আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষা: বান্দার হৃদয়ের প্রকৃত জীবন-
আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষা, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছা এবং তাঁর সাক্ষাতের প্রতি গভীর আকুলতা এসবই একজন বান্দার প্রকৃত পুঁজি। এগুলোই তার জীবনের মূল ভিত্তি, তার শান্তিময় জীবনের শক্তি, প্রকৃত সুখ ও সফলতার উৎস, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং চোখের শীতলতা।
মানুষকে মূলত এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে এই পথেই আহ্বান করা হয়েছে। নবী-রাসূলদের প্রেরণ এবং আসমানী কিতাবসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার মূল লক্ষ্যও ছিল মানুষকে এই সত্যের দিকে পরিচালিত করা। হৃদয়ের প্রকৃত কল্যাণ ও আনন্দ তখনই সম্ভব, যখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা একমাত্র আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ হয়; যখন তিনিই তার একমাত্র কাম্য, প্রার্থিত ও অভিপ্রেত সত্তা হয়ে ওঠেন।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন, অতএব যখন তুমি অবসর পাও, তখন পরিশ্রম করো এবং তোমার প্রতিপালকের দিকেই আকাঙ্ক্ষা নিবদ্ধ করো। (সূরা ইনশিরাহ: ৭–৮)।
তিনি আরও বলেন, যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকত এবং বলত, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ অচিরেই আমাদের তাঁর অনুগ্রহ থেকে দান করবেন এবং তাঁর রাসূলও দেবেন। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর প্রতিই আগ্রহী। (সূরা তাওবা: ৫৯)।
মানুষের আকাঙ্ক্ষা মূলত তিন প্রকার।
প্রথমতঃ যারা আল্লাহর প্রতিই আগ্রহী, তাঁকেই ভালোবাসে, তাঁর সান্নিধ্যই কামনা করে।
দ্বিতীয়তঃ যারা আল্লাহর কাছে যা আছে অর্থাৎ তাঁর দান, পুরস্কার ও জান্নাত সেগুলোর প্রতি আগ্রহী।
তৃতীয়তঃ যারা আল্লাহ থেকে বিমুখ, যারা দুনিয়াকেই আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয়।
প্রকৃত প্রেমিক সে-ই, যে আল্লাহকেই চায়। কর্মপরায়ণ ব্যক্তি আল্লাহর দান ও পুরস্কার কামনা করে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয়, সে আসলে আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
যার আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর দিকে, আল্লাহ তার সব প্রয়োজন পূরণ করে দেন। তিনি তার সমস্ত বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাকে এমন বিপদ থেকে রক্ষা করেন যা সে নিজে প্রতিহত করতে পারে না। তিনি তাকে এমনভাবে সুরক্ষা দেন যেমন একজন মায়ের কোলে থাকা শিশুকে রক্ষা করা হয়।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে অন্য সব কিছুর উপর প্রাধান্য দেয়, আল্লাহও তাকে মানুষের মাঝে সম্মানিত করেন। আর যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্য বাঁচে, আল্লাহ তার জন্য এমনভাবে হয়ে যান, যেভাবে সে নিজেও নিজের জন্য হতে পারে না।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে সত্যিকারভাবে চিনতে পারে, তার কাছে আল্লাহর চেয়ে প্রিয় আর কিছু থাকে না। তখন তার অন্তরে আর কোনো আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট থাকে না, শুধু সেই বিষয়গুলো ছাড়া, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায় এবং তাঁর দিকে যাত্রার পথে সহায়তা করে।
আল্লাহকে জানার অন্যতম লক্ষণ হলো ভয় ও শ্রদ্ধা। একজন বান্দা যত বেশি আল্লাহকে চিনবে, তার অন্তরে তত বেশি আল্লাহভীতি ও শ্রদ্ধা জন্ম নেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই ভয় করে। (সূরা ফাতির: ২৮)। অর্থাৎ, যারা আল্লাহকে সত্যিকারভাবে জানে, তারাই প্রকৃতভাবে তাঁকে ভয় করে।
নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখি এবং তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি।
যে ব্যক্তি আল্লাহকে সত্যিকারভাবে চিনে নেয়, তার জীবন নির্মল হয়ে যায় এবং তার জীবনধারা শান্তিময় হয়ে ওঠে। তখন সৃষ্টির কোনো কিছুই তাকে ভয় দেখাতে পারে না; বরং সবকিছুই তাকে সম্মান করে। সে মানুষের ভয়ের পরিবর্তে আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রশান্তি খুঁজে পায়।
আল্লাহর পরিচয় মানুষের অন্তরে লজ্জাবোধ, শ্রদ্ধা, মহত্ত্ববোধ, আল্লাহর তত্ত্বাবধানের অনুভূতি, ভালোবাসা, ভরসা, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি এবং তাঁর আদেশের প্রতি আত্মসমর্পণ সৃষ্টি করে।
সংক্ষেপে বলা যায়, আল্লাহর সঙ্গে হৃদয়ের যে জীবন, তার বাইরে হৃদয়ের কোনো প্রকৃত জীবন নেই। যখন মানুষের জিহ্বা ও হৃদয় একসাথে আল্লাহর স্মরণে মগ্ন হয়, তখন হৃদয় আল্লাহর ইচ্ছার সাথে একাত্ম হয়ে যায়। তখন বান্দা নিজের সামান্য আমলকেও অনেক বড় মনে করে এবং আল্লাহর সামান্য অনুগ্রহকেও অসীম মনে করে।
তখন সে আনুগত্যকে আলিঙ্গন করে এবং অবাধ্যতাকে ত্যাগ করে। সে নিজের সবকিছু প্রিয়তম রবের জন্য উৎসর্গ করে দেয়। তার হৃদয় আল্লাহর মহিমা, শ্রদ্ধা ও সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দেয়।
সে আল্লাহর স্মরণ ছাড়া স্থির থাকতে পারে না। তাঁর স্মরণ, তাঁর সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা এবং তাঁর সাক্ষাতের প্রতীক্ষাই তার জীবনের আনন্দ হয়ে ওঠে।
এমন মানুষই প্রকৃত অর্থে সত্যিকারের প্রেমিক, যে তার সমস্ত সত্তা দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তাঁকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়।
— তথ্যসূত্র: ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রচিত রওযাতুল মুহিব্বীন থেকে।