জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রকল্প-
কোনো তরুণ যদি আমাকে প্রশ্ন করে, ‘আমার যৌবনের কয়েকটি বছর এমন কোন কাজে ব্যয় করা উচিত, যা আমার সঙ্গে সারাজীবন থাকবে?’ আমি তাকে খুব বেশি চিন্তা না করেই বলব, কুরআনুল কারীমকে ইতকানের সঙ্গে হিফজ করো।
এটি শুধু একটি শিক্ষামূলক প্রকল্প নয়; এটি হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ।
তবে কুরআন হিফজ বলতে শুধু একবার আয়াতগুলো মুখস্থ করে ফেলা বোঝায় না। প্রকৃত ইতকান হলো, কুরআনকে এমনভাবে হৃদয়ে গেঁথে নেওয়া, যাতে তা আপনার বুকে দৃঢ়ভাবে সংরক্ষিত থাকে, জিহ্বায় সাবলীলভাবে প্রবাহিত হয় এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে আপনাকে কষ্ট করে স্মরণ করতে না হয়। আপনি সালাতে দাঁড়ালে আয়াতগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনে আসে, তিলাওয়াত করলে এক আয়াত আরেক আয়াতকে টেনে আনে, কাউকে শেখাতে গেলে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পড়াতে পারেন এবং জীবনের যে কোনো মুহূর্তে আল্লাহর কালাম আপনার অন্তর ও জিহ্বায় উপস্থিত থাকে।
অর্থাৎ কুরআন তখন আর শুধু আপনার মুখস্থ করা একটি গ্রন্থ থাকে না; বরং তা আপনার অন্তরের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
অনেক আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনে আমরা এমন আফসোসের কথা শুনেছি যে, যৌবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়টি তাঁরা কুরআন হিফজকে পরিপূর্ণ করার জন্য যথেষ্টভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, সময় যদি আবার ফিরে আসত, তাহলে জীবনের অনেক কাজের আগে কুরআন হিফজকে অগ্রাধিকার দিতেন। প্রয়োজন হলে এর জন্য অর্থ ব্যয় করতেন, দীর্ঘ সময় দিতেন এবং বহু পরিশ্রম সহ্য করতেন।
কারণ যৌবন শুধু জীবনের আনন্দের সময় নয়, এটি স্মৃতি, শক্তি, উদ্যম ও শেখার অসাধারণ সময়। এই বয়সে মানুষের স্মৃতিশক্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকে, দায়িত্ব কম থাকে এবং মনও অনেক বেশি অবসর পায়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের পরিধি বাড়তে থাকে। পরিবার, জীবিকা, পেশা, সন্তান, সামাজিক দায়িত্ব এবং নানামুখী ব্যস্ততা ধীরে ধীরে সময়কে সংকুচিত করে ফেলে।
তখন যে কাজটি যৌবনে কয়েক ঘণ্টার নিয়মিত পরিশ্রমে সম্ভব ছিল, সেটিই পরবর্তী জীবনে অর্জন করতে হয়তো দ্বিগুণ বা তারও বেশি সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হয়।
এই বাস্তবতা আমরা নিজেরা দেখেছি, অন্যদের জীবনেও দেখেছি। আল্লাহই সাহায্যকারী।
তাই হে ইসলামের তরুণেরা, জীবনের ব্যস্ততা আপনাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার আগেই কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলুন। দায়িত্বের বোঝা ভারী হওয়ার আগে, সময়ের সংকট শুরু হওয়ার আগে, জীবনের অসংখ্য পরিকল্পনা আপনাদের সময়কে ভাগ করে নেওয়ার আগে, কুরআনকে আপনার জীবনের অন্যতম প্রধান প্রকল্প বানিয়ে নিন।
আপনি চাইলে একটি বই পড়া পরে করতে পারেন। কোনো বিষয়ে উচ্চশিক্ষা কিছুদিন পিছিয়ে দিতে পারেন। কোনো ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত প্রকল্পের সূচনা বিলম্বিত করতে পারেন। একটি সার্টিফিকেট অর্জনের পরিকল্পনাও পরে করা সম্ভব। কিন্তু কুরআনকে বারবার ‘পরে করব’ বলে পিছিয়ে দেবেন না।
কারণ কুরআন আপনার জীবনের অন্য প্রকল্পগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং কুরআন আপনার জীবনের দিকনির্দেশনা। এটি আপনাকে উদ্দেশ্য শেখাবে, সময়ের মূল্য শেখাবে, চরিত্র গঠন করবে, চিন্তাকে শুদ্ধ করবে এবং আপনার অন্যান্য অর্জনকে সঠিক অর্থ ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করবে।
