যদি ইখলাস না থাকে, তবে পরিশ্রম বৃথা (إذا لم تخلص فلا تتعب)
আরবীতে একটি প্রচলিত উক্তি আছে إذا لم تخلص فلا تتعب অর্থাৎ,যদি ইখলাস না থাকে, তবে পরিশ্রম বৃথা বা কেউ এভাবে অর্থ করেছেন, যদি ইখলাস না থাকে, তাহলে পরিশ্রম করো না। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি আপাতদৃষ্টিতে সরল হলেও এর গভীরতা ইসলামী জীবনের একটি মৌলিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে তোলে। যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের কর্মের বাহ্যিক সৌন্দর্য যতই জাঁকজমকপূর্ণ হোক না কেন, মহান আল্লাহর কাছে তা তখনই গ্রহণযোগ্য হয় যখন তা হয় ইখলাসপূর্ণ। একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
ইখলাস তথা খাঁটি নিয়্যাতের তাৎপর্য: ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত কিংবা যেকোনো নেক আমলের শর্ত দুটি। যথা-
১. ইখলাস। তথা শুধুমাত্র মহান আল্লাহর জন্য কাজ করা।
২. মুতাবাআতুর রাসূল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতি অনুসরণ করা। ঐ পদ্ধতিতেই ইবাদত করা।
মহান আল্লাহ বলেন, وما أُمِروا إلا ليعبدوا اللهَ مخلصين له الدين
-অর্থাৎ, তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেবল এ জন্য যে, তারা যেন মহান আল্লাহর ইবাদত করে নিখাদভাবে, তাঁর দ্বীনের প্রতি ইখলাস রেখে। (বাইয়্যিনাহ: ৫)।
ইখলাস সম্পর্কে সালাফদের বাণী ও বাস্তবতা: আব্দুল্লাহ ইবনুল আল-মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, رُبَّ عملٍ صغيرٍ تعظّمه النية ورُبَّ عملٍ كبيرٍ تُصغّره النية -অর্থাৎ, অনেক ছোট আমল নিয়তের কারণে বড় হয়ে যায়, আবার অনেক বড় আমল নিয়তের দুর্বলতার কারণে ছোট হয়ে যায়।
ইমাম সূফিয়ান আছ-ছাওরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ما عالجت شيئاً أشدّ عليَّ من نيّتي، إنها تتقلب عليّ -অর্থাৎ, আমি আমার নিয়্যাত থেকে বেশি কঠিন কিছু খুঁজে পাইনি, কারণ এটি সর্বদা পরিবর্তনশীল।
ফুযায়ল ইবনে ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ترك العمل من أجل الناس رياء، والعمل من أجل الناس شرك، والإخلاص أن يعافيك الله منهما -অর্থাৎ, মানুষের জন্য আমল পরিত্যাগ করা রিয়া (প্রদর্শন), মানুষের জন্য আমল করা শিরক, আর ইখলাস হলো মহান আল্লাহ যেন তোমাকে উভয় থেকে নিরাপদ রাখেন।
ইখলাস বিহীন আমলের পরিণতি:
১. পরিশ্রম বৃথা যায়: নিয়্যাত ঠিক না থাকলে শত ইবাদত, দাওয়াহ, লিখনী বা খেদমত মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, إنما الأعمال بالنيات অর্থাৎ, নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)।
২. রিয়া বা লোক দেখানো রূপ নেয়: নিয়্যাত ঠিক না থাকলে মানুষ মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়, বরং মানুষের প্রশংসা কামনায় কাজ করতে শুরু করে। এটি শিরকে খফীর অন্তর্ভুক্ত বিষয় (গোপন শিরক)। এব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক লোক দেখানো। (মুসনাদে আহমাদ)।
৩. দুনিয়াতেই ফল, আখিরাতে শাস্তি: যারা আমল করে দুনিয়াবি লাভের আশায়, তারা দুনিয়াতেই তার পুরস্কার পেয়ে যায়; আখিরাতে থাকে না কোনো প্রতিদান। মহান আল্লাহ সূরা হুদের ১৫-১৬ আয়াতে এব্যাপারে বলেছেন।
ইখলাস কিভাবে অর্জন করব:
১. নিজেকে মহান আল্লাহর সামনে একজন নগন্য বান্দা হিসেবে কল্পনা করুন। প্রতিটি আমলের পূর্বে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কেন এটা করছি? মহান আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য, নাকি লোক দেখানোর জন্য?
২. আমল গোপনে করার অভ্যাস গড়ুন। যেমন, নফল সালাত, দান-সদকাহ ইত্যাদি গোপনে করুন।
৩. লোকপ্রশংসা থেকে বাঁচার চেষ্টা করুন। প্রশংসা পেলে তা ফিরিয়ে দিন মহান আল্লাহর দিকে। বলুন, আলহামদুলিল্লাহ, এটা আল্লাহর ফজল ও করম। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
৪. অন্তর চর্চা করুন। নিয়মিত আত্মসমালোচনা জারি রাখুন। তাওবা, তাযকিয়া এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে অন্তরকে বিশুদ্ধ করুন।
৫. আল্লাহর ভয় ও জান্নাতের আশা বৃদ্ধি করুন।
৬. সালাফদের জীবনী ও বাণী পড়ুন, যা ইখলাসে উদ্বুদ্ধ করে।
বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ ও সতর্কতা: সত্যি কথা বলতে বর্তমানে আমরা এমন একটি যুগে বাস করছি যেখানে ইসলামী কাজও প্রকাশ, ভিউ, ফলোয়ার কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। কোনো প্রজেক্ট, বক্তৃতা বা ইভেন্ট যেন মানুষের দৃষ্টিতে আসে, সেই ফোকাসই বেশি দেখা যায়। কিন্তু সালাফদের মানহাজ ছিল মহান আল্লাহর জন্য কাজ করা, গোপনে দান করা, নিজ আমল লুকিয়ে রাখা। তারা জানতেন, আমলের সফলতা নির্ভর করে শুধু ইখলাসের উপর, পরিমাণের উপর নয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে হিফাজত করুন। আমীন!
শেষকথা: ইসলামে আমলের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের একনিষ্ঠতা। এই একনিষ্ঠতাই আমাদের আমলকে মহান আল্লাহর দরবারে কবুল করাবে, আমাদের দুনিয়াকে পূর্ণতা দেবে এবং আখিরাতে জান্নাতের দিকে পৌঁছে দেবে। তাই, যে যতো বড় কাজই করুক না কেন, যদি ইখলাস ও একনিষ্ঠতা না থাকে, তবে তার সব পরিশ্রম নিঃসন্দেহে বৃথা। তাই আমাদের উচিত হবে প্রথমে নিয়ত ঠিক করা, তারপর পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হৌন। আমরা দুআ করি- اللَّهُمَّ اجْعَلْ عَمَلِي كُلَّهُ صَالِحًا، وَاجْعَلْهُ لِوَجْهِكَ خَالِصًا، وَلَا تَجْعَلْ لأحد فِيهِ شَيْئًا -হে আল্লাহ! আমার সমস্ত আমলকে সৎ করে দিন, এবং একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য খাঁটি করে দিন। আর এর মধ্যে কাউকে অংশীদার করবেন না। আমীন!
আব্দুল হাকীম মাদানী




