বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং শিক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা, দাওয়াহ, সংবাদ ও মতামত প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্নটি শুধু সোশ্যাল মিডিয়া কতটা উপকারী, এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রশ্ন হলো, এটি আমাদের ঈমান, চরিত্র, পারিবারিক সম্পর্ক ও সন্তানদের ভবিষ্যতের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?
পরিবারে ইতিবাচক সম্ভাবনা
সোশ্যাল মিডিয়াকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক ব্যবহার হলে এটি মুসলিম পরিবারের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। দূরে থাকা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, কুরআন হাদিসের শিক্ষা গ্রহণ, শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখা, সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা করা কিংবা হালাল ব্যবসা ও পেশাগত কাজে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে শুধু ফোন ব্যবহার করো না বলার পরিবর্তে কীভাবে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শেখান, তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যম হতে পারে।
কিন্তু সংকটটা কোথায়?
সমস্যা সোশ্যাল মিডিয়া থাকার মধ্যে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে।
একটি পরিবারের সবাই যদি একই ঘরে বসে থেকেও প্রত্যেকে আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকে, তাহলে বাহ্যিকভাবে পরিবার একসঙ্গে থাকলেও বাস্তবে পারিবারিক যোগাযোগ দুর্বল হয়ে যায়। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কথাবার্তা কমে, সন্তানদের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো কমে এবং পারিবারিক আবেগ ও আন্তরিকতার জায়গা ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগৎ দখল করে নেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সন্তানদের চিন্তা, রুচি, ভাষা, পোশাক, সম্পর্ক ও জীবনদর্শন গঠনের ক্ষেত্রে অনেক সময় বাবা মায়ের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বেশি হয়ে যাচ্ছে।
সন্তান প্রতিপালনে নতুন চ্যালেঞ্জ
আগে সন্তান কী দেখবে, কার সঙ্গে মিশবে এবং কী ধরনের কথা শুনবে, এসব বিষয়ে বাবা মায়ের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এখন একটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে শিশুর ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে অসংখ্য অজানা মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা।
অ্যালগরিদমও সাধারণত ব্যবহারকারী যে ধরনের কনটেন্টে বেশি সময় দেয়, তাকে একই ধরনের আরও কনটেন্ট দেখাতে থাকে। ফলে একজন কিশোর প্রথমে হয়তো সাধারণ বিনোদনমূলক ভিডিও দেখছে; পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আরও উত্তেজক, অশালীন, ভোগবাদী কিংবা বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে।
এখানে শুধু প্রযুক্তিকে দোষ দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং তার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দ্বীনি মূল্যবোধ তৈরি করাই মূল প্রতিরোধ।
দাম্পত্য জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব
সোশ্যাল মিডিয়া দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যের সাজানো গোছানো জীবন দেখে নিজের সংসারের সঙ্গে তুলনা করা, স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় অনলাইনে প্রকাশ করা, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ, অতিরিক্ত মেসেজিং কিংবা গোপন অনলাইন সম্পর্ক, এসব দাম্পত্য জীবনে অবিশ্বাস ও অশান্তির কারণ হতে পারে।
বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের সেরা অংশটিই প্রদর্শন করে। অথচ দর্শক সেটিকেই পুরো বাস্তবতা মনে করে নিজের জীবনকে তার সঙ্গে তুলনা করেন। এর ফলে নিজের সংসার, জীবনসঙ্গী ও অর্জন সম্পর্কে অযথা অসন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে।
ঈমান ও আমলের ওপর প্রভাব
একজন মুসলিমের জন্য সময় অত্যন্ত মূল্যবান। সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর একটি হলো সময়ের অপচয়।
‘মাত্র পাঁচ মিনিট’ দিয়ে শুরু করে কখন এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা চলে যায়, অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। নামাজের সময় বিলম্বিত হওয়া, কুরআন তিলাওয়াতের সময় কমে যাওয়া, জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করা, এসব ধীরে ধীরে একজন মানুষের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করে দিতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর, এগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।” সূরা আল ইসরা: ৩৬
অতএব, একজন মুসলিম কী দেখছে, কী শুনছে, কী প্রচার করছে এবং কোন বিষয়ের পেছনে নিজের সময় ব্যয় করছে, এসব বিষয়কে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
গীবত, অপবাদ ও যাচাইহীন তথ্য
সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের হাতে কথা বলার এমন ক্ষমতা দিয়েছে, যা আগে ছিল না। কিন্তু এই ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও এসেছে।
একটি যাচাইহীন সংবাদ শেয়ার করে দেওয়া, কারও সম্মানহানি করা, ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা, গীবত বা অপবাদ ছড়ানো, এসব কয়েক সেকেন্ডের কাজ হলেও এর ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।” সূরা আল হুজুরাত: ৬
তাই মুসলিম পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ, সবার মধ্যেই ডিজিটাল আমানতদারি ও তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
সমাধান নিষেধাজ্ঞা নয়, সুশৃঙ্খল ব্যবহার
সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতি থেকে পরিবারকে রক্ষা করার অর্থ সবাইকে ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া নয়। বরং প্রয়োজন সচেতনতা, সীমারেখা ও পারিবারিক নীতিমালা।
পরিবারে কিছু বাস্তব নিয়ম করা যেতে পারে:
• নামাজের সময় ফোন ব্যবহার না করা।
• খাবার টেবিলে মোবাইলমুক্ত সময় রাখা।
• ঘুমের আগে নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিন বন্ধ করা।
• ছোট সন্তানদের একা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া।
• সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তা নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে আলোচনা করা।
• স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ না করা।
• কোনো সংবাদ শেয়ার করার আগে যাচাই করা।
• অশালীন ও ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে নিজেকে ও সন্তানদের দূরে রাখা।
• পরিবারের সবাই মিলে বই পড়া, আলোচনা, খেলাধুলা ও ইবাদতের মতো অফলাইন কার্যক্রম বাড়ানো।
• সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অভিভাবক নিজেরাই আদর্শ হওয়া।
কারণ সন্তানকে ফোন কম ব্যবহার করো বলে নিজে সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকা কোনো কার্যকর শিক্ষা নয়।
শেষ কথা
সোশ্যাল মিডিয়া নিজে ভালো বা মন্দ, এভাবে এক কথায় বিচার করা যায় না। এটি একটি মাধ্যম। এই মাধ্যম মানুষের জ্ঞান বাড়াতেও পারে, আবার সময়, চরিত্র, সম্পর্ক ও ঈমান নষ্ট করার কারণও হতে পারে।
মুসলিম পরিবারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে পরিত্যাগ করা নয়; বরং প্রযুক্তির ব্যবহারকে ঈমান, আখলাক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অধীন করা।
আমাদের এমন পরিবার দরকার যেখানে সন্তান প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না; সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকবে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া তার চিন্তা ও চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করবে না; আধুনিক জ্ঞান অর্জন করবে, কিন্তু নিজের ঈমান, লজ্জাশীলতা, পারিবারিক বন্ধন ও ইসলামী পরিচয় হারাবে না।
কারণ একটি পরিবার কেবল একই ছাদের নিচে বসবাসকারী কয়েকজন মানুষের সমষ্টি নয়; পরিবার হলো মূল্যবোধ, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও ঈমানের একটি প্রতিষ্ঠান। আর এই প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
-আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী।