আজকের আলোচনা দুঃখ নিয়ে। তবে এটি সেই দুঃখ নয়- যে দুঃখ মানুষকে আঘাত, বিপদ কিংবা দুনিয়ার সম্পদে ঘাটতির কারণে স্পর্শ করে। আল্লাহ তাআলা তো তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জবানেই আবু বকর আস-সিদ্দীককে বলেছিলেন, إذْ يَقولُ لِصاحبِهِ لا تَحْزَنْ إنَّ الله مَعَنا —যখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন, দুঃখ কোরো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।
বরং এখানে উদ্দেশ্য সেই দুঃখ; যা আসে নেক আমল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার কষ্টে। সেই দুঃখ; যা জাগ্রত হয় যখন মানুষ নিজের মধ্যে দেখে কেবল খেল-তামাশা, অবহেলা আর উদ্দেশ্যহীনতা। যখন দিনগুলো দুনিয়ার কাজে কেটে যায়, কিন্তু আল্লাহর জন্য বা আখিরাতের জন্য কোনো অংশ থাকে না।
এটি সেই দুঃখ, যার দিকে আপনাকে ডাক দেয় আল্লাহর বাণী, যখন আপনি কুরআন পাঠ করেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেননি, إنَّ هذا القُرآن نزل بِحُزنٍ، فإذا قرأتموه فابْكُوا، فإنْ لم تبكوا فتباكوا —নিশ্চয়ই এই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে দুঃখসহ। সুতরাং তোমরা যখন এটিকে পড়বে, তখন কাঁদবে; আর যদি কাঁদতে না পারো, তবে অন্তত চেষ্টা করবে কাঁদার।
আর আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন,
اطلب قلبك في ثلاثة مواطن: عند سماع القرآن، وفي مجالس الذكر، وفي وقت الخلوة، فإن لم تجده في هذه المواطن، فاسأل الله أن يمنّ عليك بقلب فإنه لا قلب لك
– তোমার হৃদয়কে তিন জায়গায় খোঁজ। কুরআন শ্রবণের সময়ে; যিকিরের মজলিসে; আর নির্জন অবস্থায়। যদি এই জায়গাগুলোতেও তা না পাও, তবে আল্লাহর কাছে একটি হৃদয় প্রার্থনা করো, কারণ তোমার কাছে হৃদয় নেই।
তিনি আরও বলেছেন,
ينبغي لحامل القرآن أن يعرف بليله إذا الناس نائمون، وبنهاره إذا الناس يُفطرون، وبحزنه إذا الناس يفرحون، وببكائه إذا الناس يضحكون، وبصمته إذا الناس يخلطون، وبخشوعه إذا الناس يختالون، وينبغي لحامل القرآن أن يكون باكًيا محزونًا حكيمًا حليمًا عليمًا سكيتًا، وينبغي لحامل القرآن أن لا يكون جافيًا، ولا غافلًا، ولا صَخَّابًا، ولا صَيَّاحًا، ولا حديدًا
– কুরআনের বাহকের উচিত তার নিশিতে পরিচিত হওয়া, যখন মানুষ ঘুমায়। দিনে পরিচিত হওয়া, যখন মানুষ উদাসীন থাকে। দুঃখে পরিচিত হওয়া, যখন মানুষ আনন্দ করে। কান্নায় পরিচিত হওয়া, যখন মানুষ হাসে। নীরবতায় পরিচিত হওয়া, যখন মানুষ বিশৃঙ্খল কথায় লিপ্ত হয়। বিনয় ও খুশুতে পরিচিত হওয়া, যখন মানুষ অহংকার করে। কুরআনের বাহক হওয়া উচিত কান্নাশীল, দুঃখশীল, জ্ঞানী, ধীর, সহনশীল ও শান্তস্বভাব। তার উচিত নয় রূঢ় হওয়া, গাফিল হওয়া, চিৎকারকারী হওয়া বা কঠোর স্বভাবের হওয়া।
মুমিন সেই ব্যক্তি- যে ক্ষমা ও নেকির দিকে দৌড়ে যায়, কল্যাণে প্রতিযোগিতা করে। তাই সে দুঃখ পায়, যখন অন্যেরা সে নেকিতে এগিয়ে যায়, অথচ সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে দর্শকের সারিতে; অথবা ব্যস্ত থাকে খেল-তামাশায়, কিংবা ভিড়ে মিশে যায় গাফিলদের সঙ্গী হয়ে।
আর যে দুঃখ আসে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনাতে; এটি মানবস্বাভাবিক, মানুষের কোনো হাত এতে নেই। মানুষের দুঃখগুলোই তাকে গড়ে তোলে। তবে এটি মহৎ ধরনের দুঃখ, যার মধ্য দিয়ে মানুষ দুনিয়ার পরিবর্তনশীলতা বুঝে, শিক্ষা নেয়, দূরদর্শী হয়। এই দুঃখ মানুষকে এমন কাজে ফিরতে দেয় না, যা আখিরাতের স্থায়ী দুঃখের কারণ হবে। কারণ দুনিয়ার দুঃখ সাময়িক, শেষ পর্যন্ত তা কেটে যায়। কিন্তু আখিরাতের দুঃখ তার কোনো শেষ নেই।
দুঃখের শুরু হয় পাহাড়ের মতো ভার হয়ে, যা ধৈর্য ও ঈমানের মাধ্যমে ক্রমশ কমতে কমতে শেষে বিলীন হয়ে যায় এটাই প্রকৃত দুঃখ; যথাস্থানে, যথার্থ দুঃখ। এ দুঃখ হৃদয়কে ভেঙে দেয় না, বরং পরিশুদ্ধ করে, যেমন ঘোলা পানির ঝর্ণাকে পরিষ্কার করে ফেলা হয়।
কখনো দুঃখ হয় নাজাতের পথও। উকবাহ ইবনু আমেরের হাদীসে আছে,
قلتُ: يا رسولَ اللهِ ما النَّجاةُ؟ قال: أمسِكْ عليكَ لسانَكَ، ولْيسعْكَ بيتُك، وابكِ على خطيئتِكَ
-আমি বললাম হে আল্লাহর রসূল, নাজাত কী? তিনি বললেন, তোমার জিহ্বাকে আটকে রাখো; তোমার ঘরেই যথেষ্ট হও; আর তোমার পাপের উপর কেঁদো।
এটি কাঁদার নির্দেশ, যার উদ্দেশ্য হলো নিজের গুনাহের জন্য অনুশোচনা, যেন মানুষ আর ফিরে না যায় সেই পথে; যেন তার হৃদয়ে কালো দাগ না পড়ে যা বড় হতে হতে হৃদয়কে পাথরের চেয়েও কঠিন করে দেয়।
প্রশংসিত দুঃখ হলো, যা মানুষকে চিন্তায় ডুবায়, যাতে সে এগিয়ে যেতে পারে; অলসতা ঝেড়ে ফেলে, হীনতা দূর করে, মানসিক স্থিরতা লাভ করে। সত্যিই যেমন বলেছেন মহান কবি আল-মুতানাব্বি,
ومَنْ تفكّر في الدُّنيا وَمُهجَتِهِ
أَقامَهُ الفِكرُ بَينَ العَجزِ وَالتَعَبِ
—যে ব্যক্তি জীবন ও দুনিয়া নিয়ে গভীর চিন্তা করে, চিন্তাই তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে অসহায়ত্ব ও পরিশ্রমের মাঝামাঝি।
– আল-ইলম ইন্সটিটিউট রাজশাহী-৬২০৩