আজ আল্লাহ তাআলা কুরআন শেখার পথও অনেক সহজ করে দিয়েছেন। রয়েছে নিয়মিত হিফজের হালকা, মুরাজাআতের ব্যবস্থা, দক্ষ শিক্ষক, অনলাইন শিক্ষা, অডিও রেকর্ডিং, বিভিন্ন শিক্ষামূলক উপকরণ এবং ঘরে বসে শেখার অসংখ্য সুযোগ। অতীতে যেসব কারণে কেউ কুরআন শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো, তার অনেক কিছুই আজ আর আগের মতো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
এখন প্রয়োজন শুধু সত্যিকারের ইচ্ছা, দৃঢ় সংকল্প, সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত মুরাজাআত, ধৈর্য এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা।
শুরুটা হয়তো কঠিন হবে। প্রতিদিনের সময় বের করাও কঠিন মনে হতে পারে। কখনো মুখস্থ এগোবে, কখনো মনে হবে কিছুই মনে থাকছে না। কখনো উৎসাহ থাকবে, কখনো ক্লান্তি এসে ভর করবে। কিন্তু মনে রাখবেন, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পথটি এক দিনের নয়। এটি ধারাবাহিকতার পথ।
আজ যদি অল্প দিয়ে শুরু করেন, কাল সেটিই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে।
তাই এমন একটি প্রকল্প গ্রহণ করুন, যার ফল আপনার বয়সের সঙ্গে শেষ হবে না। এমন একটি সম্পদ অর্জন করুন, যা আপনার পদমর্যাদা, অর্থ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না। এমন কিছু নিজের অন্তরে ধারণ করুন, যা একদিন পৃথিবীর সব ব্যস্ততা পেছনে ফেলে আপনি যখন একা হয়ে যাবেন, তখনও আপনার সঙ্গে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
﴿بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ﴾
বরং এটি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ, যা জ্ঞানপ্রাপ্তদের অন্তরে সংরক্ষিত। (সূরা আনকাবূত, ২৯:৪৯)।
কুরআনের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি শুধু কাগজের পাতায় সংরক্ষিত কোনো গ্রন্থ নয়। আল্লাহর কালাম মানুষের বুকে সংরক্ষিত হয়, জিহ্বায় উচ্চারিত হয়, সালাতে পাঠ করা হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শেখানো হয়।
তাই কুরআনকে শুধু আপনার তাকের একটি কিতাব বানাবেন না। চেষ্টা করুন, কুরআন যেন আপনার হৃদয়ের কিতাব হয়। শুধু সুন্দর কণ্ঠে তিলাওয়াত করার লক্ষ্য রাখবেন না; এমনভাবে হিফজ করুন, যাতে কুরআন আপনার সালাতে আসে, আপনার নির্জনতায় আসে, আপনার চিন্তায় আসে, আপনার চরিত্রকে প্রভাবিত করে এবং জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্তে আপনাকে পথ দেখায়।
আপনার যৌবনের কয়েকটি বছর হয়তো দুনিয়ার বহু কিছু অর্জনের পেছনে চলে যাবে। আপনি ডিগ্রি অর্জন করবেন, পেশা গড়বেন, অর্থ উপার্জন করবেন, নানা দক্ষতা শিখবেন, বহু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবেন। কিন্তু এসব অর্জনের মধ্যেও এমন একটি সম্পদ অবশ্যই অর্জন করুন, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরোনো হবে না।
কুরআনকে আপনার জীবনের একটি প্রকল্প বানাবেন না; কুরআনকে আপনার জীবনের সঙ্গী বানান।
এমন সঙ্গী, যে দুনিয়ায় আপনাকে পথ দেখাবে, নির্জনতায় আপনাকে সঙ্গ দেবে, সালাতে আপনার হৃদয়কে জীবিত রাখবে এবং আপনি যখন একদিন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন, তখনও যার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের মূল্য শেষ হয়ে যাবে না।
যৌবন ফিরে আসবে না। সময়ও ফিরে আসবে না। তাই যে বয়সে হৃদয় ও স্মৃতি সবচেয়ে শক্তিশালী, সেই বয়সেই কুরআনকে হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর স্থানে জায়গা করে দিন।
এটাই হতে পারে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রকল্প।












