খুবাইব ইবনু আদী (رضي الله عنه)-
একজন শহীদের গল্প, হৃদয় কাঁপানো দৃঢ়তার ইতিহাস
খুবাইব (رضي الله عنه) ছিলেন আসিম ইবন সাবিত (رضي الله عنه)–এর সহযাত্রী, যাদের ‘বনু লাহিয়ান’ গোত্র ‘রাজী-‘ নামক স্থানে বন্দি করে নেয়। পরে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয় প্রতিশোধ নিতে উদগ্রীব বিভিন্ন গোত্রের কাছে।
আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) বলেন, বন্দী করার পর বনু লাহিয়ান খুবাইবকে বনু হারিস–এর হাতে বিক্রি করে দেয়। কারণ বদর যুদ্ধের দিনে খুবাইব (رضي الله عنه) হারিস ইবন আমির নামের একজনকে হত্যা করেছিলেন। প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে বনু হারিস খুবাইবকে শহীদ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
খুবাইব বন্দী অবস্থায় ছিলেন। দাড়ি-গোঁফসহ অপ্রয়োজনীয় লোম কাটার জন্য তিনি বনু হারিসের এক নারী থেকে একটি খুঁর (রেজার) চাইলেন।
হঠাৎ সেই নারীর ছোট্ট বাচ্চাটি এসে খুবাইবের কোলে বসে পড়ে। মা ভয় পেলেন, হায়! এটা তো আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলবে!
খুবাইব (رضي الله عنه) শান্ত কণ্ঠে বললেন, তুমি কি ভয় করছ আমি তোমার সন্তানকে হত্যা করবো? আল্লাহর কসম! আমি কখনো এমন কাজ করতে পারি না!
পরে সেই নারী বলতেন, আমি খুবাইবের মতো উত্তম বন্দি কখনো দেখিনি!
যখন তাকে হত্যার জন্য বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, খুবাইব (رضي الله عنه) বললেন, আমাকে দুই রাকাআত নামায পড়তে দাও।
তিনি দ্রুত সালাত পড়ে বললেন, যদি এই ভয়ে না থাকত যে তোমরা বলবে মৃত্যুভয়ে সালাত লম্বা করলো। তাহলে আমি শান্তভাবে দীর্ঘ সালাত পড়তাম। এর আগে কখনো এত তাড়াতাড়ি সালাত পড়িনি। মূলতঃ এখান থেকেই বন্দীর মৃত্যুর আগে দুই রাকাআত সালাত পড়ার বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।
এরপর খুবাইব হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ! এই কাফেরদের একজনকেও বেঁচে থাকতে দিও না।
তাদেরকে একে একে ধ্বংস করো। এই দুআ আল্লাহ কবুল করেছিলেন, ইতিহাস সাক্ষী, তাদের সবাই পরবর্তীতে ধ্বংস হয়ে যায়।
যখন তার দেহ টুকরো টুকরো করা হচ্ছিল তখন তিনি অটুট ঈমানের সাথে এই অমর কবিতাগুলো পড়ছিলেন,
وَلَسْتُ أُبَالِي حِينَ أُقْتَلُ مُسْلِمًا
আমি মুসলিম অবস্থায় নিহত হচ্ছি, এতে আমার কোনো পরোয়া নেই।
عَلَى أَيِّ شِقٍّ كَانَ لِلَّهِ مَصْرَعِي
আল্লাহর পথে আমাকে যেভাবেই ফেলে দেওয়া হোক,
আমি তাতে চিন্তিত নই।
وَذَلِكَ فِي ذَاتِ الْإِلَهِ وَإِنْ يَشَأْ
এ সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর যদি আল্লাহ চান।
يُبَارِكْ عَلَى أَوْصَالِ شِلْوٍ مُمَزَّعِ
তবে তিনি আমার কাটা ছেঁড়া দেহের টুকরোগুলোতেও বরকত দিবেন। (বুখারী/ ৩০৪৫)।
খুবাইব ইবনু আদি (رضي الله عنه) সেই শহীদ, যার দেহ কেটে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু ঈমানকে কেউ ছুঁতে পারেনি। তাঁর শেষ মুহূর্ত ছিল তাসবীহে ভরা, দৃঢ়তায় উজ্জ্বল, আর আল্লাহর পথে সমর্পণে দীপ্ত। মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়েও তিনি বলেছিলেন, দেহ টুকরো হোক, তবু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এতে বরকতই বরকত। তাঁর শহাদত আজও ঈমানদারদের হৃদয়ে জ্বালায় তাওহীদের আগুন।