আলহামদুলিল্লাহ। অতঃপর-
এই মুহূর্তে কত মানুষ অন্ধকার কবরের নিঃসঙ্গতায় শুয়ে আছে! তারা হয়তো আমাদের এই মুহূর্তের একটি ঘণ্টার জন্যও আকুল হয়ে আছে। এমন একটি ঘণ্টা, যে ঘণ্টাটি আমরা আজ জীবিত অবস্থায় পাচ্ছি, অথচ তার মূল্য বুঝছি না। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর কিছু অংশ আমাদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে, আর আমরা তার প্রতি উদাসীন, অলস ও অনাগ্রহী।
হয়তো তাদের মধ্য থেকে কোনো একজনকে যদি আজ মাত্র এক ঘণ্টা, এমনকি তারও কম সময়ের জন্য দুনিয়ায় ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে সে কুরআনের মুসহাফটি নিজের কাছ থেকে আলাদা করত না। হয়তো এমন একটি জায়গা খুঁজে নিত, যেখানে নির্জনে বসে তার রবকে স্মরণ করতে পারে। হয়তো রাতের নীরবতায় দীর্ঘ সময় সিজদায় পড়ে থাকত। যে সময়কে আমরা অবহেলায় পার করে দিচ্ছি, সে সময়ের একটি মুহূর্তের জন্যই হয়তো তারা আজ গভীর আকাঙ্ক্ষায় অপেক্ষা করছে।
আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আমরা আজ অবহেলা করছি, অথচ আমাদের অন্তরে সেই কষ্টটুকুও অনেক সময় অনুভূত হচ্ছে না, যে কষ্ট রমাদানে কোনো নেক আমল ছুটে গেলে আমরা অনুভব করি। রমাদানের কোনো মূল্যবান মুহূর্ত নষ্ট হলে যে আফসোস আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, বছরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা অনেক সময় সেই অনুভূতিটুকুও হারিয়ে ফেলি।
এটি গাফেলতি ও অজ্ঞতার একটি লক্ষণ। আমরা এমন কিছু মূল্যবান সময়কে অবহেলা করছি, যেগুলো সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশই জানে যে, এগুলো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর অন্তর্ভুক্ত।
একজন সচেতন মুমিন যখন নিজের এই অবস্থা উপলব্ধি করে, তখন তার হৃদয় কেঁপে ওঠে। কারণ সে জানে, ইলম যদি আমলে রূপ না নেয়, তবে সেই ইলমই একসময় মানুষের জন্য বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যগুলোর একটি হলো, ইবাদতের মৌসুম এসে গেলেও সে আমল করার তাওফিক থেকে বঞ্চিত থাকে। আর যদি সেই বঞ্চনার কারণে তার অন্তর ব্যথিত হয়, তবে অন্তত তার মধ্যে ফিরে আসার একটি আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিন্তু এর চেয়েও ভয়ংকর হলো এমন অবস্থায় থাকা, যেখানে মানুষ আমল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অথচ নিজের বঞ্চনাটুকুও অনুভব করছে না।
এরপর রয়েছে আরও এক নির্মম বাস্তবতা।
একদিন আমাদের প্রত্যেকের জন্য এমন একটি মুহূর্ত আসবে, যখন আমাদেরও সেই নিঃসঙ্গ কবরের দিকে যেতে হবে। তখন কেউ পাশে থাকবে না। থাকবে না ফিরে আসার সুযোগ। সঙ্গে থাকবে আমাদের জীবনের বছরগুলোর আমল, গুনাহ, অবহেলা, তাকসির এবং অপরাধ।
সেদিন হয়তো মানুষ তার দুনিয়ার সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করবে। মনে পড়বে কত সময় তার সামনে ছিল, কত সুযোগ এসেছিল, কতবার আল্লাহ তাকে ভালো কাজের দরজা খুলে দিয়েছিলেন, অথচ সে তা গ্রহণ করেনি।
তখন হয়তো সে বলবে-
হে আমার রব! আমাকে যদি আর একবার ফিরিয়ে দেওয়া হতো! আল্লাহর কসম, এবার আমি সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতাম। আর অবহেলা করতাম না।
কিন্তু তখন এই আকাঙ্ক্ষার কোনো মূল্য থাকবে না। কারণ দুনিয়ায় ফিরে এসে আমল করার সময় তখন শেষ হয়ে যাবে।
তাই সুযোগ থাকা অবস্থায় জেগে উঠুন। যে সময়টি এখন আপনার হাতে রয়েছে, তার মূল্য বুঝুন। কুরআনের জন্য সময় বের করুন। যিকিরের জন্য সময় বের করুন। সিজদাকে দীর্ঘ করুন। নফল ইবাদতের জন্য নিজের জীবনে জায়গা তৈরি করুন। কারণ আপনি যে সময়টিকে আজ খুব সাধারণ মনে করছেন, হয়তো একদিন সেই সময়ের একটি মুহূর্তের জন্যই আপনার অন্তর আকুল হয়ে উঠবে।
মৃত্যুর পর আফসোস করার আগে জীবিত অবস্থায় আফসোস করুন। কবরের নিঃসঙ্গতায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করার আগে আজই আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন। কারণ আজ আপনার হাতে যে সুযোগ রয়েছে, মৃত্যুর পর সেই সুযোগ আর থাকবে না।
হে আল্লাহ! আমরা গাফেলদের মতো ঘুমিয়ে থাকা থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আমরা অক্ষমদের অক্ষমতা থেকে আপনার আশ্রয় চাই। এমন ইলম থেকে আপনার আশ্রয় চাই, যা আমলের জন্ম দেয় না।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আমলের প্রেরণা সৃষ্টি করুন। আমাদের ইবাদত ও মুজাহাদার তাওফীক দিন। আমাদের অলসতা দূর করে দিন। যে সময় ও সুযোগ আপনি আমাদের দিয়েছেন, তার যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফীক দিন এবং আমাদের আমলগুলো কবুল করে নিন।
আমীন!





