একসময় আমার আশপাশের মানুষ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট মানদণ্ড ছিল না। কখনো কারও জ্ঞান ও ব্যাপক পড়াশোনা আমাকে আকৃষ্ট করত, কখনো তার বুদ্ধিমত্তা ও তীক্ষ্ণ উপস্থিতবুদ্ধি, কখনো সুন্দর ভাষা ও চমৎকার কথাবার্তা, আবার কখনো কর্মস্পৃহা, পরিশ্রম ও দৃঢ়তা। মানুষের এসব গুণ স্বাভাবিকভাবেই তাকে কাছে টানতে এবং তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে।
কিন্তু একসময় কুরআনের দিকে ফিরে দেখলাম, সেখানে মানুষ নির্বাচনের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। আর সেই মানদণ্ড হলো সততা ও সত্যবাদিতা।
আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। সূরা আত-তাওবা: ১১৯
তখন মনে প্রশ্ন জাগল, কুরআনে আর কোন কোন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে থাকতে আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
খুঁজতে গিয়ে একটি গভীর বিষয় সামনে এলো كُونُوا مَعَ (সঙ্গে থাকো) এই নির্দেশটি কুরআনে সত্যবাদীদের ক্ষেত্রেই এসেছে।
বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা করলে বোঝা যায়, মানুষের চরিত্রের কেন্দ্রে সত্যবাদিতার গুরুত্ব কতটা। কারও জ্ঞান থাকতে পারে, বুদ্ধিমত্তা থাকতে পারে, অসাধারণ প্রতিভা থাকতে পারে, সুন্দরভাবে কথা বলার দক্ষতা থাকতে পারে, প্রচণ্ড কর্মস্পৃহাও থাকতে পারে। কিন্তু তার অন্তরে যদি সত্যতা না থাকে, তাহলে তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তিটাই দুর্বল হয়ে যায়।
কারণ সততা না থাকলে বিশ্বাস থাকে না; আর বিশ্বাস না থাকলে কোনো দীর্ঘস্থায়ী ও ইতিবাচক সম্পর্কের মজবুত ভিত্তিও থাকে না।
তাই মানুষের বাহ্যিক যোগ্যতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হওয়ার আগে তার অন্তরের সত্যতাকে দেখতে শেখা জরুরি। অবশ্যই একজন মেধাবী, দক্ষ বা অভিজ্ঞ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যায়, তার যোগ্যতা থেকে উপকৃত হওয়া যায়। কিন্তু শুধু তার যোগ্যতাগুলো দেখে তাকে নিজের একান্ত ও ঘনিষ্ঠ বৃত্তে নিয়ে আসা উচিত নয়।
কারণ সবাই উপকারী হতে পারে, কিন্তু সবাই আপনজন হওয়ার উপযুক্ত নয়।
জীবনের খুব কাছের মানুষদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাই জ্ঞান, প্রতিভা, বুদ্ধি কিংবা ব্যক্তিত্বের আগে দেখতে হবে সে কতটা সত্যবাদী, কতটা আমানতদার এবং তার অন্তর কতটা স্বচ্ছ।
আপনার নিকটতম বৃত্তটি ছোট হোক, কিন্তু সেখানে যেন এমন মানুষ থাকে, যাদের ওপর আপনি আস্থা রাখতে পারেন।
যোগ্য মানুষ অনেক পাওয়া যায়; কিন্তু সত্যিকারের মানুষ পাওয়া বড় কঠিন। তাই কাছের মানুষ নির্বাচনে যোগ্যতার চেয়ে সত্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
-আব্দুল হাকীম মাদানী
আল-ইলম একাডেমী, রাজশাহী।





