ইতিহাসের পাতায় আমরা বারবার এরকম কিছু অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পাই। মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবন নিয়ে ব্যস্ত, আর ঠিক সেই সময়েই সমাজের প্রকৃত সংস্কারকরা তথা মুসলেহরা বন্দিত্ব, নিপীড়ন বা নির্যাতনের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছেন।
মিসরের মানুষ তখন খাচ্ছে, পান করছে, জীবন উপভোগ করছে; আর আল্লাহর নবী ইউসুফ (আ.) একাকী কারাগারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ।
বসরার মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে; আর হাসান আল-বাসরী (রহ.) হজ্জাজের ভয়ে আত্মগোপনে, এমনকি নিজের কন্যার দাফনেও যেতে পারছেন না।
মক্কার মানুষ কেনাবেচায় ব্যস্ত; আর সাঈদ ইবন জুবাইর (রহ.) বছরের পর বছর আত্মগোপনে, হারামে যেতেও হচ্ছে ছদ্মবেশে।
বাগদাদের মানুষ পরিবার নিয়ে আনন্দে; আর ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.) এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে, এক জল্লাদের হাত থেকে আরেক জল্লাদের হাতে নিপীড়িত।
দামেস্কের মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজে নিমগ্ন; আর ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) যিনি তখনকার যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের একজন, কারাগারের অন্ধকারে নিমজ্জিত।
এভাবেই যুগে যুগে মানুষ তাদের নিজস্ব জীবন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, আর অন্যদিকে মুসলেহ তথা সমাজের ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা কারাগারে, নির্যাতনে, কষ্টে দিন কাটিয়েছে। যেমন ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং আরও অসংখ্য সমাজ সংস্কারক।
কিন্তু মানুষের এই উদাসীনতা কখনোই এদের তুচ্ছতার প্রমাণ নয়। এটি নয় যে, তারা আল্লাহর কাছে মূল্যহীন ছিল, কিংবা পৃথিবীর কাছে তাদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সমান। বরং এটি আল্লাহর এক চিরন্তন সুন্নাহ; সংস্কারকদের প্রকৃত মর্যাদা দুনিয়ায় নয়, বরং আখিরাতে।
মানুষ অনেক সময় নিজেদের বাস্তবতায় এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে যে, তাদের মাঝখান থেকে সূর্যের মতো আলোকিত ব্যক্তিরাও হারিয়ে যায়, তবুও তারা বুঝতে পারে না।
মহান আল্লাহ তাঁর মুস্লিহদের অনেক সময় এমন জায়গায় নিয়ে যান, যা আসলে তাদের প্রস্তুতির কারখানা। সেখানে তিনি তাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন, হৃদয়কে নির্মল করেন, জ্ঞান দিয়ে সমৃদ্ধ করেন, এবং ধৈর্যের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করেন। এই প্রক্রিয়া কখনো নবীদের জীবনেও ঘটেছে।
এই সময়টাতে মানুষ নিজেরাই মূল্য চুকায়; শাসকের জুলুম, কঠিন পরিস্থিতি এবং মুস্লিহদের অনুপস্থিতির কারণে বরকতের অভাব তাদের জীবনে নেমে আসে।
অন্যদিকে জালিমরা নিজেদের জীবন নষ্ট করে, সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে এবং মানুষের উপর অত্যাচার চালিয়ে।
অবশেষে একসময় আসে যখন ইউসুফ (আ.), হাসান, সাঈদ, আহমাদ এবং তাদের মতো সংস্কারকরা আবার ফিরে আসেন। তারা তখন পূর্ণ প্রস্তুত, পূর্ণ শক্তিতে সজ্জিত। তাদের বন্দিত্বের সময়টাই ছিল তাদের প্রস্তুতির সময়, যার জন্য তারা গোপন ছিলেন, যার জন্য তারা আটক ছিলেন।
তাদের জীবনের মূল্য সময়ের দৈর্ঘ্যে নয়, বরং বরকতে।
তাদের প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকার ক্ষতিও আল্লাহ পূরণ করে দেন দুনিয়ায় আনন্দ বাড়িয়ে, আর আখিরাতে মর্যাদা বাড়িয়ে।
এই বিশ্বাসই আল্লাহ তাদের অন্তরে নিক্ষেপ করেন, যার ফলে তারা ধৈর্য ধারণ করে, সওয়াবের আশায় দৃঢ় থাকে। অন্যথায় তারা দুঃখে ভেঙে পড়ত।
ইউসুফ (আ.)-এর মুক্তি কোনো বাদশাহ বা মন্ত্রীর হাতে ছিল না বরং তা নির্ধারিত ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে।
যখন আল্লাহ তাঁর মুক্তি চান, তখন তিনি স্বপ্ন দেখান, দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেন, পরিস্থিতি তৈরি করেন এমনকি ইউসুফ (আ.) নিজেই বলেন: তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং জিজ্ঞেস কর…।
প্রতিটি দিন, যেদিন ইউসুফ (আ.) দেরিতে বের হন মানবজাতির তাঁর প্রতি প্রয়োজন ততই বৃদ্ধি পায় নৈতিকতায়, জীবিকায়। অন্যদিকে আল্লাহ তাঁর জ্ঞানকে পরিপূর্ণ করেন, তাঁর হৃদয়কে শক্তিশালী করেন।
এটাই ইউসুফদের গল্প-
যারা লুকিয়ে থাকে, কিন্তু হারিয়ে যায় না;
যারা বন্দী হয়, কিন্তু ভেঙে পড়ে না;
যারা বিলম্বিত হয়, কিন্তু বিলুপ্ত হয় না।
কাজেই সংস্কারকের পথ সহজ নয়,
কিন্তু তার পরিণতি মহিমান্বিত।
তাই হে প্রজ্ঞাবান মানুষ, এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।