঢেকেছে, অন্যটি কাঁধে জড়ানো।
সে দুই রাকাআত সালাত পড়ল। না দীর্ঘ, না আড়ম্বরপূর্ণ। তারপর ডানে-বামে তাকাল, কেউ আছে কি না দেখতে; আমাকে দেখতে পেল না। অতঃপর সে কিবলার দিকে মুখ করে হাত তুলল এবং বলল, হে আমার ইলাহ, হে আমার সর্দার, হে আমার মাওলা!
তুমি তোমার বান্দাদের শাসন করার জন্য বৃষ্টি আটকে রেখেছ। অতএব আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি। হে সহনশীল, ধৈর্যের অধিকারী! হে সেই সত্তা, যার কাছ থেকে তাঁর সৃষ্টিজীব কেবল দানশীলতাই চেনে। তুমি এই মুহূর্তে, এই মুহূর্তে, এই মুহূর্তেই তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ কর।