মানুষ সাধারণত জীবনের সবচেয়ে বেশি ছুটে বেড়ায় দুটি জিনিসের পেছনে, সম্পদ ও সন্তানসন্ততি। অর্থ উপার্জন, ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করা, এসব নিয়েই আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ কেটে যায়।
কিন্তু কুরআনের একটি আয়াত এসে যেন আমাদের এই পুরো দৌড়ের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়।
> وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ
“যেদিন মানুষ পুনরুত্থিত হবে, সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করো না। যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি কোনো কাজে আসবে না।”
সূরা আশ শু‘আরা, ৮৭ থেকে ৮৮
তাহলে সেদিন কাজে আসবে কী?
পরের আয়াতটিই তার উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।
> إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
“তবে সে ব্যক্তি ব্যতীত, যে আল্লাহর কাছে সুস্থ ও পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে।”
সূরা আশ শু‘আরা, ৮৯
তাহলে একজন বুদ্ধিমান মুমিনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কোথায় হওয়া উচিত?
নিজের অন্তরকে সংশোধন করার কাজে।
আমরা সম্পদ বাড়ানোর জন্য কত পরিশ্রম করি, ভবিষ্যতের জন্য কত পরিকল্পনা করি, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কত কিছু করি। অথচ যে অন্তর নিয়ে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে, সেই অন্তরটিকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আমরা কতটুকু সময় ব্যয় করি?
‘কলবুন সালীম’ এমন অন্তর, যা শিরক থেকে মুক্ত, বিদআত থেকে নিরাপদ এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত। এমন অন্তর, যেখানে রিয়া নেই, আত্মপ্রশংসা নেই, লোকদেখানো নেই, নেতৃত্ব ও খ্যাতির অন্ধ আকাঙ্ক্ষা নেই। নেই হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও মানুষের প্রতি অসৎ মনোভাব।
অন্তরকে শুধু বাহ্যিক পাপ থেকে নয়, বরং অন্তরের রোগ থেকেও মুক্ত করতে হবে। কারণ অনেক সময় মানুষের বাহ্যিক আমল সুন্দর থাকে, কিন্তু অন্তরের ভেতরে এমন কিছু ব্যাধি লুকিয়ে থাকে, যা সেই আমলের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।
তাই নিজেকে প্রতিদিন প্রশ্ন করা দরকার।
আমি কত সম্পদ অর্জন করলাম, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমার অন্তর কতটা পরিশুদ্ধ হলো?
আমার আমল কি আল্লাহর জন্য, নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য?
আমি অন্যের ভালো দেখে আনন্দিত হই, নাকি হিংসা করি?
আমি নসিহত গ্রহণ করি, নাকি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকি?
আমি সত্যকে ভালোবাসি, নাকি নিজের মতকে?
কারণ কিয়ামতের দিন সম্পদ ও সন্তান মানুষের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু মুক্তির কারণ হবে না।
সেদিন সফল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর সামনে এমন একটি অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে, যে অন্তর তাঁর প্রতি তাওহিদে অবিচল, সুন্নাহর অনুসারী, পাপ থেকে তওবাকারী এবং হিংসা, বিদ্বেষ, রিয়া ও অহংকারের মতো অন্তরের ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে।
তাই দুনিয়ার জন্য সম্পদ জমাতে থাকুন, সন্তানদের জন্য ভবিষ্যৎ গড়ুন; কিন্তু এর চেয়েও বেশি যত্ন নিন সেই অন্তরের, যেটা নিয়ে আপনাকে একদিন একা আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।
এটাই আসল বিনিয়োগ।
এটাই প্রকৃত সফলতার প্রস্তুতি।